
স্বর্ণের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গয়না কিংবা বিনিয়োগের কথা। তবে অলংকার তৈরির বাইরেও আধুনিক প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা এমনকি খাবার সাজাতেও ব্যবহার হচ্ছে মূল্যবান এই ধাতু।
স্বর্ণের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর ব্যবহার এত বিস্তৃত। সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত না হওয়া, বিদ্যুৎ পরিবহনের সক্ষমতা এবং অত্যন্ত পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়ার সুবিধা একে করে তুলেছে বহুমুখী।
খাবারেও রয়েছে স্বর্ণের ব্যবহার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুশি, চকলেট, কেক, আইসক্রিম ও মিষ্টি সাজাতে ব্যবহার করা হয় খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণের পাত। এটি ‘এডিবল গোল্ড’ নামে পরিচিত। সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হয় এসব পাত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য এটি ই-১৭৫ নামে অনুমোদিত।
তবে স্বর্ণ খেলে শরীরের বিশেষ কোনো পুষ্টি বা স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায়, এমন প্রমাণ নেই। মূলত খাবারের সৌন্দর্য ও বিলাসিতা বাড়াতেই এর ব্যবহার।
প্রযুক্তিপণ্যেও রয়েছে স্বর্ণের উপস্থিতি। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট বোর্ড, সুইচ ও বৈদ্যুতিক সংযোগে ব্যবহার করা হয় স্বর্ণ। কারণ, এটি বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য থেকেও স্বর্ণ সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মহাকাশ গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ। নাসার জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আয়নায় ব্যবহার করা হয়েছে স্বর্ণের অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ কার্যকর হওয়ায় দূরবর্তী নক্ষত্র ও ছায়াপথ পর্যবেক্ষণে এটি সহায়তা করে।
এ ছাড়া মহাকাশচারীদের হেলমেটের সামনের অংশে স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়, যা সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানেও রয়েছে স্বর্ণের ব্যবহার। একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় স্বর্ণের কিছু যৌগ ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে গোল্ড ন্যানোপার্টিকল বা অতি ক্ষুদ্র স্বর্ণকণা ব্যবহার করে ক্যানসার শনাক্তকরণ, ওষুধ সরবরাহ ও চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। কিছু দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার কিটেও স্বর্ণকণা ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি দাঁতের চিকিৎসায়ও স্বর্ণ ও এর সংকর ধাতুর ব্যবহার রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছেও স্বর্ণের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ মজুত রাখে। এর মাধ্যমে সম্পদের বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুত প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে গয়না কিংবা বিনিয়োগের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি, চিকিৎসা, মহাকাশ গবেষণা ও খাদ্যশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে স্বর্ণ। মূল্যবান এই ধাতুর বহুমুখী ব্যবহার আধুনিক বিশ্বে এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।


























