
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি,
বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত সেবাকে আধুনিক, সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত এবং জনবান্ধব করে তুলতে আজ রাজধানীর ৭১ পুরানাপল্টনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’-এর শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। ভূমি ভবনে অবস্থিত প্রথম নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্রের অভাবনীয় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এই দ্বিতীয় কেন্দ্রটি চালুর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে দ্রুত ভূমিসেবা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, এমপি বলেন, ভূমির অধিকার রক্ষা ও সেবা প্রাপ্তি প্রত্যেকটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশে ভূমিসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে জটিলতা ও নানা অভিযোগ যুগ যুগ ধরে ছিল। সাধারণ মানুষকে এক টুকরো জমির জন্য বছরের পর বছর ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার গণমানুষের কষ্ট দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই—একটি আধুনিক ও জনবান্ধব ভূমিসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ জনগণ সম্মান ও স্বস্তির সাথে তাদের অধিকার ও সেবা বুঝে পাবেন। ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’ এই যাত্রায় এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক ও জনবান্ধব সেবা পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এবং সুবিধাজনক স্থানে কোনো ধরনের দুর্ভোগ বা বিলম্ব ছাড়াই নির্বিঘ্নে ভূমিসেবাকে সহজলভ্য করার প্রত্যয় নিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’। অতীতে ভূমিসেবাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে নানাবিধ ভোগান্তি ও জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় আমরা সেই পুরনো ধারার আমূল পরিবর্তন এনেছি। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ভূমিসেবাকে কীভাবে আরও জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করা যায়, সে লক্ষ্যেই আমরা একের পর এক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছি।
প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল আরও বলেন, ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’ কেবল একটি সেবা কেন্দ্র নয়; এটি জনগণের প্রতি আমাদের জবাবদিহিতা ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার প্রতীক। এখানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নাগরিকগণ বিনামূল্যে অতি সহজে, অল্প সময়ে এবং নির্ভুলভাবে ভূমি সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, জনগণের আস্থা তত বৃদ্ধি পাবে। ভূমিসেবায় অনিয়ম ও হয়রানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এই কেন্দ্রটি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। আমরা প্রতিনিয়ত এই সেবাগুলোর পরিধি ও মান বৃদ্ধি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবসময় একটি কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বাংলাদেশের প্রকৃত জনগণই এই দেশের মূল মালিক। আর আমরা যারা জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বে আছি, আমরা আপনাদের শাসক নই, বরং আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করতে এসেছি। জনগণের সেবায় নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেওয়ার এই রাজনৈতিক দর্শন ও দীক্ষাই বর্তমান সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের মূল চালিকাশক্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল তাঁর বক্তব্যে আরও স্পষ্ট করে জানান, এই বিশেষ সেবা কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হলো দেশের সাধারণ মানুষকে সব ধরনের ভোগান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেবা প্রদান করা। এখানে আগত প্রতিটি সেবাগ্রহীতা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশে সঠিক আইনি ও প্রশাসনিক পরামর্শ পাবেন। পাশাপাশি খতিয়ান সংগ্রহ, নামজারি (মিউটেশন) এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও সেবা একই ছাদের নিচে নিশ্চিত করা হবে।
সেবা প্রদান কার্যক্রমে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কোনো সুযোগ এখানে দেওয়া হবে না। এই সেবা কেন্দ্রে কোনো প্রকার দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী বা অননুমোদিত ব্যক্তির উপস্থিতি কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভূমির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভূমিসেবা খাতকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব করে তুলতে হবে। সেবামূলক এই কার্যক্রমে কোনো ধরনের শৈথিল্য সহ্য করা হবে না উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার কড়া নির্দেশনা দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী ভূমিসেবায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজ আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের দিন। আধুনিক ও জনবান্ধব ভূমিসেবা নিশ্চিতকরণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আমরা ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’চালু করতে যাচ্ছি। বাংলাদেশের ভূমিসেবা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী আরও বলেন, “নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্রসমূহের মাধ্যমে আমরা সাধারণ জনগণের হাতের নাগালে ভূমি সংক্রান্ত নানাবিধ সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। প্রথম কেন্দ্রটির সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র-২’ চালু করছি, যা ভূমিসেবা গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজ করবে। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—কোনো নাগরিক যেন ভূমিসেবা নিতে এসে কোনো প্রকার হয়রানি বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের শিকার না হন। এই কেন্দ্র থেকে ই-নামজারি ও খতিয়ানের সার্টিফাইড কপির আবেদন দাখিল, অনলাইনে ভূমিসেবা ফি ও ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও সেবা অত্যন্ত সহজে বিনামূল্যে প্রদান করা হবে। আমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে সেবা প্রদান নিশ্চিত করার আহবান জানাই।”
উদ্বোধনী পর্বে অন্যান্যদের মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন। নতুন চালু হওয়া এই কেন্দ্রে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা গ্রহণকারীরা অতি দ্রুত ও স্বচ্ছ উপায়ে ভূমিসেবা সহায়তা এবং ভূমি সংক্রান্ত জটিল সমস্যার সুপরামর্শ ও সমাধান পাবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

























