
আরিফ আহমেদ,
বরিশাল জেলা ও মহানগরে অপরাধের পরিসংখ্যান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত একমাসে জেলা ও মহানগরে ৪৭১টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ সুত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ বরিশাল মহানগরীর কাউনিয়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে মালামাল লুটের চেষ্টার অভিযোগে অভিষেক সোম অভি (৩০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কাউনিয়া ফাস্ট লেনের জসীম কুটির বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাউনিয়া থানা পুলিশ তাঁকে আটক করে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে ছোরা, চাকু, সুইস গিয়ার, সার্জিক্যাল ব্লেড, মুখোশ, স্কচটেপ ও পাঞ্জাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) মিডিয়া সেলের ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি কৌশলে বাসায় প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে মালামাল লুটের চেষ্টা করেন। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আটক অভিষেক সোম অভি বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া থানাধীন পতিহার এলাকার লক্ষ্মণ সোমের ছেলে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
বসতঘরের ভেতরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করার অভিযোগটি নগরবাসীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে অপরিচিত ব্যক্তির প্রবেশ, বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশের সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে জব্দ করা সরঞ্জামগুলো কী উদ্দেশ্যে বহন করা হচ্ছিল এবং ঘটনার পেছনে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বরিশাল মহানগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি অপরাধের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। গত ১১ অক্টোবর প্রকাশিত এক সংবাদে সেপ্টেম্বর মাসের পুলিশি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বরিশাল মহানগর ও জেলা মিলিয়ে এক মাসে ৪৭১টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় ১৪২টি এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩২৯টি ঘটনা রয়েছে। আগের বছরের একই মাসে মহানগর ও জেলায় মোট ৩১১টি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে ১৬০টি। তবে এই পরিসংখ্যান মহানগর ও জেলাসহ দুই এলাকার সম্মিলিত চিত্র।
অন্যদিকে, বিএমপির বিশেষ অভিযানের তথ্যেও নগরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের তৎপরতার চিত্র পাওয়া যায়। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় মহানগর পুলিশের চারটি থানা ও গোয়েন্দা শাখার অভিযানে বিভিন্ন অভিযোগে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাসসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৪ সেপ্টেম্বরের অভিযানে বিভিন্ন মামলায় ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এসব অভিযান পুলিশের সক্রিয়তার পরিচয় দিলেও তুলনামূলক ভাবে অপরাধ বাড়ছে।
নগর চিন্তাবিদদের মতে, কাউনিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, অপরাধের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে আটক করা যেমন জরুরি, তেমনি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আবাসিক এলাকায় সন্দেহজনক চলাচল পর্যবেক্ষণ, বাড়ির প্রবেশপথের নিরাপত্তা, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় এবং জরুরি অভিযোগে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
নগর চিন্তাবিদ শাহ সাজেদা বলেন, এ ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, জব্দ করা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং অভিযুক্তের সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাসার বাসিন্দাদের বক্তব্য, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। অনেকসময় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেও এধরনের ডাকাতি ঘটনা সাজানো হয়, এমন উদাহরণও কম নয়। তাই পুলিশ প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে হবে।
এসময় নগর চিন্তাবিদদের একজন মাহবুব খান বলেন, মাত্র দুদিন আগে ডিবি পুলিশের একজন নারীকে চেহারা দেখানোর জন্য যে চেষ্টা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তা দেখার পর একজন পুরুষ ডাকাতের চেহারা ঢেকে ছবি তুলে পোস্ট দেওয়া হাস্যকর নয়কি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে কাউনিয়া থানা পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে সম্ভাব্য লুটের চেষ্টা থামানো গেছে বলে পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। এখন তদন্তের স্বচ্ছতা, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আবাসিক এলাকায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপই হবে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।


























