Dhaka , Monday, 3 August 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
টক্সিকে যশ–কিয়ারার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা, কড়া জবাব হুমা কুরেশির ভারতীয় দলে ডাক পাওয়া কে এই আকিব নবি জ্বালানির দাম বাড়তেই যুক্তরাজ্যে চুরির হিড়িক, প্রতিদিন উধাও ৩ কোটি টাকার তেল জনতাসহ সরকারি সব ব্যাংকে নিয়মিত পদোন্নতির দাবি বিরোধী দল শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল দুবাইয়ে বেনজীরের জামিন নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আত্মগোপনে থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি; চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার মূল আসামি গ্রেফতার, উদ্ধার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্র চন্দনাইশে মাদকসহ আটক দুই তরুণকে রাজনৈতিক মামলায় চালান ​পীরগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযান: মাদক ও যানবাহনসহ গ্রেফতার ১, পলাতকদের খোঁজে তৎপরতা মধুপুরের ব্যস্ততম সাথী সিনেমা হল সড়ক এখন মরণফাঁদ, চরম দুর্ভোগে জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী দলের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রামু গর্জনিয়াতে শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা বিতরণ করলেন ইউএনও জিল্লুর রহমান রামুতে ইট প্রস্তুতকারক সমিতির নতুন কমিটি গঠন; সভাপতি রফিক, সম্পাদক জামাল লোহাগাড়ায় সাদিয়া-ইভার প্রাইভেটকারে গোপন চেম্বারে তল্লাশি চালিয়ে ১৬ হাজার ইয়াবা; আটক ৪ রূপগঞ্জের নারী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র সহিতুন্নেছা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজে নতুন অধ্যক্ষের যোগদান পাইকগাছায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উদ্বোধন ও আলোচনা সভা জন্মভূমি পাইকগাছায় পিসি রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন মধুপুরে বিকাশের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত মধুপুরে কুকুরের আক্রমনে আহত -৩, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এলাকাবাসী পটিয়া থানা পুলিশের দুর্ধর্ষ অভিযান; ০৪টি চোরাই সিএনজি অটোরিকশাসহ আন্তঃজেলা চক্রের ০৩ সদস্য গ্রেফতার আমরা মালিক নই, দেশের ১৮ কোটি জনগণের সেবক:- ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল যৌতুক ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে নিজের পরিবার থেকেই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে:- ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দিনের জন্যও দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করেনি: সাবেক রাবি উপাচার্য কাউখালীতে কঁচা নদীতে নৌ পুলিশের অভিযানে ৭ হাজার মিটার অবৈধ বেহুন্দি জাল উদ্ধার, আগুনে ধ্বংস চরভদ্রাসনের নবাগত ইউএনওর সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। জনগণই দেশের আসল মালিক, দল-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য: প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল মধুপুরে বিজিএসের উদ্যোগে তিন মাসব্যাপী সেলাই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন ছাত্র জনতার বিপ্লবের প্রতিফলন এদেশের মানুষ এখনো পায়নি: রামগঞ্জে জুলাই যোদ্ধা সানজিদা চৌধুরী এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না: ডিসি জাহিদ ইসলাম

র‍্যাবের জালে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘গলাকাটা বাচা’, জঙ্গল সলিমপুর ও বায়েজিদ এলাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 04:12:08 pm, Saturday, 4 April 2026
  • 57 বার পড়া হয়েছে

ইসমাইল ইমন, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম মহানগরী এবং পার্শ্ববর্তী সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী সাদ্দাম হোসেন, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘গলাকাটা বাচা’ নামে পরিচিত, তাকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৭)। গত ০৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ, শুক্রবার, এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সলিমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একাধিক হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখলসহ অসংখ্য মামলার এই পলাতক আসামির গ্রেফতারে বায়েজিদ, সীতাকুণ্ড ও জঙ্গল সলিমপুরসহ আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে এবং তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

র‍্যাব-৭, চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে, চট্টগ্রাম মহানগরীর একাধিক থানার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’ (৩৭) চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানাধীন দক্ষিণ সলিমপুর এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-৭ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ০৩ এপ্রিল আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে উক্ত এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের এক পর্যায়ে সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র‍্যাব। তার পিতার নাম আব্দুল করিম এবং তার স্থায়ী ঠিকানা বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিন নগর এলাকার মুক্তিযোদ্ধার কলোনী বলে জানা গেছে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিডিএমএস পর্যালোচনায় তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ, চকবাজার, ডাবল মুরিং, বায়েজিদ বোস্তামি, আকবর শাহ্ এবং সীতাকুণ্ড থানায় হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, চুরি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, নাশকতা ও ভূমি দখলসহ মোট ০৭টি মামলার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গ্রেফতারকৃত আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

একজনের পতনে যেভাবে ভেঙে গেল অপরাধের দুর্গ
সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’ শুধু একজন সাধারণ সন্ত্রাসী নন, তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের মতে, তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে একাধিক হত্যা ও ডাবল মার্ডারের মতো গুরুতর অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত। তিনি কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রধান বিচরণক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা এবং সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। বর্তমানে তিনি বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার বাংলাবাজার ডেবার পাড় স্থানে বসবাস করছিলেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাদ্দাম হোসেন কেবল এককভাবে অপরাধ করতেন না, বরং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতৃত্ব দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। তার সহযোগীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই চক্রটি বিশেষ করে রাতের বেলায় সক্রিয় হয়ে উঠত এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “এই সাদ্দাম হোসেন বাচা খুব ভয়ংকর। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকতাম। কখন কী হয় বলা যেত না। সন্ধ্যার পর আমাদের ছেলেমেয়েদের বাইরে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।” আরেকজন বলেন, “প্রতিদিন কোনো না কোনো ঘটনা সে বা তার বাহিনী ঘটাচ্ছে, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না।”

গ্রেফতার ও জামিন, অতঃপর ফের অপরাধ
সাদ্দাম হোসেনের অপরাধ জগতের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে একাধিকবার গ্রেফতার হলেও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন জটিলতা ও ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তিনি জামিনে বের হয়ে আসতেন এবং পূর্বের চেয়েও ভয়ংকর রূপে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেন। পুলিশি নথি, এজাহার ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলেও সেসব মামলার বেশিরভাগই এখনো বিচারাধীন। বারবার তার এই মুক্তি জনমনে এক ধরনের ভীতি, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা পত্রিকার অনলাইন পোর্টালে দুই দিন আগেই তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে এবং তার গ্রেফতার অভিযানে গতি সঞ্চার করে।

সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে ‘গলাকাটা বাচা’ ও তার সহযোগীদের অপরাধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল উদ্বেগজনক। প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার পরিবারের কয়েক লক্ষাধিক মানুষ এখানে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামলেই ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা, জুয়া, অস্ত্রের মহড়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আরো অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি শক্তিশালী অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল, যার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেন বাচার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই চক্রটি শুধু অপরাধেই জড়িত ছিল না, বরং সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। এই অবৈধ অর্থ দিয়েই সন্ত্রাসী লালন-পালন ও অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলা হতো।

‘গলাকাটা বাচা’ এই সন্ত্রাসীদের অন্যতম প্রধান যোগানদাতা ও আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করতেন। প্রশাসনের অভিযানে যখন অন্যান্য সন্ত্রাসীরা দিশাহারা হয়ে পড়ত, তখন তারা গলাকাটা বাচার আস্তানায় আশ্রয় নিত।

ভূমিদস্যুতা এই অঞ্চলের একটি বড় সমস্যা। সরকারি পাহাড় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অবৈধভাবে দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করা ছিল এই চক্রের আয়ের প্রধান উৎস। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছিল, অন্যদিকে অপরাধচক্রের আর্থিক শক্তিও বাড়ছিল। একইসাথে এলাকায় মাদক ব্যবসার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল, যার কারণে তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল এবং অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছিল।

আধুনিক অপরাধের কৌশল হিসেবে এই চক্রটি সোশ্যাল মিডিয়াকেও ব্যবহার করত। তাদের নামে-বেনামে একাধিক ফেসবুক আইডি ছিল, যা ব্যবহার করে তারা প্রতিনিয়ত গুজব ছড়াত এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত। প্রশাসনের কোনো অভিযানের পর তারা ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাত।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বর্তমানে প্রশাসনের একাধিক ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে এখনো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। তারা মনে করেন, এসব সন্ত্রাসীদের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দিতে হলে প্রশাসনের আরও কয়েকটি ক্যাম্প স্থাপন করা জরুরি।

‘গলাকাটা বাচা’র গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগগুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

সব মিলিয়ে, সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’র গ্রেফতার চট্টগ্রাম মহানগরী ও জঙ্গল সলিমপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় মাইলফলক। তবে এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে অপরাধের মূল উৎস, অর্থাৎ ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসীদের অর্থ ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা দ্রুত, কার্যকর এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি ঘটুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

টক্সিকে যশ–কিয়ারার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা, কড়া জবাব হুমা কুরেশির

র‍্যাবের জালে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘গলাকাটা বাচা’, জঙ্গল সলিমপুর ও বায়েজিদ এলাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস

আপডেট সময় : 04:12:08 pm, Saturday, 4 April 2026

ইসমাইল ইমন, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম মহানগরী এবং পার্শ্ববর্তী সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী সাদ্দাম হোসেন, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘গলাকাটা বাচা’ নামে পরিচিত, তাকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৭)। গত ০৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ, শুক্রবার, এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সলিমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একাধিক হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখলসহ অসংখ্য মামলার এই পলাতক আসামির গ্রেফতারে বায়েজিদ, সীতাকুণ্ড ও জঙ্গল সলিমপুরসহ আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে এবং তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

র‍্যাব-৭, চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে, চট্টগ্রাম মহানগরীর একাধিক থানার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’ (৩৭) চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানাধীন দক্ষিণ সলিমপুর এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-৭ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ০৩ এপ্রিল আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে উক্ত এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের এক পর্যায়ে সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র‍্যাব। তার পিতার নাম আব্দুল করিম এবং তার স্থায়ী ঠিকানা বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিন নগর এলাকার মুক্তিযোদ্ধার কলোনী বলে জানা গেছে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিডিএমএস পর্যালোচনায় তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ, চকবাজার, ডাবল মুরিং, বায়েজিদ বোস্তামি, আকবর শাহ্ এবং সীতাকুণ্ড থানায় হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, চুরি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, নাশকতা ও ভূমি দখলসহ মোট ০৭টি মামলার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গ্রেফতারকৃত আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

একজনের পতনে যেভাবে ভেঙে গেল অপরাধের দুর্গ
সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’ শুধু একজন সাধারণ সন্ত্রাসী নন, তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের মতে, তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে একাধিক হত্যা ও ডাবল মার্ডারের মতো গুরুতর অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত। তিনি কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রধান বিচরণক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা এবং সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। বর্তমানে তিনি বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার বাংলাবাজার ডেবার পাড় স্থানে বসবাস করছিলেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাদ্দাম হোসেন কেবল এককভাবে অপরাধ করতেন না, বরং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতৃত্ব দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। তার সহযোগীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই চক্রটি বিশেষ করে রাতের বেলায় সক্রিয় হয়ে উঠত এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “এই সাদ্দাম হোসেন বাচা খুব ভয়ংকর। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকতাম। কখন কী হয় বলা যেত না। সন্ধ্যার পর আমাদের ছেলেমেয়েদের বাইরে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।” আরেকজন বলেন, “প্রতিদিন কোনো না কোনো ঘটনা সে বা তার বাহিনী ঘটাচ্ছে, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না।”

গ্রেফতার ও জামিন, অতঃপর ফের অপরাধ
সাদ্দাম হোসেনের অপরাধ জগতের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে একাধিকবার গ্রেফতার হলেও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন জটিলতা ও ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তিনি জামিনে বের হয়ে আসতেন এবং পূর্বের চেয়েও ভয়ংকর রূপে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেন। পুলিশি নথি, এজাহার ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলেও সেসব মামলার বেশিরভাগই এখনো বিচারাধীন। বারবার তার এই মুক্তি জনমনে এক ধরনের ভীতি, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা পত্রিকার অনলাইন পোর্টালে দুই দিন আগেই তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে এবং তার গ্রেফতার অভিযানে গতি সঞ্চার করে।

সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে ‘গলাকাটা বাচা’ ও তার সহযোগীদের অপরাধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল উদ্বেগজনক। প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার পরিবারের কয়েক লক্ষাধিক মানুষ এখানে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামলেই ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা, জুয়া, অস্ত্রের মহড়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আরো অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি শক্তিশালী অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল, যার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেন বাচার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই চক্রটি শুধু অপরাধেই জড়িত ছিল না, বরং সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। এই অবৈধ অর্থ দিয়েই সন্ত্রাসী লালন-পালন ও অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলা হতো।

‘গলাকাটা বাচা’ এই সন্ত্রাসীদের অন্যতম প্রধান যোগানদাতা ও আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করতেন। প্রশাসনের অভিযানে যখন অন্যান্য সন্ত্রাসীরা দিশাহারা হয়ে পড়ত, তখন তারা গলাকাটা বাচার আস্তানায় আশ্রয় নিত।

ভূমিদস্যুতা এই অঞ্চলের একটি বড় সমস্যা। সরকারি পাহাড় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অবৈধভাবে দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করা ছিল এই চক্রের আয়ের প্রধান উৎস। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছিল, অন্যদিকে অপরাধচক্রের আর্থিক শক্তিও বাড়ছিল। একইসাথে এলাকায় মাদক ব্যবসার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল, যার কারণে তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল এবং অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছিল।

আধুনিক অপরাধের কৌশল হিসেবে এই চক্রটি সোশ্যাল মিডিয়াকেও ব্যবহার করত। তাদের নামে-বেনামে একাধিক ফেসবুক আইডি ছিল, যা ব্যবহার করে তারা প্রতিনিয়ত গুজব ছড়াত এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত। প্রশাসনের কোনো অভিযানের পর তারা ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাত।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বর্তমানে প্রশাসনের একাধিক ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে এখনো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। তারা মনে করেন, এসব সন্ত্রাসীদের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দিতে হলে প্রশাসনের আরও কয়েকটি ক্যাম্প স্থাপন করা জরুরি।

‘গলাকাটা বাচা’র গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগগুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

সব মিলিয়ে, সাদ্দাম হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা বাচা’র গ্রেফতার চট্টগ্রাম মহানগরী ও জঙ্গল সলিমপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় মাইলফলক। তবে এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে অপরাধের মূল উৎস, অর্থাৎ ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসীদের অর্থ ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা দ্রুত, কার্যকর এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি ঘটুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।