
মোঃ আসিফুজ্জামান আসিফ,
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টিং ও বিনা কারণে ছাঁটাই বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কর্মবিরতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানায় কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কায় দিনভর পর্যায়ক্রমে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের মোট ১৭৭টি পোশাক কারখানায় এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এদিকে আশুলিয়ার কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেলে সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। এতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকাল থেকেই আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর, পল্লীবিদ্যুৎ, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা সকালে কাজে যোগ দিয়েই কর্মবিরতি শুরু করেন। তাঁরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। পরে সকাল ১০টার পর শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানা থেকে বেরিয়ে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁরা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। পরে আল-মুসলিম ও নিউএইজের শ্রমিকেরা কাজে ফিরলেও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকদের কর্মবিরতি অব্যাহত ছিল।
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরসিংহপুর ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ১১টার দিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও ইউনিক এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে নরসিংহপুর এলাকায় অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে তাঁরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় পর্যায়ক্রমে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে হা-মীম গ্রুপ ও শারমিন গ্রুপের কারখানাও রয়েছে।
রবিবার দুপুর ২টার দিকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া অন্তত ৫০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষ সাভারের অন্যান্য শিল্প এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে মোট ১৭৭টি পোশাক কারখানায় এক দিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ফলে সকাল থেকে চলমান কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের প্রভাবে বৃহত্তর শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
শুধু আশুলিয়াতেই নয়, বিকেলে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকাতেও শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা একত্র হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের ওই অংশে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে শিল্প পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেন। শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অবরোধের কারণে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
শ্রমিকদের শান্ত রাখতে সকাল থেকেই আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং শুরু করে শিল্প পুলিশ। পুলিশের গাড়ি ও অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর পাশাপাশি কোনো কারখানায় হামলা, ভাঙচুর কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনায় না জড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। মাইকিংয়ে বলা হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের বিষয়ে শিল্প পুলিশ আন্তরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হয়। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও বিভিন্ন কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এ বিষয়ে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিন্তপুর এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখেন। পরে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। প্রথম দিকে অন্তত ৫০টি কারখানায় ছুটির তথ্য পাওয়া গেলেও বিকেলে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে ১৭৭টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, সকালে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন। তবে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে দ্রুত তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব কারখানায় শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করছেন, সেগুলোর সমস্যা গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির মধ্যে রবিবার পোশাকশ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এ উদ্যোগের মধ্যেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন অজুহাতে বিনা কারণে ছাঁটাই করা হচ্ছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
শ্রমিকদের দাবি, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধ এবং অন্যায্য ছাঁটাইয়ের অবসান ঘটাতে হবে। অন্যদিকে, হঠাৎ করে কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা না গেলে সাভার-আশুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্প এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।






















