
সালমান মির্জা, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি,
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা থেকে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে হরেকরকম দেশি প্রজাতির মাছ। নদী-নালা, খাল-বিল ও ডোবা-গর্ত ভরাট হয়ে যাওয়া, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, নির্বিচারে ছোট মাছ নিধন এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে অনেক প্রজাতি আজ অস্তিত্ব সংকটে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এই জনপদ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে দেশি মাছের ঐতিহ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, ছোট মাছের উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা, জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এবং কৃষি জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক উৎসের সুস্বাদু এসব মাছ কেবল রূপকথার গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মিঠা পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৫৪ প্রজাতি এখন চরম হুমকির মুখে। রায়পুর অঞ্চল থেকে এরই মধ্যে খয়ড়া, মায়া, লালচাঁদা, কাকলে, রিটা, আইড়, পাবদা, তপসে, সরপুঁটি, তিতপুঁটি ও ঝায়াসহ ১৫ প্রজাতির মাছ বিলীন হয়ে গেছে। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে টেংরা, খলুই, ভেদা, শিং, কৈ, মাগুর, বেলে, টাকি, খলিশা, পুঁটি ও বাইমসহ নানা জাতের মাছ। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাইব্রিড কৈ ও আফ্রিকান মাগুর চাষ হচ্ছে, তবে স্বাদ ও গুণাগুণের দিক থেকে তা দেশি মাছের ধারেকাছেও নয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জাদুঘর ও জীববৈচিত্র্য কেন্দ্রের জরিপে দেখা গেছে, দেশজুড়ে হুমকির মুখে পড়া মাছের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে এবং ২৫ প্রজাতির মাছ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বছর দশেক আগেও গ্রামীণ হাট-বাজারে যেসব ছোট মাছ সস্তায় মিলত, এখন তা কেবল উচ্চবিত্তের পাতে শোভা পায়।
উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার জলাশয় থাকলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে অধিকাংশ এখন পানিশূন্য। বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টির অভাবে মাছ বংশ বিস্তার করতে পারছে না। স্থানীয় জসিম উদ্দিন ও রফিক মিয়ার মতো অনেক মৎস্যজীবী মাছ না পেয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে এখন অটো-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। চরবংশী গ্রামের মৎস্যজীবী করিম মাঝির অভিযোগ, প্রভাবশালীরা মৎস্যজীবী সেজে সরকারি খাল-বিল ইজারা নিয়ে কারেন্ট জাল ব্যবহার করে দেশি মাছের বংশ ধ্বংস করছে এবং সেখানে বিদেশি শংকর জাতের মাছ চাষ করছে। এতে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাছের বর্তমান বিপর্যয়ের মূল কারণ। বিষের প্রভাবে মাছের ডিএনএ ও আরএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে ডিম ধারণ ক্ষমতা ৪০ ভাগ এবং বাচ্চা প্রস্ফুটনের হার ২৫ ভাগ কমে গেছে। রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, নদ-নদীর প্রবাহ হ্রাস ও নির্বিচারে খাল সেচে মাছ ধরার কারণে প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হচ্ছে। হ্যাচারিতে পানি সংকট থাকলেও এখন খাল থেকেও পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। রায়পুরের সচেতন মহল মনে করেন, সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হারিয়ে যাওয়া এসব দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

























