
হাসান শিকদার,মানিকগঞ্জ
“কষ্ট কইরা জমিতে ফসল ফলাই, আর সেই ফসল ফলাতে গিয়া সারের দোকানে আইসা হেনস্তা হইতে হয়! সার গুদামে থুইয়া আমাদের ঘুরায়, জোর কইরা দরকার ছাড়া সার গছাইয়া দেয়। সারের চিন্তায় জমির আবাদ কমিয়ে দিছি; কৃষিকাজ ছাইড়া এহন চুরি কইরা খাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নাই!” বুকে জমানো ক্ষোভ, চোখে জল আর এক বুক হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের কৃষক আছলাম। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে যারা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখেন, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার সারের দোকানগুলোতে এখন সেই কৃষকদের তীব্র হাহাকার আর প্রতিবাদের কান্না বাতাসে ভাসছে।
মানিকগঞ্জ বিএডিসির সার-বীজ বিপণন কর্মসূচিতে জিম্মি করে কৃষকদের পকেট কাটার এক নির্মম উৎসব চলছে। কৃষকের চাহিদামতো সার না দিয়ে তাঁদের ওপর জোরপূর্বক অপ্রয়োজনীয় সার চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএডিসি ডিলার ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বাসস্ট্যান্ড এলাকার জেল গেটের বিপরীতে ‘মেসার্স ইউনিক এন্টারপ্রাইজ’ নামের এক ডিলারের দোকানে নজর রাখেন গণমাধ্যমকর্মীরা। হাতেনাতে ধরা পড়ে সেই কারসাজি ও কৃষকদের প্রতিবাদের চিত্র।
দেখা যায়, জাগির ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে কৃষকদের জিম্মি করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনতে বাধ্য করছেন। ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার নামে এক নারী কৃষক ডিলারের কাছে শুধু ডিএপি (DAP) সার চেয়েছিলেন। কারণ তাঁর ঘরে আগে থেকেই পটাশ সার কেনা আছে। কিন্তু তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, ২ বস্তা ডিএপির সাথে বাড়তি ১ বস্তা পটাশ না নিলে কোনো সারই দেওয়া হবে না।
চোখের জল মুছতে মুছতে নার্গিস আক্তার বলেন, “আমার শুধু ডিএপি দরকার, ঘরে পটাশ আছে। তবুও তারা আমাকে জোর করে হাজার টাকার উপরে বাড়তি পটাশ নিতে বাধ্য করল।”
একই পরিস্থিতির শিকার কৃষক মতিয়ার রহমান ও শাহিন। তাঁরা বলেন, “সার চাইলে বলে নাই, অথচ বাইরে ঠিকই বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। আর দোকানে আসলে বলে—পটাশ না নিলে সার পাবা না। এই অতিরিক্ত সারের দাম হাজার টাকার ওপরে। আমরা এত টাকা পামু কই?”
এ বিষয়ে দোকানে থাকা ডিলারের প্রতিনিধি কোহিনুর আলম বলেন, আমাদের এখানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা আছেন। তারা যেভাবে চাচ্ছেন সেভাবেই হচ্ছে।
বিপণনকালে উপস্থিত কল্পনা নামের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রথমে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। পরবর্তীতে গোপন ক্যামেরার সামনে তিনি যে যুক্তি দেন, তা শুনে হতবাক উপস্থিত সবাই। কর্মকর্তা কল্পনা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ডিলারের লাভের সাফাই গেয়ে বলেন, “কৃষকরা শুধু ডিএপি চায়, কিন্তু দোকানদারের তো পটাশ জমে থাকে। দোকানদার পটাশ বিক্রি করবে কীভাবে? সবাই যদি শুধু ডিএপি চায়, তাহলে ডিলারের কী হবে?” অর্থাৎ, যে কর্মকর্তা কৃষকের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত থাকার কথা, তিনি নিজেই ডিলারের অবিক্রীত সারের ব্যবসা জমজমাট করতে অসহায় কৃষকের ঘামে অর্জিত টাকা লুটে নিতে সহযোগিতা করছেন!
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কৃষককে তাঁর চাহিদার বাইরে সার নিতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কৃষকের চাহিদামতো একক সার সরবরাহ করাই ডিলারদের আইনি দায়িত্ব।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোনো ডিলার কৃষকের চাহিদার বাইরে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সার চাপিয়ে দিলে তা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মানিকগঞ্জে সারের কোনো সংকট নেই। এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা অতি দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা সুলতানা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আমরা অবশ্যই এ বিষয়টি গভীর পর্যন্ত তদন্ত করব। সারের সাথে কৃষকের পেটের ভাত ও রুটিরুজি জড়িত। সার নিয়ে কোনো ধরনের অরাজকতা বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাঠে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে কৃষক আমাদের মুখে ভাত তুলে দেন, সারের দোকানে তাঁদের এমন আকুতি ও কান্না পুরো মানবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিএডিসির সারের এই কৃত্রিম জিম্মিদশা থেকে কৃষককে বাঁচাতে এবং ডিলার-কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রান্তিক কৃষকদের রক্ষা করতে প্রশাসনের অবিলম্বে কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

























