
আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
স্পেনে দুটি উচ্চগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী। প্রাথমিক তদন্তে রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার ব্যবস্থার ত্রুটি ও মানুষের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৮ অক্টোবর) টলেডো প্রদেশের উর্দা শহরের কাছে মাদ্রিদ-সেভিল উচ্চগতির রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। চলন্ত একটি ট্রেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে দুই ট্রেনের একাধিক বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘আজ স্পেন শোকাহত। পুরো স্পেন শোকাহত।’
নিহতদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি রেনফের ট্রেনের ২৪ জন এবং বেসরকারি কোম্পানি ইরিওর ট্রেনের ৪৪ জন যাত্রী রয়েছেন। ইরিওর ট্রেনটিতে ১৫১ জন এবং রেনফের ট্রেনে ৩৯৩ জন যাত্রী ছিলেন।
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার দিন ট্রেন চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এলজেডবি ব্যবস্থায় কম্পিউটারজনিত সমস্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না। ঝুঁকি এড়াতে ওই এলাকার ট্রেনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ইরিওর একটি ট্রেন রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।
স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয় রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা এডিআইএফের কর্মীরা। ফলে ট্রেন চলাচল অনেকাংশে মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তদন্তের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দক্ষিণমুখী রেনফের ট্রেনটির সামনে লাল সংকেত ছিল। অর্থাৎ, ট্রেনটির সামনে এগোনোর অনুমতি ছিল না। তা সত্ত্বেও একজন ট্রেন নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে সেটিকে চলতে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ট্রেনটির জন্য নির্দিষ্ট কোনো গতিসীমাও নির্ধারণ করা হয়নি।
পরিবহনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৬ মিনিট থেকে ৮টা ৫২ মিনিটের মধ্যে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে। একপর্যায়ে এর গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটারে পৌঁছায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিওর ট্রেনটিকে এড়াতে না পেরে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় রেনফের ট্রেনটি।
পুয়েন্তে বলেন, ট্রেনটির সামনে লাল সংকেত থাকা সত্ত্বেও সেটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর স্পেনের ট্রেড ইউনিয়ন সিএসআইএফ পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এডিআইএফের ট্রাফিক কর্মকর্তাকে দায়ী না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, দুর্ঘটনায় অবহেলা থাকলে তা তদন্তে উঠে আসবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে সংশোধন করা হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কম্পিউটার ব্যবস্থার ত্রুটি, ট্রেন চলাচলের অনুমতি এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সংঘর্ষের ভয়াবহতা। এক যাত্রী জানান, সংঘর্ষের ধাক্কায় অনেকে আসন থেকে ছিটকে অন্য যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়েন। ট্রেনের ভেতরে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি বগিতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একটি বগিতে আগুন ধরে যায়। অন্য একটি বগিতে আটকে পড়া যাত্রীরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বগিতে অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।
রেনফের যাত্রী প্যাট্রিসিয়া জানান, দুর্ঘটনার আগে তাদের ট্রেনটি প্রায় ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রীদের বলা হয়েছিল, রেলপথে ট্রেনের চাপ বেশি। পরে ট্রেনটি চলতে শুরু করার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই সংঘর্ষ ঘটে। তার ভাষ্য, সংঘর্ষের সময় কয়েকজন যাত্রী বাতাসে ছিটকে পড়েন।
উদ্ধার অভিযানে পাঁচ শতাধিক কর্মী
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করে স্পেনের জরুরি সেবা বিভাগ। পাঁচ শতাধিক উদ্ধারকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি পাঠানো হয় অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও পুলিশ সদস্যদের। উদ্ধারকাজে অন্তত তিনটি হেলিকপ্টার ও কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
গুরুতর আহত নন, এমন যাত্রীদের বাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। উর্দা শহরেও আহতদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রেডক্রসের কর্মীরা স্থানীয় একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন।
এক বছরে একাধিক দুর্ঘটনা, রেল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
স্পেনে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনার ঘটনায় দেশটির রেল অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কর্দোবা প্রদেশের আদামুসের কাছে আরেকটি উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ওই দুর্ঘটনাস্থল বর্তমান ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩০ মাইল দূরে একই মাদ্রিদ-সেভিল রেলপথে অবস্থিত।
এর কয়েক দিন পর বার্সেলোনার কাছে ভারী বৃষ্টির মধ্যে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ওই ঘটনায় ট্রেনের চালক নিহত হন এবং আহত হন কয়েক ডজন যাত্রী।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্পেনে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ছিল একেরও কম, যা সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
পরপর দুর্ঘটনায় দেশটির রেল অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, কম্পিউটারনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এখন তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষ।


























