Dhaka , Tuesday, 3 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
পাইকগাছায় ভাসমান হাসপাতালের উদ্বোধন করলেন এমপি; ৩ মাস সেবা পাবেন সুবিধাবঞ্চিতরা হলুদের সাজে তৌসিফ-সাফা, নতুন নাটকের দৃশ্য নাকি পারিবারিক অনুষ্ঠান? চট্টগ্রামে যুবদল কর্মী জীবন হত্যা মামলার প্রধান আসামি জুয়েলসহ গ্রেপ্তার ৩ পাইকগাছায় মরহুম শামসুর রহমানের স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত পাইকগাছায় পুলিশের তৎপরতায় খোয়া যাওয়া ৬ লাখ টাকা উদ্ধার শাস্তির অপেক্ষায় ম্যান সিটি, হালান্ডের ক্লাব ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন বাবা যোগদানের পরই মধুপুর থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশংসিত ওসি ফজলুল হক মাটির স্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জৈব সারে ভর্তুকির আহ্বান ‎মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদে গাইবান্ধায় মানববন্ধন নাবিকসহ ইরানি জাহাজ ছিনতাই করল সোমালিয়া জলদস্যুরা চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৫১ শতাংশ পোশাকশিল্পে অস্থিরতার পেছনে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা শফিকুর রহমানের পাইকগাছায় দিনব্যাপী ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প; চিকিৎসাসেবা পেলেন শত শত রোগী পবিত্র ধর্মগ্রন্থেই সম্প্রীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া রয়েছে – জহির উদ্দিন স্বপন এখন যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রামে ডিবির অভিযানে দেশীয় তৈরি এলজি ও কার্তুজসহ একজন গ্রেপ্তার টেকনাফে এসআরবি-১৫ ও বিজিবির যৌথ অভিযান, ১ লাখ ২৯ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৪ আবুধাবি থেকে আনা স্বর্ণের ‘ডিম’ কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি না হওয়ায় ফেরত নেওয়ার চেষ্টা! কাস্টমস গোয়েন্দার জালে ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার ৬টি স্বর্ণের ডিম! ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা ভূমি প্রতিমন্ত্রীর সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ, ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা ধর্মপাশায় বোরো জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৫ নোয়াখালীতে ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির আনন্দ শোভাযাত্রা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর জাতীয় যুব দিবসে ঠাকুরগাঁওয়ে শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননা পেলেন অক্সিজেন এর প্রতিষ্ঠাতা ইমন কবে দলে ফিরতে পারেন দিবালা, জানালেন রোমা কোচ গাজীপুরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজারের দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ভাংচুর-আগ্নসংযোগ কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রায় ৭ ঘন্টা পর ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ‎গাইবান্ধার সাঘাটায় ভূমি কর্মকর্তার অপসারণে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন ভাঙ্গায় সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ দীঘিনালায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের মহড়া

বৈধ বিলেও দিতে হয় অবৈধ ‘কমিশন’! মাদারীপুর পরিবার পরিকল্পনায় ১৬ বছর ধরে অনিয়মের অভিযোগ

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 08:34:52 pm, Tuesday, 25 August 2026
  • 69 বার পড়া হয়েছে

কাজল খান, স্টাফ রিপোর্টার,

সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠে ছুটতে হয় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের। ইউনিয়নের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে এবং এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যেতে হয়, যেতে হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে। যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নিজেদের পকেট থেকেই টাকা খরচ করেন সবাই। নিয়ম অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে হওয়া নির্ধারিত ব্যয়ের অংশ ফেরত পাওয়ার কথা টিএডিএ (ট্রাভেলিং অ্যান্ড ডেইলি অ্যালাউন্স) বিলের মাধ্যমে।
কিন্তু মাদারীপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বেশি, সেই বৈধ পাওনা তুলতেও নাকি দিতে হয় ‘কমিশন’। অভিযোগকারীদের দাবি, টিএডিএ বিলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যক্তিগতভাবে আদায় করা হয়। সরকারি কাগজে-কলমে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, সেই ‘কমিশন’ নাকি বিলের টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর বিকাশে পাঠাতে বলা হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলায় ২৬৪টি পরিবার কল্যাণ সহকারী পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৮ জন। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ৯৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩১ জন। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের ৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৫ জন।এ ছাড়া অফিস সহায়ক ও গার্ডের ২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন এবং ৩৬টি আয়া পদের বিপরীতে কর্মরত ২৮ জন।
জনবল সংকটের মধ্যেও মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। আর এসব দায়িত্ব পালনে যে ব্যয় তাঁরা করেন, সেই টিএডিএ বিলের একটি অংশই যদি ‘কমিশন’ হিসেবে দিতে হয়, তাহলে সরকারি ভাতা পাওয়ার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু একটি-দুটি বিল নয়—দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কারণ, অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলে বিল আটকে রাখা, কর্মস্থল দূরে বদলি কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা থাকে।
ব্যাংকে সরকারি টাকা, পরে ব্যক্তিগত নম্বরে ‘কমিশন’
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টিএডিএ বিলের অর্থ সরাসরি কর্মীদের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। টাকা জমা হওয়ার পর নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিকাশ নম্বরে মোট বিলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পাঠাতে বলা হয়। কেউ কেউ কার্যালয়ের আশপাশে থাকলে নগদেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কর্মীরা।
এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, সরকার নির্ধারিত কোনো কর্তন থাকলে সেটি সরকারি হিসাবেই হওয়ার কথা। তাহলে পুরো বিল ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর আবার ব্যক্তিগতভাবে একটি অংশ কেন দিতে হবে?
একাধিক কর্মী দাবি করেছেন, প্রায় ১৬ বছর ধরে তাঁরা এ ধরনের অর্থ দিয়ে আসছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ চললেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি অনেকেই।  চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মস্থলসংক্রান্ত নানা চাপের কারণে তাঁরা নীরব থেকেছেন।
‘কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে দিই’
কালিকাপুর ও পেয়ারপুর ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন কমিশন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিদর্শক এবং কর্মচারীদের টিএডিএ বিলের অর্থ থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করে তিনি সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই কমিশন দিয়ে আসছি। এটা সরকারের কোনো নিয়ম আছে কি না, আমি জানি না। টিএডিএ বিল আমাদের হিসাবে ঢোকার পর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা বিকাশে দিতে হয়। সদর উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী-কর্মচারীদের কাছ থেকে কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারকে দিই। পরে তিনি উপরের স্যারদের দেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কাজ করি, প্রতিদিন পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। সেই টাকার ওপর আবার কমিশন দিতে হলে আমরা আসলে টিএডিএ বিল নিয়ে লাভ কী?”
‘না দিলে দূরে বদলির ভয় দেখানো হয়’
স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা খাদিজা আক্তারের অভিযোগ, এই অর্থ দেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই—এ কথা তাঁরা জানেন। কিন্তু চাকরির স্বার্থে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দেন।তিনি বলেন, “আমরা জানি এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু চাকরির ভয়েই এতদিন দিয়ে আসছি। তারা কিছু বললেই দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। আমরা চাই, সরকার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিক।”
অভিযোগকারীদের দাবি, খাদিজা আক্তারের মতো আরও অনেক স্বাস্থ্যকর্মী, পরিদর্শক  ও কর্মচারী একই ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। সামসুন্নাহার, নাজনীন, নাছরিন আক্তার, সাবিনা আক্তার, সোহেল হোসেন, রুবিনা আক্তার ও শান্ত হোসেন,বোরহান রাজা,মো. মনিরুজ্জামান,ওবায়দুল্লাহ,শাহিন মুনসী,মৃনাল কান্তি সরকার,সালমা খানম, শিউলি,আক্তার,মাসুমা ইয়াসমিন,রওশনারা পারভীন,ডালিয়া খানমসহ প্রায় দুই শতাধিক এর বেশি কর্মীরা এই প্রক্রিয়ার ভুক্তভোগী বলে জানান।
তাঁদের দাবি, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দুই শতাধিক কর্মী কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বিল আটকে থাকে, শেষ পর্যন্ত দিতে হয়’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি, নিজের টাকায় যাতায়াত করি। কিন্তু বিল তুলতে গেলেই নানা অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কমিশন দিতে হয়। না দিলে মাসের পর মাস বিল ঝুলে থাকে।”
আরেক কর্মচারীর ভাষ্য, “এটি এখন অনেকটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন না দিলে বিল সহজে ছাড় হয় না। চাকরি বাঁচাতে আমরা অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারি না।”
এদেকি কালকিনি উপজেলা এক স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যকর্মী সোহেল হোসেন, আকলিমা, নুসরাত ফারুক হোসে সহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, আমাদের কাছ থেকেও টিএডিএ বিলের থেকে কমিশন নেওয়া হয়।এগুলো বললে আমাদেরকে অন্য জায়গায় বদলি করে দিবে। দয়া করে আমাদের নাম দিয়ে লিখবেন না তাহলে আমাদের চাকরি থাকবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালকিনি উপজেলার একাধিক স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, টিএডিএ বিলের কমিশন উপজেলা হিসাবরক্ষক সুমন গাঙ্গুলী কাছে দিতে হয়।
এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলার হিসাব সহকারী সুমন গাঙ্গুলী বলেন, আমি এ ধরনের বিল কাউকে করে দেই না। এখন বিল হয় অনলাইনে যদি কেউ আমার বিরুদ্ধে বলে থাকে সেটা মিথ্যা।
কালকিনি উপজেলার পরিবার পরিকল্পনার কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রহমান জানান, যদি আমার অফিসের কোন কর্মচারী টিএডিএ বিলের উপরে কারো থেকে কোন কমিশন নিয়ে থাকে তাহলে সে বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
হিসাব সহকারী: ‘স্যারের কাছে যান’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো কথা নাই। আপনারা স্যারের কাছে যান। আমি কিছু বলতে পারব না। যা কিছু হয়েছে, স্যারের মাধ্যমেই হয়েছে।”
তাঁর এই বক্তব্যের বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে কর্মকর্তা সানজিদা বলেন, “এ বিষয়ে আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভিডিও বক্তব্য দিতে পারব না। এরকম যদি কেউ করে থাকে, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘কমিশন নেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, “টিএডিএ বিলের ওপর কোনো কমিশন নেওয়ার সরকারি নিয়ম বা বিধান নেই। যদি কেউ নিয়ে থাকে, অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

“আমরা দয়া চাই না, নিজেদের প্রাপ্যটাই চাই।”
যদি এই অর্থ নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান না থাকে, তাহলে এত বছর ধরে কার নির্দেশে, কীভাবে এবং কার কাছে এই টাকা গেছে?এখন দেখার বিষয়—তাদের সেই প্রাপ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তদন্ত কতটা কার্যকর হয়।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

পাইকগাছায় ভাসমান হাসপাতালের উদ্বোধন করলেন এমপি; ৩ মাস সেবা পাবেন সুবিধাবঞ্চিতরা

বৈধ বিলেও দিতে হয় অবৈধ ‘কমিশন’! মাদারীপুর পরিবার পরিকল্পনায় ১৬ বছর ধরে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় : 08:34:52 pm, Tuesday, 25 August 2026

কাজল খান, স্টাফ রিপোর্টার,

সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠে ছুটতে হয় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের। ইউনিয়নের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে এবং এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যেতে হয়, যেতে হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে। যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নিজেদের পকেট থেকেই টাকা খরচ করেন সবাই। নিয়ম অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে হওয়া নির্ধারিত ব্যয়ের অংশ ফেরত পাওয়ার কথা টিএডিএ (ট্রাভেলিং অ্যান্ড ডেইলি অ্যালাউন্স) বিলের মাধ্যমে।
কিন্তু মাদারীপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বেশি, সেই বৈধ পাওনা তুলতেও নাকি দিতে হয় ‘কমিশন’। অভিযোগকারীদের দাবি, টিএডিএ বিলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যক্তিগতভাবে আদায় করা হয়। সরকারি কাগজে-কলমে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, সেই ‘কমিশন’ নাকি বিলের টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর বিকাশে পাঠাতে বলা হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলায় ২৬৪টি পরিবার কল্যাণ সহকারী পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৮ জন। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ৯৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩১ জন। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের ৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৫ জন।এ ছাড়া অফিস সহায়ক ও গার্ডের ২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন এবং ৩৬টি আয়া পদের বিপরীতে কর্মরত ২৮ জন।
জনবল সংকটের মধ্যেও মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। আর এসব দায়িত্ব পালনে যে ব্যয় তাঁরা করেন, সেই টিএডিএ বিলের একটি অংশই যদি ‘কমিশন’ হিসেবে দিতে হয়, তাহলে সরকারি ভাতা পাওয়ার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু একটি-দুটি বিল নয়—দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কারণ, অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলে বিল আটকে রাখা, কর্মস্থল দূরে বদলি কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা থাকে।
ব্যাংকে সরকারি টাকা, পরে ব্যক্তিগত নম্বরে ‘কমিশন’
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টিএডিএ বিলের অর্থ সরাসরি কর্মীদের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। টাকা জমা হওয়ার পর নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিকাশ নম্বরে মোট বিলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পাঠাতে বলা হয়। কেউ কেউ কার্যালয়ের আশপাশে থাকলে নগদেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কর্মীরা।
এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, সরকার নির্ধারিত কোনো কর্তন থাকলে সেটি সরকারি হিসাবেই হওয়ার কথা। তাহলে পুরো বিল ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর আবার ব্যক্তিগতভাবে একটি অংশ কেন দিতে হবে?
একাধিক কর্মী দাবি করেছেন, প্রায় ১৬ বছর ধরে তাঁরা এ ধরনের অর্থ দিয়ে আসছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ চললেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি অনেকেই।  চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মস্থলসংক্রান্ত নানা চাপের কারণে তাঁরা নীরব থেকেছেন।
‘কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে দিই’
কালিকাপুর ও পেয়ারপুর ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন কমিশন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিদর্শক এবং কর্মচারীদের টিএডিএ বিলের অর্থ থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করে তিনি সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই কমিশন দিয়ে আসছি। এটা সরকারের কোনো নিয়ম আছে কি না, আমি জানি না। টিএডিএ বিল আমাদের হিসাবে ঢোকার পর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা বিকাশে দিতে হয়। সদর উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী-কর্মচারীদের কাছ থেকে কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারকে দিই। পরে তিনি উপরের স্যারদের দেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কাজ করি, প্রতিদিন পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। সেই টাকার ওপর আবার কমিশন দিতে হলে আমরা আসলে টিএডিএ বিল নিয়ে লাভ কী?”
‘না দিলে দূরে বদলির ভয় দেখানো হয়’
স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা খাদিজা আক্তারের অভিযোগ, এই অর্থ দেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই—এ কথা তাঁরা জানেন। কিন্তু চাকরির স্বার্থে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দেন।তিনি বলেন, “আমরা জানি এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু চাকরির ভয়েই এতদিন দিয়ে আসছি। তারা কিছু বললেই দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। আমরা চাই, সরকার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিক।”
অভিযোগকারীদের দাবি, খাদিজা আক্তারের মতো আরও অনেক স্বাস্থ্যকর্মী, পরিদর্শক  ও কর্মচারী একই ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। সামসুন্নাহার, নাজনীন, নাছরিন আক্তার, সাবিনা আক্তার, সোহেল হোসেন, রুবিনা আক্তার ও শান্ত হোসেন,বোরহান রাজা,মো. মনিরুজ্জামান,ওবায়দুল্লাহ,শাহিন মুনসী,মৃনাল কান্তি সরকার,সালমা খানম, শিউলি,আক্তার,মাসুমা ইয়াসমিন,রওশনারা পারভীন,ডালিয়া খানমসহ প্রায় দুই শতাধিক এর বেশি কর্মীরা এই প্রক্রিয়ার ভুক্তভোগী বলে জানান।
তাঁদের দাবি, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দুই শতাধিক কর্মী কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বিল আটকে থাকে, শেষ পর্যন্ত দিতে হয়’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি, নিজের টাকায় যাতায়াত করি। কিন্তু বিল তুলতে গেলেই নানা অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কমিশন দিতে হয়। না দিলে মাসের পর মাস বিল ঝুলে থাকে।”
আরেক কর্মচারীর ভাষ্য, “এটি এখন অনেকটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন না দিলে বিল সহজে ছাড় হয় না। চাকরি বাঁচাতে আমরা অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারি না।”
এদেকি কালকিনি উপজেলা এক স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যকর্মী সোহেল হোসেন, আকলিমা, নুসরাত ফারুক হোসে সহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, আমাদের কাছ থেকেও টিএডিএ বিলের থেকে কমিশন নেওয়া হয়।এগুলো বললে আমাদেরকে অন্য জায়গায় বদলি করে দিবে। দয়া করে আমাদের নাম দিয়ে লিখবেন না তাহলে আমাদের চাকরি থাকবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালকিনি উপজেলার একাধিক স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, টিএডিএ বিলের কমিশন উপজেলা হিসাবরক্ষক সুমন গাঙ্গুলী কাছে দিতে হয়।
এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলার হিসাব সহকারী সুমন গাঙ্গুলী বলেন, আমি এ ধরনের বিল কাউকে করে দেই না। এখন বিল হয় অনলাইনে যদি কেউ আমার বিরুদ্ধে বলে থাকে সেটা মিথ্যা।
কালকিনি উপজেলার পরিবার পরিকল্পনার কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রহমান জানান, যদি আমার অফিসের কোন কর্মচারী টিএডিএ বিলের উপরে কারো থেকে কোন কমিশন নিয়ে থাকে তাহলে সে বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
হিসাব সহকারী: ‘স্যারের কাছে যান’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো কথা নাই। আপনারা স্যারের কাছে যান। আমি কিছু বলতে পারব না। যা কিছু হয়েছে, স্যারের মাধ্যমেই হয়েছে।”
তাঁর এই বক্তব্যের বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে কর্মকর্তা সানজিদা বলেন, “এ বিষয়ে আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভিডিও বক্তব্য দিতে পারব না। এরকম যদি কেউ করে থাকে, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘কমিশন নেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, “টিএডিএ বিলের ওপর কোনো কমিশন নেওয়ার সরকারি নিয়ম বা বিধান নেই। যদি কেউ নিয়ে থাকে, অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

“আমরা দয়া চাই না, নিজেদের প্রাপ্যটাই চাই।”
যদি এই অর্থ নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান না থাকে, তাহলে এত বছর ধরে কার নির্দেশে, কীভাবে এবং কার কাছে এই টাকা গেছে?এখন দেখার বিষয়—তাদের সেই প্রাপ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তদন্ত কতটা কার্যকর হয়।