
সরওয়ার কামাল কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি।।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প । এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে আলোর ব্যবস্থা, রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া ও অতিথি আপ্যায়ন সহ প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি সৌখিন তৈজসপত্র। দামে সহজলভ্য ও স্বাস্থ্যকর হওয়ায় সব পরিবারেই ব্যবহার করা হতো মাটির তৈরী ওই সব পাত্র।
উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের বড় কুলাল পাড়া, ছোট কুলাল পাড়া, কালারমারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নলবিলা বড়ুয়া পাড়া গ্রামে মৃশিল্প পেশায় জড়িত আছে ৬০টি পরিবার। খড়, কাঠি আর মাঠির সাথে যুদ্ধ করে কুমারেরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে ঝড়, বৃষ্টি ও প্রচন্ড খরা উপেক্ষা করে এই পেশা কে ধরে রেখেছে। শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহে মাটির হাড়ি, বাহারি চিতল, পুলি ও ভাপা পিঠা সহ হরেক জাতের পিঠা তৈরীতে খোলা দধির পাতিল, টালি, ঘট, মুটকি, থালাবাসন ও অন্ধকার দূর করার মাটির বাতি সহ বিভিন্ন রকমের জিনিস তৈরি করতো গ্রাম বাংলার কুমারেরা। ওইসব মাটির জিনিসপত্র অনেকে ভ্যান যোগে আবার কেউ কেউ মাথায় নিয়ে বিক্রি করতো। আর সেই উপার্জনেই চলতো কুমারদের পরিবার। প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল ও সিলভারের তৈরিকৃত সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে ওই সব মাটির তৈরি সৌখিন জিনিসপত্র। তাই কুমারেরা পরিবার পরিজনের মুখে খাবার তুলে দিতে জাতিগত পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় যখন বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি তখন ভরসা ছিল কেবলই মাটির তৈরি বাতি। তাতে কেরাসিন তেল দিয়ে চলতো রাতের সকল কাজ। সেই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। বড় মহেশখালী ইউনিয়নের বড় কুলাল পাড়া এলাকার কুমার জসিম উদ্দিন বলেন, আমার কোন সম্পদ নেই। এক ছেলে, ৩ মেয়ে। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। অর্ধহারে ও অনাহারে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়। কালারমারছড়ার মিলনা রানী (৩৬) ও মনোরঞ্জন পাল (৭০) এর সাথে কথা হলে তারা বলেন, এক সময় বিনামূল্যে মাটি পাওয়া যেত। এখন তা পাওয়া যায়না। গত দু’বছর পূর্বেও প্রতি গাড়ি মাটির দাম যেখানে ছিল মাত্র ৪০০ টাকা। এখন সেই মাটিই ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কাঁচামাল গুলো পোঁড়াতে কাঠ ও খড়ের দাম বেড়েছে কয়েকগুন। বাজারে সব কিছুর দাম বাড়লেও শুধু মাটির তৈরি জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। ৬০ বছর বয়সী বিধবা কানন রানী বলেন, ১২ বছর বয়স হতে এ পেশায় জড়িত আছি। স্বামী মারা যাওয়ায় ছেলের সংসারে আছি। ছেলেদেরকে এখনো এ পেশায় সাহায্য করে আসছি। মাটি সংগ্রহ করে কোন জিনিস বানাতে খুব কষ্ট করতে হয়। একদিনে কোন কিছুই তৈরি করা যায়না, সময় নিয়ে বানাতে হয় এবং সেগুলি শুকিয়ে পোড়ানো হয়। আগের মতো এখন আর মাটির জিনিসের চাহিদাও নেই তেমন।
সরকারি সহযোগিতা ও বাজারে মাটির তৈরী জিনিসের চাহিদা থাকলে হাজার বছরের ঐতিহ্য হিসেবে পেশাটি টিকে থাকতে পারবে।

























