
মোঃ মাহফুজ আলম, চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি,
চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় একসময় ডাক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল পোস্ট অফিস। সময়ের পরিবর্তনে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনায় উপজেলার পোস্ট অফিসগুলোর সেই পুরোনো জৌলুস এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কোথাও জরাজীর্ণ ভবন, কোথাও নেই কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী স্থাপনা। আবার জনবল ও পরিবহন সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে ডাকসেবা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলা মিলিয়ে দুটি সাব-পোস্ট অফিস ও একটি উপজেলা পোস্ট অফিস রয়েছে। এসব পোস্ট অফিসের অধীনে প্রায় ৪৫টি শাখা পোস্ট অফিস রয়েছে। এর মধ্যে মতলব উপজেলার আওতায় ২৩টি, দাউদকান্দি উপজেলার আওতায় ২টি, মতলব উত্তর উপজেলার আওতায় ৪টি, মোহনপুর সাব-পোস্ট অফিসের আওতায় ৪টি এবং চাঁদপুর জেলা পোস্ট অফিসের আওতায় ৫টি শাখা পোস্ট অফিস রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী একটি শাখা পোস্ট অফিসে শাখা পোস্টমাস্টার, রানার ও প্যাকারসহ প্রয়োজনীয় জনবল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শাখা পোস্ট অফিসেই পর্যাপ্ত জনবল নেই। কোথাও একজন কর্মী দিয়েই চলছে কার্যক্রম। আবার অনেক শাখা পোস্ট অফিসের ভবন দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শাখা পোস্ট অফিসে কর্মরতদের সম্মানীও অত্যন্ত কম। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানীতে দায়িত্ব পালন করতে হয় অনেক কর্মীকে। বর্তমান বাজারদরে এই অর্থে সংসার চালানো কঠিন বলে জানান তারা।
এদিকে ডাক বিভাগের আধুনিকায়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও পরিবহন সংকটের কারণে প্রত্যন্ত এলাকার ডাক ও অন্যান্য সামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় চিঠি, সরকারি কাগজপত্র ও অন্যান্য ডাকসামগ্রী নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে সমস্যা হয়।
মোহনপুর সাব-পোস্ট অফিসের সাব-পোস্টমাস্টার মোঃ মাহবুব সরকার বলেন, “পোস্ট অফিসে এখন আগের মতো মানুষ আসে না। মূলত সরকারি কিছু চিঠিপত্রই আসে। আমাদের এখানে দুজন স্টাফ। জনবল কম এবং নিজস্ব পরিবহন না থাকায় অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে চিঠি বা অন্যান্য ডাকসামগ্রী আনা-নেওয়া সম্ভব হয় না।”
মোহনপুর সাব-পোস্ট অফিসের নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি শাখা পোস্ট অফিস রয়েছে। এর মধ্যে দশানী শাখা পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, একটি ছোট জরাজীর্ণ ভবন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের দরজায় ঝুলছে তালা। কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ না থাকায় শাখা পোস্ট অফিসটির স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
দশানী শাখা পোস্ট অফিসের শাখা পোস্টমাস্টার মোঃ গোলাম মাওলা বলেন, “পোস্ট অফিসের ভবনটি ভেঙে গেছে। আমি মাঝে মাঝে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে আসি। আমাদের বেতন একেবারেই কম। এই কম বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। পোস্ট অফিসগুলো পুনর্নির্মাণ বা মেরামত করা, বেতন বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে ডাকসেবা আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।”
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, “জরাজীর্ণতার কারণে পোস্ট অফিসগুলোতে মানুষজন তেমন যায় না বলে আমরা জানতে পেরেছি। ফলে পোস্ট অফিসগুলোর কার্যক্রম অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব পোস্ট অফিস মেরামতের বিষয়ে উদ্যোগ নেব। আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে পোস্ট অফিসের সেবাও সচল রাখা প্রয়োজন।”
বর্তমানে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো দ্রুত ও সহজ পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের চাহিদা পূরণ করছে। ফলে সরকারি ডাক বিভাগের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পোস্ট অফিসগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পর্যাপ্ত জনবল, সম্মানী বৃদ্ধি এবং কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ডাক বিভাগের সেবা আরও গতিশীল হতে পারে।
এতে একদিকে সাধারণ মানুষ কম খরচে ডাক ও পার্সেল সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাক বিভাগের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী পোস্ট অফিসগুলোও ফিরে পেতে পারে তাদের হারানো জৌলুস।


























