
চট্টগ্রাম ব্যুরো:
চট্টগ্রাম নগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন, অনুমোদিত নকশার বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পার্কিং ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র যাচাইয়ে বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শনে নামেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। তাঁর নেতৃত্বে চউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টিম নগরের মেহেদিবাগ ও পাঁচলাইশ এলাকার ন্যাশনাল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতাল, ইপিক হাসপাতালের তিনটি শাখা এবং পপুলার হাসপাতাল পরিদর্শন করে।
পরিদর্শনে প্রায় প্রতিটি হাসপাতালেই অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার, পার্কিং ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। কোথাও আবাসিক কিংবা আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে, কোথাও অনুমোদিত পার্কিং দখল করে দোকান, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, নামাজের স্থান কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালেই রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে হাসপাতালের সামনের সড়কে যানবাহন দাঁড় করানোর কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
ন্যাশনাল হাসপাতাল
ন্যাশনাল হাসপাতালে দেখা যায়, আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। অনুমোদিত নকশায় ৫০টি পার্কিং দেখানো হলেও বাস্তবে মাত্র ২৮টির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অবশিষ্ট পার্কিং এলাকায় ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক মাসের মধ্যে পার্কিং সম্পূর্ণ অবমুক্ত করা, পার্কিং সংখ্যা অন্তত ৩৫টিতে উন্নীত করা এবং পার্শ্ববর্তী জমি অধিগ্রহণ করে অতিরিক্ত পার্কিং নির্মাণের আশ্বাস দেয়। এছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও অপ্রতুল পাওয়া যায়। একমাত্র জরুরি ফায়ার সিঁড়িতে ময়লার স্তূপ দেখা যায়।
ম্যাক্স হাসপাতাল
ম্যাক্স হাসপাতালের পার্কিংয়ে রোগীদের কোনো গাড়ি দেখা যায়নি; অধিকাংশ স্থান চিকিৎসকদের গাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা দখল করে আছে। পার্কিং এলাকায় নামাজের স্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণ করে দ্রুত অবমুক্ত করার নির্দেশ দেয় চউক। হাসপাতালের সামনের যে অংশ সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তা অপসারণ করে রোড লেভেলে আনার নির্দেশও দেওয়া হয়। এখানেও পার্কিং ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পাওয়া যায়।
এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতাল
সদ্য নির্মিত এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতাল আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হলেও হাসপাতাল হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র গ্রহণ করেনি। এ কারণে এর আগে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩-বি ধারায় নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরিদর্শনে অনুমোদিত নকশার ব্যাপক বিচ্যুতি এবং অত্যন্ত সীমিত পার্কিংয়ের বিষয়টি উঠে আসে।
ইপিক হাসপাতাল
সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ইপিক হাসপাতালের বিভিন্ন ভবনে। আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনার পাশাপাশি নকশার বাইরে লিফট নির্মাণ, পার্কিং এলাকায় বাণিজ্যিক দোকান ভাড়া দেওয়া, ড্রাইভওয়ে না রাখা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। চউক কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের এক্সটেনশন ভবনের সব ধরনের কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।
পপুলার হাসপাতাল
পপুলার হাসপাতাল আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিলেও নকশায় নির্ধারিত ৪০ ফুট খোলা জায়গা সম্পূর্ণ দখল করে ভবন নির্মাণ করেছে। এছাড়া পাশের আরেকটি ভবন সংযুক্ত করা হলেও তার কোনো অনুমোদিত নকশা কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি।
পরিদর্শন শেষে চউক কর্তৃপক্ষ আগামী সোমবার সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষকে অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট সব দলিলপত্র নিয়ে চউক ভবনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। সেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নথি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন পরিদর্শন শেষে হাসপাতালগুলোর অনিয়মে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ হাসপাতাল আবাসিক বা আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করছে। অথচ হাসপাতাল একটি উচ্চ জনসমাগমের স্থাপনা। সে অনুযায়ী পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।”
তিনি বলেন, “রোগীদের জন্য পার্কিং নেই, অথচ চিকিৎসকদের গাড়ি দীর্ঘ সময় পার্কিং দখল করে থাকে। চিকিৎসকদের যানবাহন শুধু আগমন ও প্রস্থানের সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। পার্কিং এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা রাখা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “জনস্বার্থ বিবেচনায় হাসপাতালগুলোকে এক মাস সময় দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে চউক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
যানজট নিরসনে হাসপাতালগুলোর সামনে অপ্রয়োজনীয় ইউ-টার্ন বন্ধ, সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশনা দেন চউক চেয়ারম্যান।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন চউকের সদস্য (প্রকৌশল) মো. জামিলুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, সচিব মো. মাহবুবউল করিম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ইমারত নির্মাণ কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান এ.জি.এম. সেলিম, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান, অথোরাইজড অফিসার-১ কাজী কাদের নেওয়াজ, অথোরাইজড অফিসার-২ তানজীব হোসেনসহ চউকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা।

























