
চট্টগ্রাম ব্যুরো,
বাংলাদেশে আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইসিসিডি) বা শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে আগামিতে উন্নতজাতি গঠনে শিশু গর্ভধারনপূর্ব মায়ের অজ্ঞতা প্রশিক্ষণ এবং শিশু জন্ম পরবর্তী ১০০০ দিন বা তিন বছর তার সকল প্রকার যত্ন ও পুষ্টি করতে হবে।
বুধবার চট্টগ্রাম শহরের স্থানীয় হোটেলে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন) এবং কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) যৌথভাবে ‘সেলিব্রেটিং হোল চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: দ্যা ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক একটি আঞ্চলিক প্রচার ও মতবিনিময় কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালার শুরুতে গবেষণার মূল ফলাফলগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। শিশুর প্রাক-শৈশব বিকাশের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে কর্মশালায় মূল নিবন্ধ তুলে ধরেন বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের ভাইস-চেয়ার মাহমুদা আখতার। নীতিমালা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিষয়ক গবেষণা ফলাফল তুলে ধরেন বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ফারাহ মুনীর।
আলোচকরা বলেন, প্রাক-শৈশব বিকাশের লক্ষ্য হলো শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষা, সুরক্ষা, এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশকে একই কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। তারা আরো বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছরে সঠিক যত্ন ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শিশুর ভবিষ্যৎ শেখার ক্ষমতা, সুস্বাস্থ্য, ও সামগ্রিক সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হয়।
আলোচকরা বাংলাদেশে ইসিডি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। একইসঙ্গে শিশুদের জন্য চলমান বিভিন্ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা, অর্জন, ও মূল্যায়নের ফলাফল তুলে ধরে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও আলোচনা করেন। আয়োজকরা বলেন, শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা খাতের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
কর্মশালায় জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, স্থানীয় পর্যায়ের ইসিডি কমিটির সদস্য, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিনিধি, এবং গবেষক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রারম্ভিক শিক্ষা, সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় শিশুযত্ন, এবং পরিবার ও কমিউনিটির সহায়তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘ক্যাটালাইজিং হোলচাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২০২৬ সময়কালে পাঁচটি উন্নয়ন ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠান শিশুর সামগ্রিক বিকাশের কার্যক্রমকে জাতীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করছে। এই উদ্যোগের লার্নিং পার্টনার হিসেবে বিআইজিডি প্রকল্পটির শিখনমুখী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে এবং ইসিসিডি ব্যবস্থার বাস্তবায়নে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা তুলে ধরেছে। অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল উক্ত মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ও বাস্তবায়ন-অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, গবেষক, ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে বাংলাদেশের ইসিসিডি ব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা।
প্লাবন কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, বলেন অভিভাবকদের এই কর্মসূচিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা এতটাই ব্যস্ত যে সন্তানদের জন্য সময় বের করতে পারি না। আমরা সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে চাই, তাদের মানসিক বিকাশে যুক্ত থাকতে চাই।” তিনি আরো বলেন, শিশুর সামগ্রিক বিকাশে বাবাদের কীভাবে যুক্ত করা যায় তা জানাও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. আহসানউল্লাহ সরকার বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা মানে কেবল র্যাম্পের মতো সুবিধা নয়; এর জন্য প্রতিবন্ধী শিশুদের সক্রিয়ভাবে প্রারম্ভিক শৈশব কর্মসূচিতে যুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই প্রারম্ভিক বছরগুলোতেই বোঝা যায় অন্য শিশুদের মতো সমান সুযোগ পেতে তাদের প্রকৃতপক্ষে কী প্রয়োজন।” তিনি বলেন, এই অন্তর্ভুক্তি বাস্তবে রূপ দিতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক জাহিদুল হক খান; চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলীউর রহমান; চ্যানেল আই চট্টগ্রামের বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ; এবং স্টার নিউজ ২৪বিডি.কম-এর সম্পাদক এ এফ এম বোরহান। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা শিশু ও পরিবারের কল্যাণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে ইসিডি কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ এবং শিশুদের উন্নয়নে তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক, মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে চাকরি হারানোর ভয় ছাড়াই কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের যত্ন নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি আমাদের কর্মজীবী মায়েদের সহায়তা করতে চাই, তাহলে আমাদের ডে-কেয়ার সেন্টার দিতে হবে। বর্তমান সরকার এ বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে এবং জেলার কর্মজীবী মায়েদের জন্য তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে।”

























