
ধর্ম ডেস্ক,
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই হিজরতের মাধ্যমে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন ও একটি আদর্শ সমাজ গঠনের সুযোগ লাভ করেন। তবে মদিনায় হিজরতের আগেই মুসলমানদের প্রথম হিজরত হয়েছিল আফ্রিকার হাবশা (বর্তমান ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া) অঞ্চলে। ইতিহাসের এই অধ্যায় ঈমানের দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রথম হাবশা হিজরত
নবুয়তের পঞ্চম বছরে মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন অসহনীয় হয়ে উঠলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কিছু সাহাবিকে হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন। প্রথম দফায় ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারীসহ মোট ১৬ জন সাহাবি সেখানে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) ও মহানবীর কন্যা হজরত রুকাইয়া (রা.)।
হিজরতের নির্দেশ দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমরা যদি হাবশায় চলে যেতে, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম হতো। সেখানে এমন একজন ন্যায়পরায়ণ রাজা আছেন, যার শাসনে কারও ওপর জুলুম করা হয় না।”
গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে প্রত্যাবর্তন
হাবশায় অবস্থানকালে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মক্কার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়েছে। সেই সংবাদে বিশ্বাস করে অনেক সাহাবি দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু মক্কায় ফিরে তারা দেখেন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরং নির্যাতন আরও বেড়ে গেছে।
দ্বিতীয় দফায় হিজরত
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠায় মহানবী (সা.) দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এবার ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী সাহাবি হিজরত করেন। এই কাফেলার নেতৃত্ব দেন হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.)। তাদের সঙ্গে ছিলেন হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), হজরত আবু মূসা আশআরী (রা.)সহ অনেক বিশিষ্ট সাহাবি।
কুরাইশদের ষড়যন্ত্র
মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয় মেনে নিতে পারেনি কুরাইশ নেতারা। তারা দক্ষ কূটনীতিক আমর ইবনুল আস ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি রাবিয়াকে মূল্যবান উপহারসহ হাবশার রাজা নাজ্জাশীর দরবারে পাঠায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের ফেরত নিয়ে যাওয়া।
কুরাইশ প্রতিনিধিরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জানায়, তারা নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করেছে, আবার খ্রিস্টধর্মও গ্রহণ করেনি; বরং নতুন এক ধর্ম প্রচার করছে।
নাজ্জাশীর দরবারে জাফর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ
রাজা নাজ্জাশী মুসলমানদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেন। তখন হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) ইসলামের পরিচয় এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ইসলাম মানুষকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ এবং অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, একমাত্র এই সত্যের অনুসারী হওয়ার কারণেই মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং আশ্রয়ের সন্ধানে হাবশায় এসেছেন।
এরপর তিনি সূরা মারিয়ামের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন। কোরআনের বাণী শুনে রাজা নাজ্জাশী ও উপস্থিত ধর্মযাজকদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। তিনি কুরাইশ প্রতিনিধিদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দেন।
পরদিন কুরাইশ প্রতিনিধিরা হজরত ঈসা (আ.)-কে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করলেও নাজ্জাশী তাতেও বিভ্রান্ত হননি। শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা
হাবশার হিজরত শুধু একটি দেশত্যাগের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ঈমান রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং শান্তিপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে ন্যায়ের বিজয়ের এক অনন্য ইতিহাস।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়—সত্য, ধৈর্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই উত্তম ব্যবস্থা করে দেন। দেড় হাজার বছর পরও হাবশার হিজরতের ইতিহাস মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়, ঈমান রক্ষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করলে শেষ পর্যন্ত বিজয় সত্যেরই হয়।

























