Dhaka , Thursday, 22 October 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠনে লতা ইউনিয়নের দুর্গাপূজা হয়ে থাকবে অনন্য দৃষ্টান্ত মধুপুরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ত্যাগী নেতাকর্মীরা ভালো থাকলে দল ভালো থাকবে: এমপি নাদিয়া পাঠান পাইকগাছায় জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে বৃদ্ধ দম্পতির রূপগঞ্জে আদালতের ১৪৫ ধারা জারির পরও জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ মাদারীপুরে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে যুবকদের দূরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট মায়ের ভাষা ও শেকড়ের সন্ধানে কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ উচ্চতা চার ফুট ১৬ বছর ধরে মোবাইল মেরামত করে জীবিকা চালান আল-আমিন সাগরে মাছ নেই, নিষেধাজ্ঞার পরও কমছে উৎপাদন: গণহারে মাছ ধরা, নদী দূষণ ও িঅবৈধ জালকে দায়ী করছেন গবেষক নির্ভেজাল ও পুষ্টিকর ফল উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী রামুর ঈদগড় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নুরুল আজিম মাইজ্জার ইন্তেকাল বিবাহিত বনাম অবিবাহিতদের ফুটবল খেলায়, জোড়া খাসি উপহার দিলেন জামাল উদ্দিন মাস্টার দুর্গাপুরে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিজয়া পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত আমিন জুট মিলসকে উৎপাদনমুখী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে সরকার:- বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী বাঁশখালীতে SRB পরিচয়ে ব্যবসায়ী অপহরণ, ভিকটিম উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৬ রূপগঞ্জে ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই জন নিহত \ আহত তিন শামীম তালুকদারকে দেখতে হাসপাতালে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফরিদ খান গাইবান্ধায় ঘাঘট নদীতে গোসল করতে নেমে ঢাকাফেরত যুবক নিখোঁজ মাদারীপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে নেত্রকোনা মদন পৌরসভার বিভিন্ন দুর্গাপূজা মণ্ডপে পরিদর্শন করলেন বিএনপি নেতাবৃন্দ দীঘিনালায় নিজ বাড়িতে কিশোরীর মৃত্যু, কারণ অনুসন্ধান করছে পুলিশ নিউইয়র্কে গ্ল্যামারাস লুকে ধরা দিলেন তমা মির্জা তিনশ বলে ১৬০, টাইগাররা কি পারবে ৪১ রানে জিততে নিজ দেশে বিক্ষোভের মধ্যেই হঠাৎ সৌদি সফরে ম্যাক্রোঁ মৌলভীবাজারে ১,০২২ মণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো দুর্গোৎসব হিমছড়ি সৈকতে সাগরে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ আরও ২ ধর্মের শিক্ষা শুধু উৎসবে নয়, প্রতিফলিত হোক কর্মেও: ডিসি জাহিদ নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিফলন : আবু সুফিয়ান এমপি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে: এরশাদ উল্লাহ এমপি উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে সরকার: অর্থ উপদেষ্টা

সাগরে মাছ নেই, নিষেধাজ্ঞার পরও কমছে উৎপাদন: গণহারে মাছ ধরা, নদী দূষণ ও িঅবৈধ জালকে দায়ী করছেন গবেষক

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 05:58:42 pm, Thursday, 22 October 2026
  • 4 বার পড়া হয়েছে

আরিফ আহমেদ,

২৯ অক্টোবর শেষ হচ্ছে নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর মাত্র ছয়দিন পরই ইলিশ আহরণে নামার অপেক্ষায় বরিশাল জেলার ৮৫ হাজার ২৯৫ জন নিবন্ধিত জেলে। এ বছর জেলেদের জন্য চাল বরাদ্দে বড় কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের জেলেরা। তবে চাল পেলেও সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা মেনে মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও একদল মৌসুমি জেলে বিপজ্জনক জাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে। প্রশাসনকে জানিয়েও এসব কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
হিজলার রহিম ও লাহারহাটের মুজিব জেলে বলেন, “সমস্যা চাল নয়, সমস্যা হলো চাল খেয়ে জীবন চলে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, যাতায়াত ও সংসারের খরচ কোথা থেকে আসবে? আমরা নিষেধাজ্ঞা মানলেও স্থানীয় নেতাদের খুশি করে অন্যরা নদীতে মাছ ধরছে।”

নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানে। বরিশাল বিভাগে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪,২৫,০০৯ জন। গত ( ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টনে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫১ টন।
অর্থাৎ, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন, প্রায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা, নদীর পরিবেশ এবং অবৈধ মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বাড়ানো। গত দুই বছরে নিষেধাজ্ঞার পরও গড় উৎপাদন কমেছে, তবে এর আগে উৎপাদন বেড়েছিল। এবার নিষেধাজ্ঞার ফলাফল এখন পর্যন্ত ভালো মনে হচ্ছে। গত ৯ থেকে ১১ অক্টোবর হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের নদীতে ইলিশের ডিম ছাড়তে দেখেছেন গবেষকেরা।
উৎপাদন কমার কারণ হিসেবে ড. তায়েফা আহমেদ মা ইলিশ নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহার, নদীদূষণ এবং ডুবোচরের কারণে মাছের চলাচলের পথ বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। নদী ও মোহনায় পলি জমে নাব্য সংকট এবং পানির তাপমাত্রা ও গুণগত মানের পরিবর্তনও উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকের মতে, কার্যকর সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত গবেষণা, নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে গবেষকদের সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। লোকবল সংকটে সব এলাকায় নিয়মিত গবেষণা ও তদারকি করা কঠিন বলেও জানান তিনি।
এদিকে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাদিউজ্জামান জানান, জেলার ১০ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে ৮৫ হাজার ২৯৫ জন। চলতি বছরের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ৭৯ হাজার ৮৯০ জনের জন্য ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ হয়েছে। হিজলা ও সদর উপজেলায় বরাদ্দ কিছুটা কম এসেছে বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তার মতে, জেলেদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জনবল ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশালের হিজলায় অভিযান পরিচালনার সময় কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের দলের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ৯ অক্টোবর মেঘনা নদীর অন্তরবাম ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকায় সংঘর্ষে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ কয়েকজন আহত হন এবং অভিযানে ব্যবহৃত স্পিডবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে কয়েকজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা ও জরিমানা দেওয়া হয়। বাবুগঞ্জে সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়। অভিযানে ১৫ হাজার মিটারের বেশি অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়।
এই জাল সম্পর্কে মৎস্য কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, এগুলো ব্যবহার শুধু ইলিশই নয়, অন্যান্য মাছের রেনু-পোনাও নষ্ট হয়ে যায়।
এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন খোদ সমুদ্রের মৎস্যজীবীরাও। সরেজমিন পরিদর্শন সময়ে গত ১ অক্টোবর বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রেও মাছ কম পাওয়ার অভিযোগ করেছেন জেলে, মাঝি ও ব্যবসায়ীরা। চরদুয়ানীর এক মাঝি বলেন, আগে নির্দিষ্ট এলাকায় জাল ফেললে মাছ পাওয়া যেত। এখন দিনের পর দিন সাগরে থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মেলে না। দূরে যেতে হওয়ায় জ্বালানি খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে। পদ্মা সুইচ এলাকার সাবপোর্টের জেলে কবির হোসেন জানান, অনেক মাঝি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ট্রলারের জ্বালানি, বরফ ও খাবার কেনেন। ফিরে এসে মাছ বিক্রির টাকা থেকে প্রথমেই ঋণ শোধ করতে হয়।
স্থানীয় আড়তদার হুমায়ুন বলেন, আগে সকাল হওয়ার আগেই ট্রলারের সারি পড়ত। সকাল থেকে নয়টা পর্যন্ত যেখানে শতাধিক ট্রলার আসত, সেখানে এখন অনেক দিন ২০টিও আসে না। এতে জেলে ছাড়াও আড়তদার, শ্রমিক, পরিবহন ব্যবসায়ী ও বরফকলসংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
পাথরঘাটা আড়তদার সমিতির সভাপতি ও পাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ছগীর আলম বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মৎস্যসম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়। মাছের প্রজননক্ষেত্র, চলাচল ও আহরণের পরিমাণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। সাগরে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ জেলেদের দ্রুত উদ্ধারে আধুনিক নৌযান ও প্রয়োজনে সি-প্লেনের ব্যবস্থাও চান তিনি। এছাড়াও আগের তালিকা সম্পূর্ণ বাতিল করে প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন ছগীর আলম।
ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মাঝি দুলাল মাষ্টার বলেন, মাছ ধরার ব্যয় বাড়লেও মাছের পরিমাণ কমছে। ঋণ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি মেটাতে গিয়ে অনেক ট্রলারমালিক চাপে পড়ছেন। গত বছরের তুলনায় ট্রলারের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। আর এজন্য অবৈধ জাল ও ট্রলারের দাপট বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধন ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান দুলাল মাষ্টার।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা সব প্রকৃত মৎস্যজীবীর কাছে পৌঁছায় না। আয় বন্ধ থাকায় অনেকে দিনমজুরি, নির্মাণশ্রমিক কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। যে কারণে তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জেলেরা। তাদের দাবী, আগের তালিকা সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন ভাবে তালিকা তৈরি করা উচিত। তানা হলে অনেক মৃত বা জেলে নয়, এমন লোকেরাও তালিকায় থেকে যাচ্ছে। কাগজপত্রে নিবন্ধিত লাখ লাখ জেলে। (নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪,২৫,০০৯ জন)।
প্রকৃত জেলেদের সংখ্যা এতো নয় বলেও দাবী জেলেদের।
২৯ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। তাদের প্রত্যাশা, এবার জালে পর্যাপ্ত ইলিশ উঠবে। তবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, নদীদূষণ রোধ, নাব্য সংকট মোকাবিলা, পর্যাপ্ত নজরদারি এবং গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেও জেলেদের জীবিকা ও ইলিশের উৎপাদন- দুটিই অনিশ্চয়তার মুখে থেকে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠনে লতা ইউনিয়নের দুর্গাপূজা হয়ে থাকবে অনন্য দৃষ্টান্ত

সাগরে মাছ নেই, নিষেধাজ্ঞার পরও কমছে উৎপাদন: গণহারে মাছ ধরা, নদী দূষণ ও িঅবৈধ জালকে দায়ী করছেন গবেষক

আপডেট সময় : 05:58:42 pm, Thursday, 22 October 2026

আরিফ আহমেদ,

২৯ অক্টোবর শেষ হচ্ছে নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর মাত্র ছয়দিন পরই ইলিশ আহরণে নামার অপেক্ষায় বরিশাল জেলার ৮৫ হাজার ২৯৫ জন নিবন্ধিত জেলে। এ বছর জেলেদের জন্য চাল বরাদ্দে বড় কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের জেলেরা। তবে চাল পেলেও সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা মেনে মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও একদল মৌসুমি জেলে বিপজ্জনক জাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে। প্রশাসনকে জানিয়েও এসব কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
হিজলার রহিম ও লাহারহাটের মুজিব জেলে বলেন, “সমস্যা চাল নয়, সমস্যা হলো চাল খেয়ে জীবন চলে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, যাতায়াত ও সংসারের খরচ কোথা থেকে আসবে? আমরা নিষেধাজ্ঞা মানলেও স্থানীয় নেতাদের খুশি করে অন্যরা নদীতে মাছ ধরছে।”

নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানে। বরিশাল বিভাগে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪,২৫,০০৯ জন। গত ( ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টনে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫১ টন।
অর্থাৎ, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন, প্রায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা, নদীর পরিবেশ এবং অবৈধ মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বাড়ানো। গত দুই বছরে নিষেধাজ্ঞার পরও গড় উৎপাদন কমেছে, তবে এর আগে উৎপাদন বেড়েছিল। এবার নিষেধাজ্ঞার ফলাফল এখন পর্যন্ত ভালো মনে হচ্ছে। গত ৯ থেকে ১১ অক্টোবর হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের নদীতে ইলিশের ডিম ছাড়তে দেখেছেন গবেষকেরা।
উৎপাদন কমার কারণ হিসেবে ড. তায়েফা আহমেদ মা ইলিশ নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহার, নদীদূষণ এবং ডুবোচরের কারণে মাছের চলাচলের পথ বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। নদী ও মোহনায় পলি জমে নাব্য সংকট এবং পানির তাপমাত্রা ও গুণগত মানের পরিবর্তনও উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকের মতে, কার্যকর সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত গবেষণা, নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে গবেষকদের সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। লোকবল সংকটে সব এলাকায় নিয়মিত গবেষণা ও তদারকি করা কঠিন বলেও জানান তিনি।
এদিকে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাদিউজ্জামান জানান, জেলার ১০ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে ৮৫ হাজার ২৯৫ জন। চলতি বছরের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ৭৯ হাজার ৮৯০ জনের জন্য ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ হয়েছে। হিজলা ও সদর উপজেলায় বরাদ্দ কিছুটা কম এসেছে বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তার মতে, জেলেদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জনবল ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশালের হিজলায় অভিযান পরিচালনার সময় কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের দলের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ৯ অক্টোবর মেঘনা নদীর অন্তরবাম ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকায় সংঘর্ষে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ কয়েকজন আহত হন এবং অভিযানে ব্যবহৃত স্পিডবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে কয়েকজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা ও জরিমানা দেওয়া হয়। বাবুগঞ্জে সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়। অভিযানে ১৫ হাজার মিটারের বেশি অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়।
এই জাল সম্পর্কে মৎস্য কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, এগুলো ব্যবহার শুধু ইলিশই নয়, অন্যান্য মাছের রেনু-পোনাও নষ্ট হয়ে যায়।
এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন খোদ সমুদ্রের মৎস্যজীবীরাও। সরেজমিন পরিদর্শন সময়ে গত ১ অক্টোবর বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রেও মাছ কম পাওয়ার অভিযোগ করেছেন জেলে, মাঝি ও ব্যবসায়ীরা। চরদুয়ানীর এক মাঝি বলেন, আগে নির্দিষ্ট এলাকায় জাল ফেললে মাছ পাওয়া যেত। এখন দিনের পর দিন সাগরে থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মেলে না। দূরে যেতে হওয়ায় জ্বালানি খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে। পদ্মা সুইচ এলাকার সাবপোর্টের জেলে কবির হোসেন জানান, অনেক মাঝি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ট্রলারের জ্বালানি, বরফ ও খাবার কেনেন। ফিরে এসে মাছ বিক্রির টাকা থেকে প্রথমেই ঋণ শোধ করতে হয়।
স্থানীয় আড়তদার হুমায়ুন বলেন, আগে সকাল হওয়ার আগেই ট্রলারের সারি পড়ত। সকাল থেকে নয়টা পর্যন্ত যেখানে শতাধিক ট্রলার আসত, সেখানে এখন অনেক দিন ২০টিও আসে না। এতে জেলে ছাড়াও আড়তদার, শ্রমিক, পরিবহন ব্যবসায়ী ও বরফকলসংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
পাথরঘাটা আড়তদার সমিতির সভাপতি ও পাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ছগীর আলম বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মৎস্যসম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়। মাছের প্রজননক্ষেত্র, চলাচল ও আহরণের পরিমাণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। সাগরে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ জেলেদের দ্রুত উদ্ধারে আধুনিক নৌযান ও প্রয়োজনে সি-প্লেনের ব্যবস্থাও চান তিনি। এছাড়াও আগের তালিকা সম্পূর্ণ বাতিল করে প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন ছগীর আলম।
ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মাঝি দুলাল মাষ্টার বলেন, মাছ ধরার ব্যয় বাড়লেও মাছের পরিমাণ কমছে। ঋণ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি মেটাতে গিয়ে অনেক ট্রলারমালিক চাপে পড়ছেন। গত বছরের তুলনায় ট্রলারের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। আর এজন্য অবৈধ জাল ও ট্রলারের দাপট বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধন ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান দুলাল মাষ্টার।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা সব প্রকৃত মৎস্যজীবীর কাছে পৌঁছায় না। আয় বন্ধ থাকায় অনেকে দিনমজুরি, নির্মাণশ্রমিক কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। যে কারণে তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জেলেরা। তাদের দাবী, আগের তালিকা সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন ভাবে তালিকা তৈরি করা উচিত। তানা হলে অনেক মৃত বা জেলে নয়, এমন লোকেরাও তালিকায় থেকে যাচ্ছে। কাগজপত্রে নিবন্ধিত লাখ লাখ জেলে। (নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪,২৫,০০৯ জন)।
প্রকৃত জেলেদের সংখ্যা এতো নয় বলেও দাবী জেলেদের।
২৯ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। তাদের প্রত্যাশা, এবার জালে পর্যাপ্ত ইলিশ উঠবে। তবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, নদীদূষণ রোধ, নাব্য সংকট মোকাবিলা, পর্যাপ্ত নজরদারি এবং গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেও জেলেদের জীবিকা ও ইলিশের উৎপাদন- দুটিই অনিশ্চয়তার মুখে থেকে যাবে।