
মোঃ আব্দুর রহমান হেলাল, ভোলা,
এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শর্তহীনভাবে এক ঘোষণায় জাতীয়করণ, নবম পে-স্কেল অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অবসরকালীন পাওনা এককালীন পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন অধ্যক্ষ মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসেন আজিজী। তিনি বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মতো শর্তহীনভাবে এক ঘোষণায় সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের বৈষম্য মেনে নেওয়া হবে না।”
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় ভোলা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরাম, ভোলা জেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত জেলা সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও জাতি গঠনে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এ বৈষম্য দূর করে শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের আদলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও শিক্ষা ভাতাসহ প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। নবম পে-স্কেল অনুযায়ী তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মচারীরা চিকিৎসা ভাতা হিসেবে কয়েক হাজার টাকা পেলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মাত্র ৫০০ টাকা পান—এমন বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ, অবসর ও কল্যাণ সুবিধা এককালীন পরিশোধ এবং বদলির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সুপার ও সহকারী শিক্ষকদের দ্রুত বদলির আদেশ জারি করতে হবে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অবসর সুবিধা এককালীন প্রদানের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার দাবিও জানান তিনি। দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রগতি না হলে ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান এই অধ্যক্ষ।
‘দুর্ভিক্ষের সময় প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হলে এখন বাধা কোথায়?’
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতিতে দেশের ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছিল। তাহলে বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন—এ প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।
তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয়করণ দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ছয় দফা দাবিতে সোচ্চার শিক্ষক-কর্মচারীরা
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, মাদরাসা শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ খাতের শিক্ষক-কর্মচারীরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান, নৈতিকতা গঠন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে তাঁদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্মেলনে উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. সব এমপিওভুক্ত মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শর্তহীনভাবে জাতীয়করণ।
২. স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ।
৩. ইবতেদায়ি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও মিড-ডে মিল চালু।
৪. সরকারি নিয়মের আদলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও শিক্ষা ভাতা প্রদান।
৫. নবম পে-স্কেল অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
৬. অবসর ও কল্যাণ সুবিধা এককালীন পরিশোধের ব্যবস্থা এবং বদলির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সুপার ও সহকারী শিক্ষকদের দ্রুত বদলির আদেশ জারি।
বক্তারা বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। শিক্ষকদের দুশ্চিন্তামুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে জাতীয়করণসহ যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজীকে সম্মাননা
প্রিন্সিপাল আবু জাফর মো. মাইনুদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ সফিউল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্সিপাল ড. মুহাম্মদ রুহুল আমিন আজাদী ও প্রিন্সিপাল মো. জয়নাল আবেদীন। প্রধান বক্তা ছিলেন প্রিন্সিপাল মো. লোকমান হোসেন।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি অধ্যক্ষ মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসেন আজিজীকে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরাম, ভোলা জেলা শাখার পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফোরামের ভোলা জেলা সদস্যসচিব অধ্যাপক আমির হোসেন, সদর উপজেলা সভাপতি প্রিন্সিপাল আইয়ুব আলীসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া ভোলা জেলার বিভিন্ন মাদরাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহ-সুপার ও শিক্ষক-কর্মচারীরা সম্মেলনে অংশ নেন।
সম্মেলন থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


























