
তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,
যৌতুক, বাল্যবিবাহ, মাদক, জুয়া ও নারী নির্যাতনসহ গ্রামীণ সমাজ এবং পারিবারিক কাঠামোর ভিত নষ্টকারী সকল সামাজিক ব্যাধি নির্মূলের এক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কর্মসূচি।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত উত্তর জনপদের এই সীমান্তবর্তী জেলায় মাদক ও যৌতুকের কারণে অসংখ্য পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়েছে, বাল্যবিবাহের বলি হয়ে অকালেই ঝরে গেছে হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সামাজিক বাস্তবতা থেকে মুক্তি এবং একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও আলোকিত জনপদ বিনির্মাণের লক্ষ্যেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
এই যুগান্তকারী ও মহতী উদ্যোগের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে শুক্রবার (৩ জুলাই) রাতে লালমনিরহাট জেলা পরিষদ (নতুন) মিলনায়তনে সম্পূর্ণ যৌতুকবিহীনভাবে ৭ জোড়া বর-কনের রাজকীয় বিয়ের এক অনন্য আয়োজন সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক সমাজ সংস্কারমূলক কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং এই সামাজিক আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু এমপি।
অনুষ্ঠানে সামাজিক অপরাধগুলোর ভয়াবহ কুফল ও এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “যৌতুক ও বাল্যবিবাহের মতো জঘন্য সামাজিক কুসংস্কার এবং অপরাধগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। মাদকের ভয়াল ছোবল আজ গ্রামীণ যুবসমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করছে। এই চার শব্দ (মাদক, জুয়া, যৌতুক ও বাল্যবিবাহ) লালমনিরহাটের প্রতিটি ঘরে আজ এক নীরব আতঙ্কের নাম।”
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “একটি আলোকিত ও সমৃদ্ধ লালমনিরহাট গড়তে হলে দলমত নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। চুপ থাকার সময় এখন শেষ, এবার যাত্রা প্রতিরোধের। যৌতুকের মতো বৈষম্যমূলক ও অমানবিক প্রথা পরিবারে চিরস্থায়ী অশান্তি সৃষ্টি করে, যা থেকে সমাজকে রক্ষা করতেই এই যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে, যা আগামী দিনে গোটা দেশের জন্য একটি অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
এ সময় মিলনায়তনে উপস্থিত নবদম্পতিদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী গভীর সমবেদনা ও শুভকামনা জানান এবং নবজীবনের সূচনা লগ্নে তাদের সার্বিক কল্যাণ কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রীর সহধর্মিণী মিসেস লায়লা হাবিব, লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক একেএম মমিনুল হক, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান এবং তাঁদের সহধর্মিণীগণ।
এছাড়াও বর-কনের পরিবারের সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় সুধী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই আনন্দঘন সামাজিক মিলনমেলায় অংশ নেন।
কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে শহরের ঐতিহ্যবাহী এমটি হোসেন ইনস্টিটিউট মাঠ থেকে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কর্মসূচির একটি বর্ণাঢ্য ও বিশাল গণ-র্যালি বের করা হবে। র্যালিটি জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো প্রদক্ষিণ করে জেলার প্রাণকেন্দ্র মিশন মোড়ে এসে শেষ হবে। সেখানে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক সমাপনী ও বিশাল জনসচেতনতামূলক সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এই সমাবেশকে ঘিরে পুরো লালমনিরহাট জেলায় এখন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।

























