
মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন,
পৃথিবী অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মতো বহুমাত্রিক পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ যেমন মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কর্মসূচি সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। দেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথও সুগম করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। পরিবেশ ভিত্তিক সংগঠন জার্মান ওয়াচের “বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে” বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি, নদীভাঙন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় সব মিলিয়ে পরিবেশগত সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি উজাড় এবং জনসংখ্যার চাপ দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে আরও নাজুক করে তুলেছে। এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে স্বস্তি এনে দিয়েছে, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি বৃদ্ধি করেছে ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এরপর ঢাকার করাইল বস্তিতে ফ্যামিলি কার্ড, টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড, সিলেটে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জেলায় পাইলটিং প্রকল্প শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অন্যতম উদ্যোগ হচ্ছে বৃক্ষায়ণ প্রকল্প।
পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃক্ষায়ণ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান। বৃক্ষ প্রকৃতির ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সহায়তা করে, বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কেবল পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার গুরুত্ব এখানেই যে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিনিয়োগ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে এরই মধ্যে একটি মেল ও গঠন করেছে সরকার। গত ১২ জুন কক্সবাজারের পিত্রমখালির ডুলাহাজরার মালুমখাই সংরক্ষিত বনে গর্জন গাছের চারা রোপণ করে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। যদি এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন আবাসস্থল সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিও লাভবান হবে। বনভূমি মাটির ক্ষয় রোধ করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ স্থানীয় জনগণের জন্য ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। অপর দিকে প্রকৃতির বন্ধু পাখির অভয়ারণ্য তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ভূমির সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। রাস্তার ধারে-বিভাজকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সরকারি খাসজমিতে, সমুদ্র উপকূলে, নদীতীরবর্তী এলাকায় এবং বসতবাড়ির আশপাশে বৃক্ষরোপণের সুযোগ এখনও ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
তবে বাস্তবতার নিরিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে শুধু গাছ লাগানোই কি যথেষ্ট? বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি গাছ বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। অতীতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে লক্ষ লক্ষ চারা রোপণ করা হলেও পরিচর্যার অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা, পর্যাপ্ত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
এখানে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি সামাজিক অংশগ্রহণও অপরিহার্য। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ জনগণ একযোগে কাজ করলে বৃক্ষরোপণ আন্দোলন একটি গণ-আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এর ঘোষণা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে যদি দেশের সবুজায়ন বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
গাছ প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। একটি গাছ আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গবেষণায় প্রমাণিত বৃক্ষ বায়ুদূষণ কমায়, কার্বন শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাটিক্ষয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই একটি সবুজ, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের জনগণকে সমন্বিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হবে।
বৃক্ষায়ণ দেশের পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর একটি উদ্যোগ। বেশি বেশি গাছ লাগালে গাছপালা ধূলাবালি ও ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে পরিবেশ দূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৃক্ষের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, যার ফলে ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙন কমে যায়। গাছ পরিবেশকে শীতল রাখে, বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এছাড়াও ফল, ফুল, কাঠ ও ঔষধি উপাদানও আমরা গাছ থেকে পাই। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে ব্যাপক বৃক্ষায়ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, রাস্তা ও মহাসড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শুধু বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করছে না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়তা করছে। একটি সবুজ, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণ ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি সময়ের দাবি।
বৃক্ষরোপণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাটি ও পানি রক্ষা এবং মানবস্বাস্থ্যের উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তবে এর সফলতা নির্ভর করে পরিকল্পিত উদ্যোগ, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ওপর। সবুজ পৃথিবী গড়তে তাই বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি সামাজিক আন্দোলন নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বৃক্ষ মানবজীবনের অন্যতম প্রধান সম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে পরিচালিত বৃক্ষায়ণ কর্মসূচি দেশের পরিবেশ সুরক্ষা করতে সহায়ক। এটি শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ,সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বৃক্ষ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং মানবজাতির টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বায়ুদূষণ হ্রাস, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৃক্ষরোপণকে গণ-আন্দোলনে পরিণত করা সম্ভব হলে একটি সবুজ, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সহজ হবে। আগামী দিনের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখবে এ উদ্যোগ। বৃক্ষরোপণকে সামাজিক দায়িত্ব ও জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করা আমাদেরই সময়ের অন্যতম দাবি, যাতে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়। তাই আসুন, আজই একটি গাছ লাগাই এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিই।

























