Dhaka , Saturday, 17 October 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
সিলেটের পর্যটনকে ব্যাপক প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে চালু হচ্ছে পর্যটন সম্পর্কিত মোবাইল অ্যাপ ফরিদপুরে দেড় কেজি গাঁজাসহ নারী গ্রেপ্তার, ২০ মামলার তথ্য পুলিশের দীঘিনালায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, ৯ মণ্ডপ পরিদর্শন আলোচনায় অপু বিশ্বাসের ‘প্রিয় বন্ধু’, কে তিনি? সানচোকে দলে নিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গেতাফের নোয়াখালীতে অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন বিতরণ নামাজ পড়ে ফেরা হলো না চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মেহরাজের রূপগঞ্জ পল্লী চিকিৎসক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নবাগত ইউএনওর সৌজন্য সাক্ষাৎ খুলশীতে ৬ কেজি গাঁজা ও বিদেশি মদসহ মাদক সম্রাট সোহাগ এসআরবি-৭’র হাতে আটক শুধু ভালো ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষ হতে হবে:- হাটহাজারীতে ভূমি ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল পাইকগাছায় ১৫১ পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা; সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান এমপি ফাহমিদা হকের মদিনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার দাবি সৌদির বিশ্ব ডাক দিবসে সম্মাননা পেলেন ‘নগদ’-এর ৬ প্রতিনিধি সড়কে বেহাল গৌরনদী–বাবুগঞ্জে নদীভাঙনের হাহাকার: দ্রুত সমাধানের আশ্বাস স্বপনের, এলাকায় উদাসীন জয়নাল আবেদীন পাইকগাছার গজালিয়া কালুয়া আলিম মাদ্রাসার এডহক কমিটির- সভাপতি শরিফুল পাইকগাছায় মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান; জব্দ ৩টি ছান্দি জাল পুড়িয়ে ধ্বংস ২৪ ঘণ্টায় পাইকগাছায় মাদক, জুয়া, নাশকতাসহ বিভিন্ন অপরাধে আটক ১৭ বর্তমানে দেশের বাইরে থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের লোকজন দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে: ইঞ্জিনিয়ার জমির উদ্দিন নাহিদ নারায়ণগঞ্জে ইজিবাইক চলাচলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ একটি চক্র সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের ষড়যন্ত্র করছে: রিজভী ‘মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করতে চায় সরকার’ জাজিরায় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমপির নির্দেশ রূপগঞ্জে শিক্ষিকার লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে ও হামলাকারীকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন শীতলক্ষ্যায় কন্টেইনার পোর্ট নির্মাণ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষে সাজেকে ফের সড়ক অবরোধ, বন্ধ যান চলাচল মাদারীপুরে মানকচুর ওজন ৪০ কেজি, দেখতে মানুষের ভিড় নেত্রকোনার মদনে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি নেতা কালিয়াকৈরে অবৈধ আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারী পুরুষ কর্তৃপক্ষ সহ ৩৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ বিমান সেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ অভিনেতা বললেন, ‘বেইমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ সর্বকালের সেরা কে, জানালেন বিশ্বকাপজয়ী তারকা

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন ও আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 01:20:36 pm, Monday, 15 December 2025
  • 234 বার পড়া হয়েছে

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল

কলামিস্ট, মানবসম্পদ–শ্রম ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ,

 

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল তথা রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস, যা রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এই নদীর বর্তমান দুর্দশা এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন‘ জনগণের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা ও জনদাবির এক প্রতিচ্ছবি।

তিস্তা পাড়ের মানুষের দু্র্দশা ও চাষাবাদের সমস্যা-

তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম) মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় এখানকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

  • ভাঙ্গন ও সর্বস্বান্ত হওয়া: প্রতি বছর বর্ষাকালে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন ও আকস্মিক বন্যায় হাজার হাজার মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারান। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় ঘরবাড়ি, চাষের জমি; ফলে শত শত মানুষ নিঃস্ব ও ভূমিহীন হয়ে পড়েন।
  • চাষাবাদের সংকট ও সেচ প্রকল্পের অপ্রতুলতা: এই সংকটের মূল কারণ হলো ভারতের আগ্রাসী ভূমিকা এবং একতরফাভাবে উজানে জল প্রত্যাহার।
    • গজলডোবা বাঁধের প্রভাব: প্রতিবেশী ভারতের উজানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রায় সম্পূর্ণ জল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই একতরফা পানি প্রত্যাহার নীতির কারণেই শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী কার্যত মরা খালে পরিণত হয়।
    • ফারাক্কার ছায়া: তিস্তার ক্ষেত্রে এই পানি প্রত্যাহার নীতি অনেককে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উজানে থাকা গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাবের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হারায়। খরায় পানির অভাব আর বন্যায় অতিরিক্ত পলি ও ভাঙনের দ্বৈত সমস্যা কৃষকদের জীবিকার প্রধান অনিশ্চয়তা।

যদিও নীলফামারী জেলার ডিমলার ডালিয়ায় অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ (তিস্তা সেচ প্রকল্প) এর লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা। কিন্তু  উজানের পানির অভাবে বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে এটি লক্ষ্যমাত্রার একটি নগণ্য অংশ (শতকরা ২০ ভাগেরও কম) পূরণ করতে সক্ষম হয়, ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পটি কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে।

 তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন গঠনের প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্ব

  • গঠনের আবহ: আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত চুক্তি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না রাখায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়। এই গণ-অসন্তোষকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করার জন্যই ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন‘ মঞ্চটির (প্লাটফর্ম) জন্ম। এই আন্দোলন মঞ্চটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে নেতৃত্ব দেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। এটি গোটা রংপুরবাসীর একটি সামাজিক আন্দোলন ও জনদাবি।

চাপ সৃষ্টিকারী (Pressure Group) পদক্ষেপসমূহ-

সরকার, প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই আন্দোলন মঞ্চটি ধারাবাহিক ও প্রতীকী কর্মসূচি পালন করে আসছে:

  • ব্যাপক প্রচার ও সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব: এই আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি, বিশেষ করে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি এবং মশাল প্রজ্জ্বলন, দেশীয় প্রায় সকল জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রথম সারিতে স্থান পায়। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও (বিশেষত প্রতিবেশী দেশের সংবাদ মাধ্যম) তিস্তা সংকট ও এই আন্দোলন খুবই গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
  • বৃহত্তর অবস্থান কর্মসূচি: ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই‘ স্লোগানে পাঁচ জেলার ১১টি পয়েন্টে একযোগে টানা ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন।
  • প্রতীকী প্রতিবাদ: তিস্তা নদীর তীরে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে ‘মশাল প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচি পালন।
  • আলটিমেটাম ও হুঁশিয়ারি: মহাপরিকল্পনার কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুরু না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে গোটা উত্তর অঞ্চল অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রদান।
  • আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ: জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ফোরামে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো।

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও জেন-জি এর কর্মকাণ্ড-

  • গণজাগরণ: আন্দোলনটি তিস্তাপারে এক ‘অভুতপূর্ব গণজাগরণ’ সৃষ্টি করেছে, যেখানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ—কৃষক, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ—একসঙ্গে পদযাত্রা, গণসমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
  • জেন-জি এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কৌশল:
    • নতুন মাত্রা: ‘জেন-জি লালমনিরহাট’-এর মতো স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো এই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
    • সৃজনশীল কর্মকাণ্ড: চিরাচরিত প্রতিবাদের বাইরে গিয়ে তারা ফ্ল্যাশ মব আয়োজন করে এবং আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ‘তিস্তা বাঁচাও’ বার্তা দ্রুত ও সৃজনশীল উপায়ে ছড়িয়ে দেয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা-

এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, যা নদী খনন, তীর সংরক্ষণ এবং বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনবে এবং বন্যা-ভাঙন রোধ করবে। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মুক্তি আনবে,  কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

আশা করা যায় যে, এই আন্দোলন আন্তঃদেশীয় আলোচনার মাধ্যমে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারের ওপর জনচাপ সৃষ্টি করবে, যাতে আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়।

এই অঞ্চলের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি মনে করি, ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ কেবল একটি নদী বাঁচানোর আন্দোলন নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই। এই আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে যেভাবে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) সৃজনশীল সক্রিয়তা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে জনগণ তাদের দাবি আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারের কাছে এখন আর এটি শুধু আশ্বাস নয়, একটি অলঙ্ঘনীয় জনদাবি। এই গণজাগরণই আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় প্রতীক।

বস্তুত, এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ সফলতা দুটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন, এবং দ্বিতীয়ত  ভারতের সাথে একটি স্থায়ী ও ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তির সফল নিষ্পত্তি। জনদাবি ও তিস্তা অববাহিকার মানুষদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সিলেটের পর্যটনকে ব্যাপক প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে চালু হচ্ছে পর্যটন সম্পর্কিত মোবাইল অ্যাপ

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন ও আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

আপডেট সময় : 01:20:36 pm, Monday, 15 December 2025

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল

কলামিস্ট, মানবসম্পদ–শ্রম ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ,

 

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল তথা রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস, যা রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এই নদীর বর্তমান দুর্দশা এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন‘ জনগণের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা ও জনদাবির এক প্রতিচ্ছবি।

তিস্তা পাড়ের মানুষের দু্র্দশা ও চাষাবাদের সমস্যা-

তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম) মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় এখানকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

  • ভাঙ্গন ও সর্বস্বান্ত হওয়া: প্রতি বছর বর্ষাকালে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন ও আকস্মিক বন্যায় হাজার হাজার মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারান। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় ঘরবাড়ি, চাষের জমি; ফলে শত শত মানুষ নিঃস্ব ও ভূমিহীন হয়ে পড়েন।
  • চাষাবাদের সংকট ও সেচ প্রকল্পের অপ্রতুলতা: এই সংকটের মূল কারণ হলো ভারতের আগ্রাসী ভূমিকা এবং একতরফাভাবে উজানে জল প্রত্যাহার।
    • গজলডোবা বাঁধের প্রভাব: প্রতিবেশী ভারতের উজানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রায় সম্পূর্ণ জল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই একতরফা পানি প্রত্যাহার নীতির কারণেই শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী কার্যত মরা খালে পরিণত হয়।
    • ফারাক্কার ছায়া: তিস্তার ক্ষেত্রে এই পানি প্রত্যাহার নীতি অনেককে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উজানে থাকা গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাবের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হারায়। খরায় পানির অভাব আর বন্যায় অতিরিক্ত পলি ও ভাঙনের দ্বৈত সমস্যা কৃষকদের জীবিকার প্রধান অনিশ্চয়তা।

যদিও নীলফামারী জেলার ডিমলার ডালিয়ায় অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ (তিস্তা সেচ প্রকল্প) এর লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা। কিন্তু  উজানের পানির অভাবে বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে এটি লক্ষ্যমাত্রার একটি নগণ্য অংশ (শতকরা ২০ ভাগেরও কম) পূরণ করতে সক্ষম হয়, ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পটি কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে।

 তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন গঠনের প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্ব

  • গঠনের আবহ: আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত চুক্তি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না রাখায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়। এই গণ-অসন্তোষকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করার জন্যই ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন‘ মঞ্চটির (প্লাটফর্ম) জন্ম। এই আন্দোলন মঞ্চটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে নেতৃত্ব দেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। এটি গোটা রংপুরবাসীর একটি সামাজিক আন্দোলন ও জনদাবি।

চাপ সৃষ্টিকারী (Pressure Group) পদক্ষেপসমূহ-

সরকার, প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই আন্দোলন মঞ্চটি ধারাবাহিক ও প্রতীকী কর্মসূচি পালন করে আসছে:

  • ব্যাপক প্রচার ও সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব: এই আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি, বিশেষ করে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি এবং মশাল প্রজ্জ্বলন, দেশীয় প্রায় সকল জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রথম সারিতে স্থান পায়। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও (বিশেষত প্রতিবেশী দেশের সংবাদ মাধ্যম) তিস্তা সংকট ও এই আন্দোলন খুবই গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
  • বৃহত্তর অবস্থান কর্মসূচি: ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই‘ স্লোগানে পাঁচ জেলার ১১টি পয়েন্টে একযোগে টানা ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন।
  • প্রতীকী প্রতিবাদ: তিস্তা নদীর তীরে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে ‘মশাল প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচি পালন।
  • আলটিমেটাম ও হুঁশিয়ারি: মহাপরিকল্পনার কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুরু না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে গোটা উত্তর অঞ্চল অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রদান।
  • আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ: জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ফোরামে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো।

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও জেন-জি এর কর্মকাণ্ড-

  • গণজাগরণ: আন্দোলনটি তিস্তাপারে এক ‘অভুতপূর্ব গণজাগরণ’ সৃষ্টি করেছে, যেখানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ—কৃষক, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ—একসঙ্গে পদযাত্রা, গণসমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
  • জেন-জি এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কৌশল:
    • নতুন মাত্রা: ‘জেন-জি লালমনিরহাট’-এর মতো স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো এই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
    • সৃজনশীল কর্মকাণ্ড: চিরাচরিত প্রতিবাদের বাইরে গিয়ে তারা ফ্ল্যাশ মব আয়োজন করে এবং আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ‘তিস্তা বাঁচাও’ বার্তা দ্রুত ও সৃজনশীল উপায়ে ছড়িয়ে দেয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা-

এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, যা নদী খনন, তীর সংরক্ষণ এবং বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনবে এবং বন্যা-ভাঙন রোধ করবে। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মুক্তি আনবে,  কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

আশা করা যায় যে, এই আন্দোলন আন্তঃদেশীয় আলোচনার মাধ্যমে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারের ওপর জনচাপ সৃষ্টি করবে, যাতে আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়।

এই অঞ্চলের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি মনে করি, ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ কেবল একটি নদী বাঁচানোর আন্দোলন নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই। এই আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে যেভাবে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) সৃজনশীল সক্রিয়তা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে জনগণ তাদের দাবি আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারের কাছে এখন আর এটি শুধু আশ্বাস নয়, একটি অলঙ্ঘনীয় জনদাবি। এই গণজাগরণই আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় প্রতীক।

বস্তুত, এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ সফলতা দুটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন, এবং দ্বিতীয়ত  ভারতের সাথে একটি স্থায়ী ও ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তির সফল নিষ্পত্তি। জনদাবি ও তিস্তা অববাহিকার মানুষদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।