
আরিফ আহমেদ,
আজ ৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। এ উপলক্ষে মা ইলিশ রক্ষায় বরিশালে জেলেদের নিয়ে বিভাগীয় জনসচেতনতা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় বরিশাল সার্কিট হাউস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার, পুলিশ সুপার এ, জেড, এম মোস্তাফিজুর রহমান, বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল হাসানসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত ২২ দিন নদ-নদী ও মোহনায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ থাকবে। মূল উদ্দেশ্য- প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া।
বাংলাদেশে মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস প্রায় দুই দশকের। ২০০৬ সালে প্রথম ১০ দিনের সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালে তা ১১ দিন, ২০১৫ সালে ১৫ দিন এবং ২০১৭ সালে বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সুফলও মিলেছে। একসময় ইলিশের উৎপাদন ও জাটকার প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক চিত্রে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, ইলিশের আবাসস্থল, নদীর নাব্যতা, দূষণ, অবৈধ জাল ও অতিরিক্ত আহরণের মতো বিষয়ও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি বলে জানিয়েছেন জেলে সম্প্রদায়।
সরেজমিনে বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে গিয়ে জেলেদের কাছ থেকে আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, আগের মতো সাগরে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ট্রলার দিনের পর দিন সাগরে থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছে না। অথচ একটি ট্রলার সাগরে যাওয়ার আগে জ্বালানি, বরফ, খাবার, জাল মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে।
চরদুয়ানীর এক মাঝি জানান, আগে নির্দিষ্ট এলাকায় জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছের সন্ধানে দূরে যেতে হয়। এতে খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে। পাথরঘাটার আড়তদার হুমায়ুনের দাবি, আগে যেখানে সকাল হওয়ার আগেই শতাধিক ট্রলার ঘাটে আসত, এখন সেখানে ২০/২৫টি ট্রলার আসে।
পাথরঘাটার আড়তদার সমিতির সভাপতি ছগীর আলম বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মৎস্যসম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়। মাছের প্রকৃত অবস্থা, প্রজননক্ষেত্র ও চলাচল নিয়ে নিয়মিত গবেষণা এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা অপ্রতুল এবং প্রকৃত জেলেদের অনেকেই তালিকায় থাকেন না। ফলে আয় বন্ধ থাকলেও সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ঋণের চাপ থেকে মুক্তি মেলে না। এ কারণে অনেকে বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
জেলেরা প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সঠিক তালিকা তৈরি, সহায়তা বাড়ানো, অবৈধ জাল বন্ধ, প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং সাগরে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও জেলেদের জীবন-জীবিকা দুটোই রক্ষা করতে হলে শুধু ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। নদী-সাগরের পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ আহরণ বন্ধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রকৃত জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ পাথরঘাটার ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ট্রলার শুধু একটি মাছ ধরার নৌযান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য জেলে পরিবার, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও একটি বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের সুফল তাই ইলিশের পাশাপাশি যেন জেলের ঘরেও পৌঁছায়, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
আশার কথা এই যে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। তিনি বললেন, আগে কি হয়েছে, কিভাবে হয়েছে জানিনা। এখন থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাবেন জেলেরা। ইতিমধ্যেই সেভাবে বন্টণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকৃত জেলেদের খুঁজে বের করে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে। কোথাও কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠিন শাস্তির হুশিয়ারি দেন তিনি।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের এই হুশিয়ারি উচ্চারণে নতুন করে আশাবাদী জেলে সম্প্রদায়। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশের জেলে ও দুষ্কৃতিকারী যেন প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য নদী ও সাগরে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের টহল জোরদার করার দাবী উপকূলীয় জেলেদের।


























