
জেমস আব্দুর রহিম রানা ,
বাংলাদেশ আজ এক অনন্য সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অবকাঠামোগত বিস্তার এবং বৈশ্বিক সংযোগের নতুন বাস্তবতা দেশের সামনে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার ক্ষেত্র উন্মোচন করেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি এমন কিছু সামাজিক সংকেতও দৃশ্যমান হচ্ছে, যা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। বিশেষ করে যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অনলাইন আসক্তি এবং মানসিক অস্থিরতার প্রবণতা সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, উদ্ভাবন, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে তাদের মানসিক, নৈতিক ও মানবিক বিকাশের প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নেরও অন্যতম পূর্বশর্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। কৈশোরেই বহু ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সূচনা ঘটে এবং সহায়ক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের অভাব সেই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আধুনিক বিশ্বে তরুণদের জন্য হতাশা, উদ্বেগ, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই ধরনের বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার তথ্যপ্রাপ্তিকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তুলনা, প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী মানসিকতা এবং তাৎক্ষণিক সাফল্যের সংস্কৃতিকে উসকে দিয়েছে। অনেক তরুণ বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা কমছে, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো মানবিক গুণাবলিও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে?
এর সহজ কোনো উত্তর নেই। কারণ সমস্যার শিকড় বহুমাত্রিক। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, উন্নয়নের বাহ্যিক সূচক যতই শক্তিশালী হোক, মূল্যবোধের ভিত দুর্বল হলে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হবেই।
আমরা সন্তানদের ভালো স্কুলে পাঠাই, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাই, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করি; কিন্তু সবসময় তাদের সততা, সহমর্মিতা, আত্মসংযম এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা সমান গুরুত্ব দিয়ে দিতে পারি না। ফলস্বরূপ অনেক তরুণ দক্ষতা অর্জন করলেও জীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়।
এই বাস্তবতায় মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক পুনর্জাগরণের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। আর সেই আলোচনায় ধর্মকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানবসভ্যতার নৈতিক কাঠামো নির্মাণে ধর্মীয় শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। ধর্মের আলোচনা মানেই কোনো বিশেষ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নয়। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অভিন্ন মানবিক শিক্ষাগুলোকে সামনে আনা, যা মানুষকে ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানায়।
ইসলাম ন্যায়বিচার, দয়া, সততা এবং মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।” আবার বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করল।” এই শিক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মর্যাদা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ।
খ্রিস্টধর্মে যীশু খ্রিস্ট মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে নৈতিক জীবনের মূলভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি বলেছেন “তোমরা একে অন্যকে প্রেম করো; যেমন আমি তোমাদের প্রেম করেছি”—এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, মানবিক সহাবস্থানেরও এক অনন্য দর্শন। একইভাবে “মন্দের দ্বারা পরাজিত হয়ো না; বরং ভালো দ্বারা মন্দকে জয় কর”— যীশু খ্রীষ্টের এই আহ্বান প্রতিশোধের পরিবর্তে নৈতিক শক্তির ওপর আস্থা রাখতে শেখায়।
হিন্দুধর্মে “বসুধৈব কুটুম্বকম” বা “সমগ্র পৃথিবী একটি পরিবার”—এই ধারণা বিশ্বমানবতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। বৌদ্ধধর্ম করুণা, মৈত্রী এবং অহিংসাকে মানবমুক্তির পথ হিসেবে তুলে ধরে। গৌতম বুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছেন যে বিদ্বেষ কখনো বিদ্বেষ দ্বারা দূর হয় না; বরং মৈত্রী ও সহমর্মিতাই বিদ্বেষ দূর করার কার্যকর পথ। শিখ ধর্ম মানবসেবা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধের ওপর গুরুত্ব দেয়, আর জৈন ধর্ম অহিংসাকে সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
ধর্মগুলোর আচার, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও তাদের মূল বার্তায় একটি গভীর মিল রয়েছে। সত্য, ন্যায়, সততা, করুণা, ক্ষমা, আত্মসংযম, মানবসেবা এবং পারস্পরিক সম্মান—এই মূল্যবোধগুলো সব ধর্মেরই অভিন্ন সম্পদ।
আজকের যুবসমাজের জন্য এই শিক্ষাগুলো কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়; এগুলো সামাজিক স্থিতি, মানসিক সুস্থতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ গঠনের মৌলিক ভিত্তি। যখন একজন তরুণ অন্যকে সম্মান করতে শেখে, তখন সে সহিংসতার পথে হাঁটে না। যখন আত্মসংযম শেখে, তখন ক্ষতিকর আসক্তি থেকে দূরে থাকার শক্তি অর্জন করে। যখন মানবসেবা শেখে, তখন নিজের স্বার্থের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণকেও গুরুত্ব দিতে শেখে।
এই কারণেই আজকের সময়ে যুবসমাজের সংকটকে কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি মূল্যবোধের সংকট, যা ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সবাইকে সমানভাবে ভাবতে বাধ্য করে। কারণ একজন তরুণ জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ, সহিংস বা মাদকাসক্ত হয়ে জন্মায় না; তার চারপাশের পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং সামাজিক বাস্তবতা তার ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, কৈশোর এমন একটি সময় যখন একজন মানুষের সামাজিক ও আবেগীয় অভ্যাস গড়ে ওঠে। এই সময়ে পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজের সহায়ক পরিবেশ একজন তরুণকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, অন্যদিকে বৈরী পরিবেশ তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাস্তবতা হলো, আজকের তরুণদের একটি বড় অংশ তথ্যের সাগরে বাস করলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাবে ভুগছে। তারা পৃথিবীর খবর মুহূর্তেই জানতে পারে, কিন্তু অনেক সময় নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পারে না। তারা প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, কিন্তু আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, সহনশীলতা কিংবা সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো মানবিক গুণাবলি বিকাশের সুযোগ সবসময় পায় না।
এখানেই পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবার শুধু বসবাসের স্থান নয়; এটি চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয়। একজন শিশু প্রথমে রাষ্ট্রকে চেনে না, সংবিধান বোঝে না, সামাজিক দর্শনও শেখে না। সে প্রথমে দেখে তার বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। তাদের আচরণ, ভাষা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীবনযাপন থেকেই সে নৈতিকতার প্রথম পাঠ গ্রহণ করে।
যে পরিবারে সম্মান, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা রয়েছে, সেখানে বেড়ে ওঠা সন্তানের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বেশি। বিপরীতে, যেখানে সহিংসতা, অবহেলা কিংবা সম্পর্কের ভাঙন প্রবল, সেখানে তরুণদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তবে শুধু পরিবারকে দায়ী করলেই হবে না। শিক্ষাব্যবস্থাকেও আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ভালো ফলাফল, প্রতিযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক চর্চার বিষয়গুলো পেছনে পড়ে গেছে।
একজন শিক্ষার্থী যদি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে কিন্তু সততা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধ থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে সেই শিক্ষা সমাজকে কাঙ্ক্ষিতভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে না। কারণ একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যেমন দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক।
এই বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র নয়, বরং চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র হিসেবেও নিজেদের ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে হবে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা এবং নেতৃত্ব বিকাশমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের মানবিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ দেশ। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, বিহার এবং অন্যান্য উপাসনালয় শুধু ধর্মীয় আচার পালনের স্থান নয়; এগুলো সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম। যখন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছায়, তখন তা বিভাজন নয়, বরং সংযোগ সৃষ্টি করে; বিদ্বেষ নয়, বরং সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্মের মহান শিক্ষকেরা মানুষকে ঘৃণা করতে শেখাননি; তারা মানুষকে ভালোবাসতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, দুর্বলকে সাহায্য করতে এবং সত্যের পথে চলতে আহ্বান জানিয়েছেন। কোরআনের ন্যায়বিচারের শিক্ষা, বাইবেলের ভালোবাসার শিক্ষা, গীতার কর্তব্যবোধ, বুদ্ধের করুণা, গুরু নানকের মানবসেবা কিংবা জৈন দর্শনের অহিংসা—সবই শেষ পর্যন্ত মানুষকে উন্নত মানুষ হওয়ার আহ্বান জানায়।
এ কারণেই সকল ধর্মের মানবিক শিক্ষাকে সমাজ পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক শক্তি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এখানে লক্ষ্য কোনো ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়; বরং এমন অভিন্ন মূল্যবোধগুলোকে সামনে আনা, যা সব মানুষের জন্য কল্যাণকর।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গণমাধ্যম সমাজের আয়না, কিন্তু একই সঙ্গে সমাজকে প্রভাবিত করার শক্তিও তার রয়েছে। প্রতিদিন অপরাধ, সহিংসতা এবং নেতিবাচক ঘটনার সংবাদ পরিবেশন যেমন প্রয়োজন, তেমনি ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্প, মানবিক উদ্যোগ এবং তরুণদের সৃজনশীল সাফল্যও সামনে আনা জরুরি।
কারণ মানুষ শুধু সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নেয় না; অনুপ্রেরণা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা যুবসমাজকে পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং মাদক প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায় এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
সংস্থাটির মতে, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তরুণদের সুস্থ বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়। ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ, দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে সামাজিক উন্নয়ন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই দেশের যুবসমাজ শুধু নিজের ভাগ্য নয়, একটি জাতির ভাগ্যও পরিবর্তন করতে পারে।
আজও সেই সম্ভাবনা অটুট রয়েছে। প্রয়োজন কেবল একটি সুস্পষ্ট নৈতিক ভিত্তি, একটি মানবিক সামাজিক পরিবেশ এবং এমন নেতৃত্ব, যা তরুণদের বিভাজনের পথে নয়, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করবে।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা করা। উন্নত সড়ক, আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি জাতির অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এগুলো কখনোই একটি দেশের প্রকৃত শক্তির একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। একটি জাতির স্থায়ী উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক চেতনার ওপর।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই? আমরা কি শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করতে চাই, নাকি এমন মানুষও গড়ে তুলতে চাই যারা সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, সহমর্মী এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ? আমরা কি শুধু প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা একটি প্রজন্ম চাই, নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই যারা নিজেদের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাববে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী বাংলাদেশের চরিত্র নির্ধারণ করবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, তরুণদের মধ্যে যে শক্তি, সাহস, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রয়েছে, তা কোনো জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে যদি সঠিকভাবে লালন করা যায়, তবে তারা হবে উন্নয়নের চালিকাশক্তি; আর যদি অবহেলিত হয়, তবে সেই শক্তিই সমাজের জন্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
তাই এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। পরিবারকে আবারও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চরিত্র গঠন, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক নেতৃত্ব বিকাশে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানুষের মধ্যে বিভাজনের নয়, বরং সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং মানবকল্যাণের বার্তা আরও শক্তিশালীভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। গণমাধ্যমকে নেতিবাচক ঘটনার পাশাপাশি ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণও তুলে ধরতে হবে। আর রাষ্ট্রকে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তরুণরা তাদের মেধা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক সম্ভাবনাকে বিকশিত করার সুযোগ পায়।
বিশ্বের ইতিহাস বলে, কোনো জাতি কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে মহান হয়ে ওঠে না। একটি জাতি মহান হয় তখনই, যখন তার মানুষ নৈতিকভাবে দৃঢ়, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল এবং মানবিকভাবে পরিপক্ব হয়ে ওঠে। জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তি তখনই কল্যাণ বয়ে আনে, যখন সেগুলো পরিচালিত হয় মূল্যবোধ দ্বারা।
এই কারণেই সকল ধর্মের মানবিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ ধর্মগুলোর অভিন্ন বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদে নয়, তার চরিত্রে; তার ক্ষমতায় নয়, তার ন্যায়বোধে; তার পরিচয়ে নয়, তার মানবিকতায়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের তরুণদের ওপর। তাদের হাতে প্রযুক্তি আছে, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ আছে, বিশ্বকে জানার সুযোগ আছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে তারা সততা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা, আত্মসংযম এবং মানবসেবার মতো মূল্যবোধকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
যদি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে সেই পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে, তবে বর্তমানের অনেক সংকটই ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত হবে। তখন যুবসমাজকে নিয়ে হতাশার নয়, আশার কথা বলা যাবে। তখন উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতার, অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিকতার এবং আধুনিকতার সঙ্গে মূল্যবোধের একটি সুস্থ সমন্বয় গড়ে উঠবে।
আজকের প্রয়োজন নতুন কোনো বিভাজন নয়; প্রয়োজন নতুন এক সামাজিক জাগরণ। এমন একটি জাগরণ, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিতে শেখাবে; ভিন্নতাকে সম্মান করতে শেখাবে; সত্য, ন্যায় এবং মানবকল্যাণের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে নয়, তার মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। আর সেই চরিত্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানবিক মূল্যবোধ—যে মূল্যবোধের শিক্ষা বিশ্বের সব মহান ধর্ম, দর্শন এবং মানবিক ঐতিহ্য যুগে যুগে মানুষকে দিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের আগামী দিনের পথচলায় সেই মূল্যবোধের পুনর্জাগরণই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় শক্তি।

























