
আরিফ আহমেদ,
কবিতা, গল্প গানে মুখরিত উচ্চারণ! বহুদিন পর একমঞ্চে কবি জীবনানন্দ, ফররুখ, আল মাহমুদ এর কবিতা ধ্বনিত হবে বরিশালের আকাশে-বাতাসে। দলমত নির্বিশেষে কবি-সাহিত্যিকের মিলনোৎসব হবে বরিশাল। এমনটাই স্বপ্ন ছিলো শেরেবাংলা সাহিত্য সম্মেলনকে ঘীরে। পাশাপাশি স্বরচিত কবিতা ও মুক্তকণ্ঠের আবৃত্তি ও গান। এ যেন সাহিত্যের পাশাপাশি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করার এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা হবে বরিশাল। আর এই স্বপ্ন নিয়ে শুধু কবি, সাহিত্যিক আর সাংবাদিক নয়, বরিশালের ছয় জেলার আনাচে-কানাচে থেকে ছুটে এসেছেন সাহিত্যপ্রেমীদের অনেকেই। এমনকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিও চোখে পড়ে এই সাহিত্য সম্মেলনে। তারপরই হোঁটচ খেতে হলো বরিশালের প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিক কাউকেই এখানে নিমন্ত্রণ করা হয়নি শুনে। আর এখানেই আমাদের সংকীর্ণতায় আটকে যাওয়া। এখানেই সাহিত্য হয়ে ওঠে শুধু ঘরোয়াপন্থী বা ঘরানা বিতর্কের অংশীদার। সাংবাদিক সাহিত্যিক অরূপ তালুকদার, কবি ছড়াকার দীপংকর ও তপংকর চক্রবর্তী, লেখক গবেষক হলেন সাইফুল আহসান বুলবুল, কবি হেনরী স্বপন, সাংবাদিক সাহিত্যিক আরিফ আহমেদ এদের কারোই উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এদের কাউকেই নিমন্ত্রণ করেনি আয়োজক সংগঠন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোট । আর এখানেই শের ই বাংলা একে ফজলুল হক এর নামে সাহিত্য সম্মেলনের মান বিপর্যয় ঘটলো। অসম্মান হলো আমন্ত্রিত অতিথি সয়ং কবি আবদুল হাই নিজেরও। কেননা, সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায় কখনো বাম-ডানের তারতম্য থাকা উচিত নয়, সবাইকে এক মঞ্চে বসিয়ে কবিতা বা সাহিত্যের হোক মান নির্নয়- এটাই যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই এর নিজস্ব উক্তি।
অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ দলমত নির্বিশেষে জনপ্রিয় সমাজসেবক শের ই বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে শেরেবাংলা ‘সাহিত্য সম্মেলন ২০২৬’। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোট, বরিশালের আয়োজনে দিনব্যাপী এ সম্মেলনে কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলন ঘটে। এসময় বরিশাল অঞ্চলের ছয় জেলা থেকে আগত উপস্থিতির তালিকার উল্লেখযোগ্য ছিলেন অধ্যাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম খান, সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম জহির, কবি সেলিম আহম্মেদ,
কবি শাহনাজ পারভীন, কবি আবদুর রহিম,
গবেষক মাহমুদ ইউসুফ, কবি মাসুদ আহমেদ রানা, সাংবাদিক শাহিন চৌধুরী, কবি সজীব তাওহীদ, কবি জিল্লুর রহমান জিল্লু সহ আরো অনেকে। যাদের কবিতা ও সাহিত্য কতটা পাঠযোগ্য বা কতটা গৃহিত তা নিয়েও বিতর্কের সুযোগও নেই। কেননা তারা সবাই আসলে সে অর্থে কবি বা সাহিত্যিক এখনো হয়ে ওঠেননি, তবে তারা সবাই আন্তরিকতার সাথে সাহিত্যের চর্চা করছেন এবং অবশ্যই সাহিত্যপ্রেমী।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোট, বরিশালের আহ্বায়ক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগর।
অন্যদিকে সম্মেলনের সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর চেয়ারম্যান কবি আবদুল হাই শিকদার। এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদ, বরিশাল শাখার সভাপতি কবি মুস্তফা হাবীব। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আহ্বায়ক এবং সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক আজাদ আলাউদ্দিন।
এই সম্মেলনের ব্যানারে সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। যদিও শেরেবাংলা মানেই হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস। বরিশালের অহংকার শেরেবাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির শুধু নয় মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগ উভয় রাজনৈতিক দলেরও পৃষ্ঠপোষক। এভাবেই সংকীর্ণতা বিএনপিপন্থী জাসাস নেতাদের ভুল ও প্রতিহিংসা আদতে বিএনপির রাজনৈতিক উদারতাকে ডুবিয়ে দেয় ।
পাশাপাশি উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বে উল্লেখযোগ্য কবি- সাহিত্যিকদের অনুউপস্থিতি । নিবন্ধিত কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ ছিল আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। কবিতার পাশাপাশি গল্প, গান ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
এ সম্মেলনে ‘শেরেবাংলা স্মৃতিপদক ২০২৬’-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন গৌরনদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোসলেম উদ্দিন শিকদার। শের ই বাংলার স্মৃতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ পদক ও সম্মেলনের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
আয়োজকরা জানান, শের ই বাংলা এ কে ফজলুল হকের স্মৃতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগ ও পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশীয় সাহিত্যচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করাই এ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ গড়ে তোলাও এ আয়োজনের অন্যতম প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের বাইরে সাহিত্য যে মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম, বরিশালের এ সাহিত্য সম্মেলনে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। কবিতা, গান ও কথামালায় শেরেবাংলার স্মরণে আয়োজিত এ মিলনমেলা বরিশালের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে নতুন প্রাণ সঞ্চারের প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

























