
উৎপল রক্ষিত,
অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর অবকাঠামোর অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী ও জয়দেবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী। প্রতিদিনের চলাচল থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান ও কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি নির্বাচনের আগে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আর দেখা যায় না।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, দোকানপাট ও বসতবাড়িতে পানি জমে যায়। এতে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতার শিকার হয় টঙ্গীর আউচপাড়া, কলেজগেট, খাঁপাড়া রোড, সফিউদ্দিন রোড, সুর তরঙ্গ রোড, মোক্তারপাড়া, বেক্সিমকো রোড এবং ৪৮, ৫১, ৫৩, ৫৪, ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড। এছাড়া ভারী বৃষ্টিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাছা অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতেই ডুবে যায় জয়দেবপুর বাজার, মুন্সিপাড়া রোড, পশ্চিম জয়দেবপুর, লক্ষীপুরাসহ আশপাশের এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে চান্দনা চৌরাস্তার ভোগরা এলাকাতেও জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় সড়ক নির্মাণ হলেও প্রয়োজনীয় ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। কোথাও ড্রেনের ধারণক্ষমতা কম, কোথাও আবার ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া খাল ও জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।
টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজকর্মী এস এম কামাল হোসেন বলেন, মহানগরীর মধ্যে কলেজগেট, আউচপাড়া, সুর তরঙ্গ রোডসহ আশপাশের এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পৌরসভা আমলে নির্মিত সরু ড্রেন দিয়েই এখনও পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু জনসংখ্যা ও স্থাপনা বাড়লেও ড্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও তদারকির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক কাউন্সিলর শেখ আলেক বলেন, “আগের তুলনায় জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেন না থাকায় টঙ্গীর অধিকাংশ এলাকাই বৃষ্টির সময় পানিতে ডুবে যায়। দেওড়া, আউচপাড়া, সফিউদ্দিন রোড ও আদর্শপাড়া হয়ে তুরাগ নদীতে সংযোগকারী কয়েকটি বড় ড্রেন নির্মাণ করা গেলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
এ বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী জোনের (অঞ্চল-১) আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, পুরোনো ড্রেন দিয়ে বর্তমানের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না। নতুন ড্রেন নির্মাণের জন্য টেন্ডার হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। বিআরটি করিডোরের পাশ দিয়ে বাঁশপট্টি হয়ে একটি বড় ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
টঙ্গী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, বেক্সিমকো এলাকা থেকে মোক্তারপাড়া, কলেজ রোড ও সফিউদ্দিন রোড হয়ে নদী পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ৩৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির কাজ আগামী মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে টঙ্গী এলাকার জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করছি।
এদিকে বৃহত্তর জয়দেবপুর বাজার ব্যবসায়ীক কমিটির সভাপতি রায়হান আল মাহমুদ রানা বলেন, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী জয়দেবপুর বাজারের জলাবদ্ধতা ও নানা সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করতে করতে আমরা ক্লান্ত। এখন তাদের কাছ থেকে আমরা আর কিছু আশা করছি না।
তিনি বলেন, জয়দেবপুর পৌরসভা থাকাকালীন সময়ে প্রায় ৩৭ বছর আগে যে সব ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছিল, সেইগুলিই এখনও বিদ্যমান আছে। এগুলি অনেক জায়গায় সরু হয়ে গিয়েছে, ভেঙ্গে গিয়েছে, ভরা হয়ে গিয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি দোকানপাটে ঢুকে যায়। সিটি করপোরেশন গঠন হবার পর আর কোন কাজ করা হয়নি। অথচ ঐ সময়ের চেয়ে বর্তমানে চাহিদা বেড়েছে প্রায় ২০ গুন কিন্ত কাজ হয়নি এক গুনও । তিনি বলেন, এ বাজার থেকে আমরা প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার রাজস্ব দেই কর্তৃপক্ষকে অথচ অবকাঠামো উন্নয়নে এখানে কোন কাজ করা হয় না। তিনি অবিলম্বে ড্রেন নির্মাণসহ বাজারের অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহন ও তা বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক জানান, সিটি এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১২০ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান ড্রেন পরিষ্কার, প্রশস্তকরণ এবং নতুন ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। গাছা এলাকায় বড় ড্রেন নির্মাণের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে চিলাই নদীর পুনঃখনন এবং মোগড়খাল পুনঃখননের কাজও চলমান রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ নয়; খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ, পরিকল্পিত নগরায়ন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া গাজীপুরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আর দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতি বর্ষায় নগরবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

























