
সোহানুর রহমান বাপ্পি,
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে জিম্মি সাধারণ যাত্রী:
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জ রুটে এখন যাত্রীসেবার চিত্র যেন উল্টো। সেবা ও নিরাপত্তার পরিবর্তে এখানে দাপট দেখাচ্ছে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং টিকিটবিহীন যাত্রী পরিবহনের অবৈধ বাণিজ্য। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, স্টেশনের ভেতরে পুলিশের চোখের সামনেই প্রকাশ্যে চলছে ইয়াবা ও গাঁজার কারবার। অথচ দায়িত্বরত কিছু পুলিশ সদস্য যেন নির্বিকার।
প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, রহস্যজনক নীরবতা পুলিশের:
অনুসন্ধানের সময় রেল নিউজ টিম প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করলে দেখা যায়, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের সহযোগীরা দিবালোকে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দায়িত্ব পালনরত দুই পুলিশ সদস্য—কনস্টেবল সোহেল এবং সিনিয়র কনস্টেবল জামাল উদ্দিনকে জানানো হয়।
তবে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর। তারা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন,
“আপনারা আগে যান, আমরা আসছি।”
কিন্তু পরে সাংবাদিকরা মাদক কারবারিকে হাতেনাতে ধরলেও ওই দুই কনস্টেবল ঘটনাস্থলে আর উপস্থিত হননি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার চেষ্টা:
ঘটনার একপর্যায়ে মাদক কারবারিরা সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং পকেট থেকে সুইচ গিয়ার (ছুরি) বের করে হামলার চেষ্টা চালায়। বিষয়টি আবারও পুলিশ সদস্যদের জানানো হলে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে চরম অপেশাদার মন্তব্য করেন।
তাদের বক্তব্য ছিল—
“হ্যান্ডকাফ আছে, পারলে আপনারাই ধরে থানায় নিয়ে যান।”
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নেটিজেনরা ওই দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
টিকিটবিহীন যাত্রী পরিবহন: মাথাপিছু ৩০০–৪০০ টাকার চুক্তি :
স্টেশনের পুলিশ বক্স বা তথ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনের সময় পুলিশ সদস্যদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও ট্রেন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করলেই তাদের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে—
• গেট থেকেই যাত্রী সংগ্রহ: ঢাকা পর্যন্ত সিট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৩–৪ জন যাত্রী নিয়ে গ্রুপ তৈরি করা হয়।
• অবৈধ অর্থ লেনদেন: সরকারি টিকিট ছাড়াই মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা নিয়ে এসব যাত্রীকে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়।
• কোনো রসিদ নেই: এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্টেশন মাস্টারের স্বীকারোক্তি:
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমান বলেন,
“বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য। কিছু পুলিশ সদস্য গেটের মুখ থেকেই ৪–৫ জন যাত্রী একসাথে করে অবৈধভাবে ট্রেনে তুলে দেয়। গতকাল আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যেকের টিকিট চেক করেছি যাতে এই অনিয়ম বন্ধ করা যায়।”
রেলওয়ে থানার প্রতিক্রিয়া:
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহাউদ্দিন ফারুকী-র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জনমনে প্রশ্ন:
এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় প্রশ্ন উঠেছে—
নিচের স্তরের কিছু পুলিশ সদস্যের এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও মাদক সংশ্লিষ্টতা কি ওসির অজান্তে হচ্ছে, নাকি তিনি দেখেও না দেখার ভান করছেন?
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনকে অনেকেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। সাধারণ যাত্রীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।
সচেতন মহলের দাবি—
• কনস্টেবল সোহেল ও জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত
• কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া
• রেলওয়ে স্টেশনে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
























