Dhaka , Sunday, 19 April 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
হাসপাতালের চুরির রহস্য উদঘাটন: চোরাই মালামাল উদ্ধার, গ্রেফতার ৩ পাইকগাছায় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত বর্ষায় জলাবদ্ধতা কমাতে চসিকের খাল-নালা পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু মধুপুরে শালবন রক্ষায় মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম ওয়াসায় ২৩ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি বেগম জিয়া কর্তৃক ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা প্রকল্প রামগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে দোয়া অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপুরে চাঞ্চল্যকর ইটভাটা শ্রমিক মিন্টু হত্যা মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার লালমনিরহাটে হাম-রুবেলা প্রতিরোধে উদ্যোগ: টিকা পাবে দেড় লাখ শিশু শ্রীপুর থানা পুলিশের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, ঝালকাঠিতে বেড়েছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নলছিটি হদুয়া আইডিয়াল একাডেমিতে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা কুড়িগ্রামে র‍্যাব-১৩ অভিযানে প্রায় ২ মণ গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার কুড়িগ্রামে র‍্যাবের বড় সাফল্য: শোবার ঘরের খাটের নিচে মিলল ৭৬ কেজি গাঁজা, আটক ১ র‍্যাব-৭, চট্টগ্রাম এবং র‍্যাব-৬, খুলনা এর যৌথ অভিযানে চকবাজারে’র চাঞ্চল্যকর সাজিদ হত্যার পলাতক আসামি সহযোগীসহ গ্রেফতার সিএমপি’র ডিবি(উত্তর) বিভাগের অভিযানে ০১টি ৭.৬৫ মডেলের বিদেশি পিস্তলসহ আসামি গ্রেফতার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের পাশে থাকার আশ্বাস প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের মধুপুরে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে কো-অর্ডিনেশন সভা অনুষ্ঠিত শরীয়তপুরে ড্রামে তেল বিক্রি, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের উপর হামলা মধুপুরে অপরাধ পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকার সংস্থার সম্মাননা প্রদান বর্ণাঢ্য আয়োজনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপন চট্টগ্রামের মেয়েদের বিশেষ গুণ আছে – এমপি হুমাম পত্নী সামানজার খান বন্দরে চাঁদা না পেয়ে দুইজনকে কুপিয়ে আহত নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইন্স স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিল লালমনিরহাটে ১৮ এপ্রিলের শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ: গণকবর সংরক্ষণের দাবি বেতাগীতে গাছবোঝাই নছিম উল্টে  ঘটনাস্থলে একজন মৃত্যু। ফতুল্লায় গোসলঘর নির্মাণ উদ্বোধন ও বৃক্ষ বিতরণ ঝালকাঠিতে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগের প্রথম দিনের কার্যক্রম সম্পন্ন রাজাপুরে ঘর মেরামতের সময় টিনের চালা থেকে পা ফসকে পড়ে কাঠমিস্ত্রীর মৃত্যু পাইকগাছায় ‘উদয়ী-মধুরাজ’ বাজপাখি উদ্ধার; চলছে চিকিৎসা লক্ষ্মীপুরে ধানক্ষেত থেকে ইট ভাটা শ্রমিকের মুখ বাধাঁ লাশ উদ্ধার

চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, ঝালকাঠিতে বেড়েছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 06:19:29 pm, Sunday, 19 April 2026
  • 3 বার পড়া হয়েছে
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঝালকাঠি জেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জেলার চার উপজেলা—ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া জুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।ভোগান্তিতে পড়েছেন এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্স ৪র্থ বর্ষের পরিক্ষার্থীরা, পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরাও চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব এলাকায় মোট চাহিদা প্রায় ২৮০ মেগাওয়াট হলেও বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জেলার রাজাপুর উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এতে এলাকার একটি বড় অংশে লোডশেডিং করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে লো ফ্রিকোয়েন্সি দেখা দেওয়ায় ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের মাধ্যমে ৩৩ কেভি ফিডার বন্ধ রেখে লোড ম্যানেজমেন্ট করছে, ফলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ে ঝালকাঠিবাসী এখন দিশেহারা।
ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরিক্ষার্থীরা। ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী রাকিব হোসেন ও ঝালকাঠি এনএস কামিল (নেছারাবাদ) মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী মো. তাহসিন জানায়, সন্ধ্যার সময়ই সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়। এ সময় পড়ার চাপ বেশি থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছি না।
রাজাপুর পাইলট উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. মিয়াদ ও রাজাপুর কামিল মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী মো. ইয়াসিন বলেন, শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলেই প্রচণ্ড গরম পড়ে। আমাদের ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এতো পরিমাণে লোডশেডিং হয় যার কারণে রাতে তো পড়তে পারি না, দিনের বেলাও গরমের কারণে পড়তে পারি না—চরম ভোগান্তিতে আছি। এতে আমাদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পড়তে না পারলে লিখবো কেমনে? তারপর আবার শিক্ষা মন্ত্রী বলছেন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে, অনেক হার্ড হবে—আমরা খুবই আতঙ্কে আছি।
অন্যদিকে আনোয়ারা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসা: আশা, চাড়াখালী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসা: সুমাইয়া আক্তার এবং সোনারগাঁও জবান আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান রাহাত বলেন, আমাদের সামনে এসএসসি পরীক্ষা, যা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ এবং সময় ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গ্রামে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়ে আমাদের সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। রাতে পড়তে বসলে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে যায়, ফলে পড়ার আগ্রহ কমে যায় এবং অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঠিকমতো শেষ করা যায় না। সব থেকে বেশি গ্রামে লোডশেডিং হচ্ছে, যার ফলে আমাদের ভোগান্তি বেশি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ—অন্তত পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যেন লোডশেডিং কমানো হয়।
রাজাপুর সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. তুহিন ও মারিয়া জান্নাত, বড়ইয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহসিন ও মো. রায়হান, আলহাজ লালমন হামিদ মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুল এশা বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা। আসন্ন দুইটি পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে এমন বিদ্যুৎ সংকট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
তারা আরও বলেন, রাজাপুরে প্রতিদিন রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। আর বিদ্যুৎ থাকলেও অসহনীয় গরমে রুমে পড়ায় মনোযোগ বসে না। গত কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে প্রতিদিনই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি করছে। সামনে পরীক্ষা—এ সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার জোর দাবি জানাই।
রাজাপুর কামিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এখন শিক্ষার্থীরা শুধু পড়ার টেবিলে বসবে, কিন্তু এই গরমে যদি ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে পড়তে সমস্যা হয়। পরীক্ষার এই কয়েকদিন যদি রাতে ঠিকভাবে বিদ্যুৎ থাকে এবং লোডশেডিং কম হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। ঝালকাঠি শহরের ব্যবসায়ী বারেক মল্লিক বলেন, ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতা কমে যায়, আবার সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হয়—সব মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছি।
ঝালকাঠির সামাজিক সংগঠন ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটি (ইয়াস)-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন রানা বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং এখন জনজীবনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, সরকারি দপ্তরসহ নগর এলাকার ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল ও হাইব্রিড প্রযুক্তি স্থাপন, এবং দেশীয় উৎপাদন ও সহজ আমদানির মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ঝালকাঠি শহরের ইজিবাইক চালক মোসলেম বেপারী বলেন, তেলের সংকটে মোটরযানে চাপ কম থাকায় যাত্রীরা এখন বেশি ইজিবাইকে চলাচল করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। ফলে ঠিকভাবে ট্রিপ (খেপ) মারতে পারছি না। তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান বলেন, জেলার উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্নভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া ফিডারে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রিড থেকে এবং নলছিটি ও ঝালকাঠি ফিডারে বরিশাল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে (ঢাকা থেকে) লাইন বন্ধ করে দিলে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লোডশেডিং তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, ৩৩ কেভি স্ক্যাডা সিস্টেমের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে লোড নিয়ন্ত্রণ করা হয়, ফলে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং বন্ধ রাখতে চাইলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর উপসহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম বলেন, গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার ভিত্তিতেই রোটেশন করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ধরুন কোনো ফিডারে ১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলে আমরা ৬ থেকে ৮ মেগাওয়াট পাচ্ছি। বাকি ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ আরও কমে গেলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেড়ে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং কিছুটা বেশি হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসপাতালের চুরির রহস্য উদঘাটন: চোরাই মালামাল উদ্ধার, গ্রেফতার ৩

চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, ঝালকাঠিতে বেড়েছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ

আপডেট সময় : 06:19:29 pm, Sunday, 19 April 2026
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঝালকাঠি জেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জেলার চার উপজেলা—ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া জুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।ভোগান্তিতে পড়েছেন এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্স ৪র্থ বর্ষের পরিক্ষার্থীরা, পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরাও চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব এলাকায় মোট চাহিদা প্রায় ২৮০ মেগাওয়াট হলেও বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জেলার রাজাপুর উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এতে এলাকার একটি বড় অংশে লোডশেডিং করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে লো ফ্রিকোয়েন্সি দেখা দেওয়ায় ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের মাধ্যমে ৩৩ কেভি ফিডার বন্ধ রেখে লোড ম্যানেজমেন্ট করছে, ফলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ে ঝালকাঠিবাসী এখন দিশেহারা।
ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরিক্ষার্থীরা। ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী রাকিব হোসেন ও ঝালকাঠি এনএস কামিল (নেছারাবাদ) মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী মো. তাহসিন জানায়, সন্ধ্যার সময়ই সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়। এ সময় পড়ার চাপ বেশি থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছি না।
রাজাপুর পাইলট উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. মিয়াদ ও রাজাপুর কামিল মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী মো. ইয়াসিন বলেন, শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলেই প্রচণ্ড গরম পড়ে। আমাদের ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এতো পরিমাণে লোডশেডিং হয় যার কারণে রাতে তো পড়তে পারি না, দিনের বেলাও গরমের কারণে পড়তে পারি না—চরম ভোগান্তিতে আছি। এতে আমাদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পড়তে না পারলে লিখবো কেমনে? তারপর আবার শিক্ষা মন্ত্রী বলছেন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে, অনেক হার্ড হবে—আমরা খুবই আতঙ্কে আছি।
অন্যদিকে আনোয়ারা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসা: আশা, চাড়াখালী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসা: সুমাইয়া আক্তার এবং সোনারগাঁও জবান আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান রাহাত বলেন, আমাদের সামনে এসএসসি পরীক্ষা, যা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ এবং সময় ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গ্রামে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়ে আমাদের সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। রাতে পড়তে বসলে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে যায়, ফলে পড়ার আগ্রহ কমে যায় এবং অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঠিকমতো শেষ করা যায় না। সব থেকে বেশি গ্রামে লোডশেডিং হচ্ছে, যার ফলে আমাদের ভোগান্তি বেশি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ—অন্তত পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যেন লোডশেডিং কমানো হয়।
রাজাপুর সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. তুহিন ও মারিয়া জান্নাত, বড়ইয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহসিন ও মো. রায়হান, আলহাজ লালমন হামিদ মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুল এশা বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা। আসন্ন দুইটি পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে এমন বিদ্যুৎ সংকট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
তারা আরও বলেন, রাজাপুরে প্রতিদিন রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। আর বিদ্যুৎ থাকলেও অসহনীয় গরমে রুমে পড়ায় মনোযোগ বসে না। গত কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে প্রতিদিনই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি করছে। সামনে পরীক্ষা—এ সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার জোর দাবি জানাই।
রাজাপুর কামিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এখন শিক্ষার্থীরা শুধু পড়ার টেবিলে বসবে, কিন্তু এই গরমে যদি ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে পড়তে সমস্যা হয়। পরীক্ষার এই কয়েকদিন যদি রাতে ঠিকভাবে বিদ্যুৎ থাকে এবং লোডশেডিং কম হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। ঝালকাঠি শহরের ব্যবসায়ী বারেক মল্লিক বলেন, ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতা কমে যায়, আবার সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হয়—সব মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছি।
ঝালকাঠির সামাজিক সংগঠন ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটি (ইয়াস)-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন রানা বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং এখন জনজীবনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, সরকারি দপ্তরসহ নগর এলাকার ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল ও হাইব্রিড প্রযুক্তি স্থাপন, এবং দেশীয় উৎপাদন ও সহজ আমদানির মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ঝালকাঠি শহরের ইজিবাইক চালক মোসলেম বেপারী বলেন, তেলের সংকটে মোটরযানে চাপ কম থাকায় যাত্রীরা এখন বেশি ইজিবাইকে চলাচল করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। ফলে ঠিকভাবে ট্রিপ (খেপ) মারতে পারছি না। তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান বলেন, জেলার উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্নভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া ফিডারে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রিড থেকে এবং নলছিটি ও ঝালকাঠি ফিডারে বরিশাল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে (ঢাকা থেকে) লাইন বন্ধ করে দিলে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লোডশেডিং তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, ৩৩ কেভি স্ক্যাডা সিস্টেমের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে লোড নিয়ন্ত্রণ করা হয়, ফলে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং বন্ধ রাখতে চাইলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর উপসহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম বলেন, গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার ভিত্তিতেই রোটেশন করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ধরুন কোনো ফিডারে ১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলে আমরা ৬ থেকে ৮ মেগাওয়াট পাচ্ছি। বাকি ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ আরও কমে গেলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেড়ে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং কিছুটা বেশি হচ্ছে।