Dhaka , Thursday, 8 October 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
নানা পাটেকরের মৃত্যুতে আবেগঘন অক্ষয় কুমার জঙ্গল সলিমপুরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ নোবিপ্রবিতে মেশিন ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধন সরাইলে বোন হত্যার অভিযোগে ছোটবোন ও তার প্রেমিক গ্রেফতার নারায়ণগঞ্জে আদালত বিভক্তির প্রতিবাদে আইনজীবীদের বিক্ষোভ সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের হোস্টেলে পরপর দুই দিন চুরির অভিযোগ শ্রীপুরে নবাগত ইউএনও’র মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত এক হালি কমলা ৫০ হাজার, আধা কেজি খেজুর ১৫ হাজার টাকায় শিশির মনিরকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার দাবি মধুপুরে পুত্রবধূর ধাক্কায় বৃদ্ধ শ্বশুর আহত, থানায় অভিযোগ রূপগঞ্জে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে ইউএনওর মতবিনিময় সভা বোয়ালমারীর সাতৈর ইউপি পরিদর্শনে বিভাগীয় কমিশনার দীঘিনালায় প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা, হুমকিতে বনভূমি ও কৃষিজমি ভবন-জনবল সংকটে অস্তিত্বের লড়াইয়ে মতলব পোস্ট অফিস পূর্বধলায় গোলাপ মিয়ার শুভেচ্ছা: জনগণের পাশে থেকে উন্নয়নের প্রত্যয় নেত্রকোনার পূর্বধলায় পৈতৃক ভিটা নিয়ে বিরোধ, আদালতে পৃথক মামলা দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে কিশোরীদের স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ক্লাস অংশ নিল ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী, বিতরণ করা হলো স্যানিটারি ন্যাপকিন টাকা পেলেই দেওয়া হচ্ছে অনুমোদন : নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বসিক, হু হু করে বাড়ছে অটোরিকশা সিলেটে পিটারের ট্যালেন্ট হান্ট, স্বপ্নের মাঠে ডাক নতুন নারী ফুটবলারদের চরভদ্রাসনে ডিএনসির অভিযানে নারীসহ দুই মাদক কারবারি আটক: ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৬ মাসের কারাদণ্ড পাঁচবিবিতে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল অসহায় ব্যক্তিকে হুইল চেয়ার বিতরণ রূপগঞ্জে অবৈধভাবে দখলে নেওয়া কৃষকদের জমি উদ্ধারের দাবীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ ‘জনআস্থা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি, সেটার বিচার করবে জনগণ’ চাকসু আন্তঃহল ফুটবলে ম্যাচসেরার পুরস্কার নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রাজাপুরে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার সেই যুবদল নেতা রাসেল বহিষ্কার নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ১১০৬ নিখোঁজের একদিন পর পুকুর পাড়ে মিলল তরুণের মরদেহ রূপগঞ্জ পূর্বাচলের আদিবাসিন্দাদের প্লট বরাদ্দের দাবিতে মানববন্ধন \ বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ রূপগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও জরিমানা রূপগঞ্জে আওয়ামীলীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

বরিশালে চলছে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি: রাজনৈতিক বিভাজনে বেড়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 07:07:37 pm, Tuesday, 6 October 2026
  • 37 বার পড়া হয়েছে

আরিফ আহমেদ,

বরিশাল শহরের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। কোথাও চলছে রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা। নির্মিত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ, চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। তবে উৎসবের এই প্রস্তুতির মধ্যেও পূজা আয়োজকদের বড় ভাবনা এখন নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গত দুই বছরের মতো এবারও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পাহারা ও সহযোগিতায় থাকার প্রত্যাশা জানিয়েছেন অনেক আয়োজক।
নগরীর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ মিশন পূজামণ্ডপ, সোনাঠাকুর প্রতিষ্ঠিত কালিবাহাড়ী বা বড় কালিবাড়ি, সাগরদী ঠাকুর বাড়ি, ভাটিখানা, কাটপট্টি নিয়োগী প্রাঙ্গণ, ফলপট্টি কালিমাতা ঠাকুরনীর মন্দির, সদর রোডের শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির, পাষাণময়ী কালিমাতার মন্দির, রাধা গোবিন্দ নিবাস ও শংকর মঠ পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পূজা আয়োজক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি থাকলেও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তাদের মতে, গত দুই বছরে বরিশালে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা দলীয় বিভাজনের বাইরে এসে যেভাবে মণ্ডপ পাহারা দিয়েছেন, তা ছিল সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত। এবারের দুর্গোৎসবেও সেই ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পূজার নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে বরিশালে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পী, মণ্ডপসজ্জাকারী, আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততায় নগরী থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
বরিশাল জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এ বছর মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৫৯০টি এবং মহানগর এলাকায় ৪৭টি মণ্ডপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার একটি মণ্ডপ বেড়েছে।
১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হবে।
নগরীর ফলপট্টি কালিমাতা ঠাকুরনীর মন্দির ও সদর রোডের শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। অধিকাংশ প্রতিমার কাঠামো ও মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে রং-তুলির কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।
প্রতিমাশিল্পী রনজিৎ পাল বলেন, রংসহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জায় ব্যয়ও বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে।
তবে প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি এবার নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকরা। বিভিন্ন মণ্ডপে স্থাপন করা হচ্ছে সিসি ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। মণ্ডপগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বরিশালের পূজা আয়োজকদের কাছে নিরাপত্তার প্রশ্নে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা তাদের সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও তৈরি করেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পাহারা।
২০২৪ সালে বরিশালের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। ২০২৫ সালেও প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মন্দির ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এবারের দুর্গোৎসবেও দল-মত নির্বিশেষে সেই ঐক্য ধরে রাখার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা জানান, মহানগরীতে এবার ৪৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় একটি মণ্ডপ বেড়েছে। অধিকাংশ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
বরিশাল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জী বলেন, প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতিমা নির্মাণ, রং ও সাজসজ্জার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব মণ্ডপের প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও সিসি ক্যামেরাসহ নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে বরিশাল জেলা প্রশাসন। গত রোববার সকালে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভীন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান উজ জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক হাফিজুর রহমান হীরাসহ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে পৃথক কর্মসূচি। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ৫ অক্টোবর সোমবার নগর ভবনের সভাকক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা ও অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
সভায় নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সার্বিক প্রস্তুতি, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পূজা উদযাপনকে নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় পূজা উদযাপন সংশ্লিষ্টদের মাঝে অনুদান প্রদান করা হয়।
সভায় বিভিন্ন পূজা উদযাপন পরিষদ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বক্তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সনাতন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা ঘিরে বরিশালের মানুষের প্রত্যাশা তাই শুধু উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ করা নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের যে পরিবেশ বরিশালে তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরও শক্তিশালী করা।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়িয়েছেন, এবারের দুর্গোৎসবেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দল-মত ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মণ্ডপের নিরাপত্তায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা উৎসবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থাও বাড়াতে পারে।
কারণ দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের সচেতনতা, পূজা কমিটির স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা। প্রশাসনের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য যুক্ত হলে একটি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়।
বরিশালের দুর্গোৎসব তাই এবার শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আয়োজন নয়। সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা ও রাজনৈতিক ঐক্যেরও একটি পরীক্ষা। গত দুই বছরের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ধরে রেখে এবারের দুর্গোৎসবেও বরিশাল নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির সেই দৃষ্টান্ত ধরে রাখুক- এটাই এখন নগরবাসী ও পূজা আয়োজকদের প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নানা পাটেকরের মৃত্যুতে আবেগঘন অক্ষয় কুমার

বরিশালে চলছে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি: রাজনৈতিক বিভাজনে বেড়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

আপডেট সময় : 07:07:37 pm, Tuesday, 6 October 2026

আরিফ আহমেদ,

বরিশাল শহরের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। কোথাও চলছে রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা। নির্মিত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ, চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। তবে উৎসবের এই প্রস্তুতির মধ্যেও পূজা আয়োজকদের বড় ভাবনা এখন নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গত দুই বছরের মতো এবারও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পাহারা ও সহযোগিতায় থাকার প্রত্যাশা জানিয়েছেন অনেক আয়োজক।
নগরীর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ মিশন পূজামণ্ডপ, সোনাঠাকুর প্রতিষ্ঠিত কালিবাহাড়ী বা বড় কালিবাড়ি, সাগরদী ঠাকুর বাড়ি, ভাটিখানা, কাটপট্টি নিয়োগী প্রাঙ্গণ, ফলপট্টি কালিমাতা ঠাকুরনীর মন্দির, সদর রোডের শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির, পাষাণময়ী কালিমাতার মন্দির, রাধা গোবিন্দ নিবাস ও শংকর মঠ পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পূজা আয়োজক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি থাকলেও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তাদের মতে, গত দুই বছরে বরিশালে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা দলীয় বিভাজনের বাইরে এসে যেভাবে মণ্ডপ পাহারা দিয়েছেন, তা ছিল সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত। এবারের দুর্গোৎসবেও সেই ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পূজার নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে বরিশালে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পী, মণ্ডপসজ্জাকারী, আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততায় নগরী থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
বরিশাল জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এ বছর মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৫৯০টি এবং মহানগর এলাকায় ৪৭টি মণ্ডপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার একটি মণ্ডপ বেড়েছে।
১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হবে।
নগরীর ফলপট্টি কালিমাতা ঠাকুরনীর মন্দির ও সদর রোডের শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। অধিকাংশ প্রতিমার কাঠামো ও মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে রং-তুলির কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।
প্রতিমাশিল্পী রনজিৎ পাল বলেন, রংসহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জায় ব্যয়ও বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে।
তবে প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি এবার নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকরা। বিভিন্ন মণ্ডপে স্থাপন করা হচ্ছে সিসি ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। মণ্ডপগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বরিশালের পূজা আয়োজকদের কাছে নিরাপত্তার প্রশ্নে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা তাদের সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও তৈরি করেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পাহারা।
২০২৪ সালে বরিশালের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। ২০২৫ সালেও প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মন্দির ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এবারের দুর্গোৎসবেও দল-মত নির্বিশেষে সেই ঐক্য ধরে রাখার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা জানান, মহানগরীতে এবার ৪৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় একটি মণ্ডপ বেড়েছে। অধিকাংশ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
বরিশাল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জী বলেন, প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতিমা নির্মাণ, রং ও সাজসজ্জার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব মণ্ডপের প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও সিসি ক্যামেরাসহ নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে বরিশাল জেলা প্রশাসন। গত রোববার সকালে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভীন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান উজ জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক হাফিজুর রহমান হীরাসহ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে পৃথক কর্মসূচি। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ৫ অক্টোবর সোমবার নগর ভবনের সভাকক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা ও অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
সভায় নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সার্বিক প্রস্তুতি, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পূজা উদযাপনকে নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় পূজা উদযাপন সংশ্লিষ্টদের মাঝে অনুদান প্রদান করা হয়।
সভায় বিভিন্ন পূজা উদযাপন পরিষদ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বক্তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সনাতন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা ঘিরে বরিশালের মানুষের প্রত্যাশা তাই শুধু উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ করা নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের যে পরিবেশ বরিশালে তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরও শক্তিশালী করা।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়িয়েছেন, এবারের দুর্গোৎসবেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দল-মত ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মণ্ডপের নিরাপত্তায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা উৎসবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থাও বাড়াতে পারে।
কারণ দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের সচেতনতা, পূজা কমিটির স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা। প্রশাসনের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য যুক্ত হলে একটি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়।
বরিশালের দুর্গোৎসব তাই এবার শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আয়োজন নয়। সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা ও রাজনৈতিক ঐক্যেরও একটি পরীক্ষা। গত দুই বছরের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ধরে রেখে এবারের দুর্গোৎসবেও বরিশাল নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির সেই দৃষ্টান্ত ধরে রাখুক- এটাই এখন নগরবাসী ও পূজা আয়োজকদের প্রত্যাশা।