
চট্টগ্রাম ব্যুরো,
টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম ধাপে ধাপে পরিচালনা করছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযান থেকে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসাসেবা এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন—সবগুলো কার্যক্রম একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান ও আশ্রয়কেন্দ্র
জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ও নৌকার মাধ্যমে পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করছে। যেখানে সাধারণ নৌকা পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। সেখানে প্রায় ২৩ হাজার ৮৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দুর্গত মানুষের দুয়ারে ত্রাণ
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নিজেই দুর্গত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করছেন। সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে তিনি ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেন।
প্রতিটি পরিবারের জন্য দেওয়া ত্রাণ প্যাকেটে ছিল এক কেজি করে মুড়ি, চিড়া ও চিনি, দুটি বিস্কুটের প্যাকেট, দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি, চারটি মোমবাতি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে চট্টগ্রামের জন্য ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং ৯ হাজার ৮০০টি রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের কাছে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
শুধু সাতকানিয়া উপজেলার জন্যই ২৫ মেট্রিক টন চাল ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে ওই চাল দিয়ে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাতেও একইভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দী এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জনে। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়ায়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সবকটিই প্লাবিত হয়েছে। শুধু এ উপজেলাতেই চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধ
বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্গত এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
পুনর্বাসনের প্রস্তুতি
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষিজমি, মৎস্যঘের, বসতঘর এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ শুরু করবেন।
সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির মালিকদের জন্য নগদ অর্থ ও ঢেউটিন বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে ধানের চারা, বীজ ও সার বিতরণের উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে তারা দ্রুত কৃষিকাজে ফিরতে পারেন।
এ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ ও প্রধান সড়ক দ্রুত সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি
প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশাসনের বার্তা
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার ও জেলা প্রশাসন বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সহায়তা কার্যক্রম চলবে।
তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।


























