Dhaka , Thursday, 22 October 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠনে লতা ইউনিয়নের দুর্গাপূজা হয়ে থাকবে অনন্য দৃষ্টান্ত মধুপুরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ত্যাগী নেতাকর্মীরা ভালো থাকলে দল ভালো থাকবে: এমপি নাদিয়া পাঠান পাইকগাছায় জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে বৃদ্ধ দম্পতির রূপগঞ্জে আদালতের ১৪৫ ধারা জারির পরও জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ মাদারীপুরে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে যুবকদের দূরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট মায়ের ভাষা ও শেকড়ের সন্ধানে কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ উচ্চতা চার ফুট ১৬ বছর ধরে মোবাইল মেরামত করে জীবিকা চালান আল-আমিন সাগরে মাছ নেই, নিষেধাজ্ঞার পরও কমছে উৎপাদন: গণহারে মাছ ধরা, নদী দূষণ ও িঅবৈধ জালকে দায়ী করছেন গবেষক নির্ভেজাল ও পুষ্টিকর ফল উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী রামুর ঈদগড় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নুরুল আজিম মাইজ্জার ইন্তেকাল বিবাহিত বনাম অবিবাহিতদের ফুটবল খেলায়, জোড়া খাসি উপহার দিলেন জামাল উদ্দিন মাস্টার দুর্গাপুরে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিজয়া পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত আমিন জুট মিলসকে উৎপাদনমুখী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে সরকার:- বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী বাঁশখালীতে SRB পরিচয়ে ব্যবসায়ী অপহরণ, ভিকটিম উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৬ রূপগঞ্জে ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই জন নিহত \ আহত তিন শামীম তালুকদারকে দেখতে হাসপাতালে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফরিদ খান গাইবান্ধায় ঘাঘট নদীতে গোসল করতে নেমে ঢাকাফেরত যুবক নিখোঁজ মাদারীপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে নেত্রকোনা মদন পৌরসভার বিভিন্ন দুর্গাপূজা মণ্ডপে পরিদর্শন করলেন বিএনপি নেতাবৃন্দ দীঘিনালায় নিজ বাড়িতে কিশোরীর মৃত্যু, কারণ অনুসন্ধান করছে পুলিশ নিউইয়র্কে গ্ল্যামারাস লুকে ধরা দিলেন তমা মির্জা তিনশ বলে ১৬০, টাইগাররা কি পারবে ৪১ রানে জিততে নিজ দেশে বিক্ষোভের মধ্যেই হঠাৎ সৌদি সফরে ম্যাক্রোঁ মৌলভীবাজারে ১,০২২ মণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো দুর্গোৎসব হিমছড়ি সৈকতে সাগরে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ আরও ২ ধর্মের শিক্ষা শুধু উৎসবে নয়, প্রতিফলিত হোক কর্মেও: ডিসি জাহিদ নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিফলন : আবু সুফিয়ান এমপি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে: এরশাদ উল্লাহ এমপি উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে সরকার: অর্থ উপদেষ্টা

মায়ের ভাষা ও শেকড়ের সন্ধানে কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 07:39:07 pm, Thursday, 22 October 2026
  • 6 বার পড়া হয়েছে

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,

নিজের শেকড়, মায়ের মুখের ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে রচিত রংপুরের আঞ্চলিক কাব্যগ্রন্থ ‘আও’-এর মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি রিয়াজুল হক সরকারের এই ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থে রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের কথ্য ভাষা, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কাব্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় ভাষাকে সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আঞ্চলিক ভাষার সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আয়োজন।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় লালমনিরহাট জেলা শহরের ভোকেশনাল রোডে মৃধাবাড়ীর ‘গল্পকথা’ প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মৃধাবাড়ী প্রকাশনীর প্রকাশনায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেন শাহ আলম সরকার। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন আজিজুল হক বাবু মোল্লা ও আহমেদ হোসেন লিটন।

আঞ্চলিক ভাষায় শেকড়ের অনুসন্ধান

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের নিজস্ব ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্য চর্চার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় আঞ্চলিক ভাষাকে কবিতার মাধ্যমে ধারণ করে ‘আও’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে নতুন আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

আঞ্চলিক ভাষা মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, জীবনযাপন, আবেগ, হাসি-কান্না ও সামাজিক সম্পর্কেরও পরিচায়ক। কবি রিয়াজুল হক সরকার তাঁর কাব্যগ্রন্থে রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের অকৃত্রিম ভাষাকে সাহিত্যের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য, শব্দের ব্যবহার ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অনুভূতিকে কাব্যিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

অনুষ্ঠানে আলোচকেরা বলেন, মাতৃভাষার আঞ্চলিক রূপ কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। বরং এসব ভাষার মধ্যেই একটি জনপদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যচর্চা বাড়লে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

 অতিথিদের বক্তব্য ও সাহিত্য আলোচনা

শাহ আলম সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবির শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ বর্মা, অনিমেষ বৈদ্য ও মিস মেরী কর্মকার। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আব্দুর রহিম মৃধা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মৃধাবাড়ীর পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য দেন মমিনুল আলম রাসেল। এরপর কাব্যগ্রন্থ ‘আও’ নিয়ে আলোচনা করেন বাউল নিশি রায়। আলোচনায় বইটির বিষয়বস্তু, আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য এবং লোকজ সংস্কৃতিকে সাহিত্যে ধারণ করার গুরুত্ব উঠে আসে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন কবির বাল্যবন্ধু ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান হাফিজ, অ্যাডভোকেট ময়েজুল ইসলাম ময়েজ, সরমিন আরা হক বিথী, মনসুর সরকার, লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, তহমিনা বেগম ইলা, আব্দুস সালাম, সোহেল রানা এবং পূর্বা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী বাদল সাহা শোভনসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানে কবি রিয়াজুল হক সরকারও উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি ভাষার প্রচলিত ও প্রমিত রূপের পাশাপাশি আঞ্চলিক রূপও মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় ভাষার শব্দ, বাক্যভঙ্গি ও প্রকাশরীতির মধ্যে এমন অনেক জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা থাকে, যা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এ ধরনের সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির স্মারক হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।

কবি রিয়াজুল হক সরকারের সাহিত্যযাত্রা

অনুষ্ঠানে কবির পরিচিতি ও জীবনপথ তুলে ধরে জানানো হয়, রিয়াজুল হক সরকার ১৯৭৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট শহরসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী সতীনদীর তীরবর্তী হাড়ীভাঙ্গা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নদীটি বর্তমানে মরাসতী নামে পরিচিত। তাঁর পিতা মরহুম নবিয়ার রহমান সরকার এবং মাতা মরহুমা রোকেয়া খাতুন।

তিনি লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।

নব্বইয়ের দশকে স্থানীয় প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন ‘অহনা’ ও ‘সায়াহ্ন’ কবিতা সংসদের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের অধিকার আদায়ের কাজেও যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি কোনো দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত নন বলে অনুষ্ঠানে তাঁর পরিচিতি পর্বে উল্লেখ করা হয়।

তাঁর সৃষ্টিশীল রচনায় সামাজিক অসংগতি, সমসাময়িক বাস্তবতা ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘আও’ কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে রংপুর অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে সাহিত্যে তুলে ধরার প্রয়াস তাঁর সাহিত্যচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে আলোচনায় আসে।

নির্বাচিত কবিতা পাঠ ও মুখবন্ধ উপস্থাপন

প্রকাশনা উৎসবে কাব্যগ্রন্থটির নির্বাচিত অংশ পাঠ করেন লুৎফর আহমেদ লিটন। বইটির মুখবন্ধ পাঠ করেন আজিজুল হক মোল্লা। তাঁদের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত অতিথিরা কাব্যগ্রন্থটির ভাষা, বিষয়বস্তু ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।

আলোচকেরা বলেন, আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা মানে শুধু স্থানীয় শব্দ ব্যবহার করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি, সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনযাপনের স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি। এসব উপাদান যথাযথভাবে সাহিত্যে স্থান পেলে তা পাঠকের কাছে স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরতে পারে।

তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ কাব্যগ্রন্থটি রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক সাহিত্যচর্চাকে আরও উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে তরুণ লেখকেরা নিজেদের এলাকার ভাষা, লোকজ শব্দ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী হবেন।

শেকড়ের ভাষা সংরক্ষণের প্রত্যাশা

অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক ও সাহিত্যানুরাগীরা কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশনাকে ঘিরে তাঁদের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষার ব্যবহারেও পরিবর্তন আসে। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও স্থানীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য, প্রচলিত শব্দ ও মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

মায়ের মুখের বুলি মানুষের শৈশব, পরিবার ও নিজস্ব জনপদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই ভাষাকে কবিতায় ধারণ করার মধ্য দিয়ে সাহিত্য যেমন নতুন প্রকাশভঙ্গি পায়, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পেতে পারে। ‘আও’ কাব্যগ্রন্থকে ঘিরে আয়োজিত আলোচনা ও কবিতা পাঠে এই ভাবনাই বিশেষভাবে উঠে আসে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত অতিথি ও সাহিত্যানুরাগীদের অংশগ্রহণে কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। শাহ আলম সরকারের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ প্রকাশ করেছে মৃধাবাড়ী। রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্যকে সাহিত্যের পাতায় ধরে রাখার এই প্রয়াস স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক চর্চার নতুন আগ্রহ তৈরি করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠনে লতা ইউনিয়নের দুর্গাপূজা হয়ে থাকবে অনন্য দৃষ্টান্ত

মায়ের ভাষা ও শেকড়ের সন্ধানে কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’

আপডেট সময় : 07:39:07 pm, Thursday, 22 October 2026

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,

নিজের শেকড়, মায়ের মুখের ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে রচিত রংপুরের আঞ্চলিক কাব্যগ্রন্থ ‘আও’-এর মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি রিয়াজুল হক সরকারের এই ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থে রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের কথ্য ভাষা, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কাব্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় ভাষাকে সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আঞ্চলিক ভাষার সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আয়োজন।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় লালমনিরহাট জেলা শহরের ভোকেশনাল রোডে মৃধাবাড়ীর ‘গল্পকথা’ প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মৃধাবাড়ী প্রকাশনীর প্রকাশনায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেন শাহ আলম সরকার। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন আজিজুল হক বাবু মোল্লা ও আহমেদ হোসেন লিটন।

আঞ্চলিক ভাষায় শেকড়ের অনুসন্ধান

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের নিজস্ব ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্য চর্চার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় আঞ্চলিক ভাষাকে কবিতার মাধ্যমে ধারণ করে ‘আও’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে নতুন আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

আঞ্চলিক ভাষা মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, জীবনযাপন, আবেগ, হাসি-কান্না ও সামাজিক সম্পর্কেরও পরিচায়ক। কবি রিয়াজুল হক সরকার তাঁর কাব্যগ্রন্থে রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের অকৃত্রিম ভাষাকে সাহিত্যের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য, শব্দের ব্যবহার ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অনুভূতিকে কাব্যিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

অনুষ্ঠানে আলোচকেরা বলেন, মাতৃভাষার আঞ্চলিক রূপ কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। বরং এসব ভাষার মধ্যেই একটি জনপদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যচর্চা বাড়লে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

 অতিথিদের বক্তব্য ও সাহিত্য আলোচনা

শাহ আলম সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবির শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ বর্মা, অনিমেষ বৈদ্য ও মিস মেরী কর্মকার। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আব্দুর রহিম মৃধা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মৃধাবাড়ীর পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য দেন মমিনুল আলম রাসেল। এরপর কাব্যগ্রন্থ ‘আও’ নিয়ে আলোচনা করেন বাউল নিশি রায়। আলোচনায় বইটির বিষয়বস্তু, আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য এবং লোকজ সংস্কৃতিকে সাহিত্যে ধারণ করার গুরুত্ব উঠে আসে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন কবির বাল্যবন্ধু ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান হাফিজ, অ্যাডভোকেট ময়েজুল ইসলাম ময়েজ, সরমিন আরা হক বিথী, মনসুর সরকার, লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, তহমিনা বেগম ইলা, আব্দুস সালাম, সোহেল রানা এবং পূর্বা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী বাদল সাহা শোভনসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানে কবি রিয়াজুল হক সরকারও উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি ভাষার প্রচলিত ও প্রমিত রূপের পাশাপাশি আঞ্চলিক রূপও মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় ভাষার শব্দ, বাক্যভঙ্গি ও প্রকাশরীতির মধ্যে এমন অনেক জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা থাকে, যা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এ ধরনের সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির স্মারক হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।

কবি রিয়াজুল হক সরকারের সাহিত্যযাত্রা

অনুষ্ঠানে কবির পরিচিতি ও জীবনপথ তুলে ধরে জানানো হয়, রিয়াজুল হক সরকার ১৯৭৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট শহরসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী সতীনদীর তীরবর্তী হাড়ীভাঙ্গা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নদীটি বর্তমানে মরাসতী নামে পরিচিত। তাঁর পিতা মরহুম নবিয়ার রহমান সরকার এবং মাতা মরহুমা রোকেয়া খাতুন।

তিনি লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।

নব্বইয়ের দশকে স্থানীয় প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন ‘অহনা’ ও ‘সায়াহ্ন’ কবিতা সংসদের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের অধিকার আদায়ের কাজেও যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি কোনো দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত নন বলে অনুষ্ঠানে তাঁর পরিচিতি পর্বে উল্লেখ করা হয়।

তাঁর সৃষ্টিশীল রচনায় সামাজিক অসংগতি, সমসাময়িক বাস্তবতা ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘আও’ কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে রংপুর অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে সাহিত্যে তুলে ধরার প্রয়াস তাঁর সাহিত্যচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে আলোচনায় আসে।

নির্বাচিত কবিতা পাঠ ও মুখবন্ধ উপস্থাপন

প্রকাশনা উৎসবে কাব্যগ্রন্থটির নির্বাচিত অংশ পাঠ করেন লুৎফর আহমেদ লিটন। বইটির মুখবন্ধ পাঠ করেন আজিজুল হক মোল্লা। তাঁদের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত অতিথিরা কাব্যগ্রন্থটির ভাষা, বিষয়বস্তু ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।

আলোচকেরা বলেন, আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা মানে শুধু স্থানীয় শব্দ ব্যবহার করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি, সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনযাপনের স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি। এসব উপাদান যথাযথভাবে সাহিত্যে স্থান পেলে তা পাঠকের কাছে স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরতে পারে।

তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ কাব্যগ্রন্থটি রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক সাহিত্যচর্চাকে আরও উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে তরুণ লেখকেরা নিজেদের এলাকার ভাষা, লোকজ শব্দ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী হবেন।

শেকড়ের ভাষা সংরক্ষণের প্রত্যাশা

অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক ও সাহিত্যানুরাগীরা কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশনাকে ঘিরে তাঁদের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষার ব্যবহারেও পরিবর্তন আসে। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও স্থানীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য, প্রচলিত শব্দ ও মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

মায়ের মুখের বুলি মানুষের শৈশব, পরিবার ও নিজস্ব জনপদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই ভাষাকে কবিতায় ধারণ করার মধ্য দিয়ে সাহিত্য যেমন নতুন প্রকাশভঙ্গি পায়, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পেতে পারে। ‘আও’ কাব্যগ্রন্থকে ঘিরে আয়োজিত আলোচনা ও কবিতা পাঠে এই ভাবনাই বিশেষভাবে উঠে আসে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত অতিথি ও সাহিত্যানুরাগীদের অংশগ্রহণে কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। শাহ আলম সরকারের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

কবি রিয়াজুল হক সরকারের ‘আও’ প্রকাশ করেছে মৃধাবাড়ী। রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্যকে সাহিত্যের পাতায় ধরে রাখার এই প্রয়াস স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক চর্চার নতুন আগ্রহ তৈরি করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা।