
আরিফ আহমেদ,
মেরিন ড্রাইভ নাকি কীর্তনখোলা ড্রাইভ? রিভার ড্রাইভও বলা যায়। এই কীর্তনখোলা নদী তীরবর্ত্তী সড়ক ধরে পথ চলতে হলে এখন নাকে রুমাল চাপার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা মানুষকে স্বাগত জানানোর কথা যে সড়কের, তার দুই পাশে কোথাও ময়লার স্তূপ, কোথাও প্লাস্টিক ও বস্তার স্তুপ, কোথাও হাঁস-মুরগি ও ছাগলের ঘর। আবার কোথাও সড়কের একেবারে পাশে বসেই চলছে রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা নানা ধরনের দৈনন্দিন কাজ। কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত মেরিন ড্রাইভ যেন ধীরে ধীরে আশপাশের বস্তিগুলোর উঠোনে পরিণত হয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদমারি থেকে ডিসিঘাট হয়ে ত্রিশ গোডাউনমুখী রিভার ড্রাইভের বিভিন্ন অংশে একই চিত্র। কোথাও নদীর পাড়ে বসে প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত সামগ্রী বাছাই করছেন মানুষ, কোথাও রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বস্তা ও আবর্জনা। নদীর পাড়ের জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে গোডাউন, রান্নাঘর কিংবা গৃহস্থালির কাজে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে নদীতে নামার ঘাট। সেখানে চলছে গোসল, কাপড় ধোয়া ও নিত্যদিনের অন্যান্য কাজ।
চাঁদমারি খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে অবশ্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনও চোখে পড়ে। দীর্ঘদিন সংযোগহীন থাকা সেতুটির সংযোগ ফিরে এসেছে। বালু ফেলে উঁচু করা হয়েছে সংযোগ সড়ক। ফলে সেতু পারাপারে আগের মতো পথচারীদের হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা কমেছে। ফলে কীর্তনখোলার তীরবর্তী এলাকায় দর্শনার্থীদের চলাচলও বেড়েছে। এই পথ সরাসরি উত্তরে ডিসিঘাটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় কথা রয়েছে। এটি তৈরি হলে নদীপাড়ের সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধিতে কাজ করবে বিসিসি। কিন্তু সেতু পেরিয়ে রিভার ড্রাইভে উঠলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। এক পাশে বিস্তীর্ণ কীর্তনখোলা, অন্যপাশে ঘনবসতি। বিশেষ করে স্টেডিয়াম, মাদ্রাসা, চাঁদমারি, কেডিসি, ভাটারখাল, পলাশপুর, রসুলপুরসহ নগরীর বিভিন্ন বস্তি এলাকায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। সম্প্রতি যেন এই ঘরের সংখ্যা রাতারাতি তিনগুণ হয়ে গেছে।
বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে ছোট-বড় প্রায় ১৩৭টি বস্তি বা কলোনী রয়েছে। এসব বস্তিতে নিম্নআয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। তারমধ্যে স্টেডিয়াম কলোনি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ন এলাকা। এখানে ইদানীং ঘরের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা নদীর জলসীমা বা ফোরশোর এড়িয়া দখল করে নিয়েছে। তাই বলে বসবাসকারী বস্তিবাসীদের সবাইকে দখলদার হিসেবে দেখার সুযোগও নেই। বেশিরভাগ তারা ভাড়াটিয়া। জমির মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা বা জমিদার। আবার কিছু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় বসবাস করছে। তাদের অনেকেই দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নগরীর বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত। ফলে নদীতীর ও সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও তাদের উচ্ছেদ করে কোথায় নেওয়া হবে, সেই প্রশ্নটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। নদী রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি নিম্নআয়ের মানুষের পুনর্বাসনও নগর পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। তার আগে প্রয়োজন নদী তীরবর্ত্তী সড়ক ও জলসীমা ব্যবহারে তাদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা প্রশিক্ষণ প্রদান। এসব বসতি বা বস্তিঘর গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পাড়ের ব্যবহারও বদলে গেছে। রিভার ড্রাইভের যে অংশটি নগরবাসীর হাঁটাচলা, নদী দেখা কিংবা পর্যটনের জন্য ব্যবহারের কথা, সেখানে এখন কোথাও ঘরের বারান্দা, কোথাও পশুর ঘর, কোথাও আবর্জনা রাখার স্থান। সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের সাদা সীমারেখার ঠিক পাশেই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, বস্তা ও পরিত্যক্ত সামগ্রী জমিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে বসেই কিছুলোক এসব সামগ্রী বাছাই করছেন। সড়কের একেবারে পাশে এমন কার্যক্রম চলায় পথচারী ও যানবাহনের জন্য যেমন অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তেমনি নদীতীরও দূষিত হচ্ছে। আবার নদীর পাড়ের টিনের স্থাপনাগুলো প্রায় সড়কের কিনারে চলে এসেছে। এর মাঝ দিয়েই মানুষ চলাচল করছে। একদিকে নদী, অন্যদিকে দোকান ও বসতিভিটা, মাঝখানে সরু হয়ে যাওয়া সড়ক। কোথাও কোথাও গৃহস্থালির বর্জ্যও নদীতে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে নদী ও নগর, দুটিই পরিবেশগত চাপের মুখে পড়বে।
কীর্তনখোলা নদীর তীর দখলের চিত্র অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে নদীর দুই তীরে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা পার্ক থেকে ত্রিশ গোডাউন পর্যন্ত নদীতীরের বিভিন্ন অংশে স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু বস্তির ঘর নয়। নদীতীরের একদিকে নিম্নআয়ের মানুষের বসতি, অন্যদিকে ব্যবসায়িক স্থাপনা, ডিপো, ডকইয়ার্ড ও অন্যান্য অবকাঠামো, সব মিলিয়ে কীর্তনখোলার তীর একটি দীর্ঘদিনের সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা সংকটে পড়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার নদীতীর নিয়ে। মাত্র এই অংশটুকু পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে বরিশালের নদীকেন্দ্রিক পর্যটনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে কোথাও ভাঙাচোরা বাঁধ, কোথাও অস্থায়ী বসতি, কোথাও পশুপাখির ঘর, কোথাও ময়লার স্তূপ, সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় নদীতীরটি অনেকটাই অব্যবস্থাপনার শিকার।
১৯৮৬ সালে নদীভাঙন প্রতিরোধে এই এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে বাঁধ ও হাঁটার পথের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সুযোগে বাঁধের ওপর ও আশপাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী স্থাপনা। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন জেটিও রয়েছে এই নদীতীর ঘেঁষে।
অথচ কীর্তনখোলা বরিশালের পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে নগরীর ইতিহাস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর অপরূপ জলরাশি, নৌযান, ঘাট এবং দুই পাড়ের দৃশ্য বরিশালের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন জানিয়েছেন, কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করলে সিটি করপোরেশন সৌন্দর্যবর্ধন ও ওয়াকওয়ের কাজ করবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা জাবেদ ইকবাল জানিয়েছেন, নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের কাজ ২০২৩ সালে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের এখন সরাসরি কিছু বলার এখতিয়ার নেই। এদিকে সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা কাজের অগ্রগতি জানার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ জটিলতার কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, সবার আগে ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্কের ৭০০ মিটার ওয়াকওয়ে সংস্কার ও ব্যবহার উপযোগী করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি নদী তীরবর্ত্তী এলাকার প্রবেশদ্বার। এ অংশটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে বরিশালের নদীতীরের চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব। আধুনিক ওয়াকওয়ে, বসার স্থান, সবুজায়ন, আলোকসজ্জা, নদী দর্শনের ডেক, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, সাইকেল ট্র্যাক এবং ছোট ছোট উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে এসবের আগে নদীতীরের সীমানা নির্ধারণ, দখল নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিনের বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সমাধান করা জরুরি।
শুধু উচ্ছেদ করে নদীতীর পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আজ যে পরিবারটি নদীর পাড় থেকে সরানো হবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে আগামীকাল তারা নগরীর অন্য কোনো খাল, সড়ক কিংবা নদীতীরে নতুন করে ঘর তুলতে বাধ্য হতে পারে। তাই নদী রক্ষা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীতীর সৌন্দর্যবর্ধন এবং বস্তিবাসীর পুনর্বাসন, এই বিষয়গুলোকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে রিভার ড্রাইভের দুইপাশে নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহস্থল, পাবলিক টয়লেট, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে নদীর সীমানা চিহ্নিত করে নতুন করে যাতে কোনো স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। বরিশালের নদীতীরের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কীর্তনখোলা নিজেই। সেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সৌন্দর্যবর্ধনের আগে নদীর পাড়কে দখল, ময়লা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা করাই জরুরি।

























