
দৈনিক আজকের বাংলা প্রতিবেদন,
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি করেছেন অনন্য এক অধ্যায়।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় একটি সময় কাটে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার সংগ্রামে যোগ দিলে সন্তানদের নিয়ে কঠিন সময় পার করেন খালেদা জিয়া। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনা হেফাজতে ছিলেন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বদলে যায় খালেদা জিয়ার জীবনের গতিপথ। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে ধীরে ধীরে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরপর শুরু হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতনের পর গণতন্ত্রের দাবিতে তার দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। তার প্রথম মেয়াদে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার এবং নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৫ মেয়াদে নারী ও প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর আসে রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অধ্যায়। ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর গ্রেপ্তার হন বেগম খালেদা জিয়া। কারাবন্দী অবস্থায়ও তিনি বিএনপির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান তিনি।
পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা ও কারাবাসের মধ্য দিয়ে সময় কাটে তার। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডের পর কারাবন্দী হন তিনি। কারাগারে থাকাকালীন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০২০ সালের মার্চে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সামনে আসে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসনের দাবিতে তার অবস্থান বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আজ তার জন্মদিনে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাকে স্মরণ করছেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ক্ষমতার পালাবদল, আন্দোলন ও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে।

























