
আরিফ আহমেদ,
যদি সব স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়… যাক না সে..
রোদ্র পোহানো শীতের সকালটা, যদি-বা অগোচরে ঝরেই যায়… যাক না সে…। এই গানের সাথেই চোখের জলে মিশে গেছে অতীতের গল্পগাথা। একসময় স্বপ্ন ছিল, ছিল মেধা, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা আর নিজের মতো করে জীবন গড়ার আকাঙ্ক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়ার সেই সাফল্য হয়তো একদিন মনে হয়েছিল জীবনের অনেক দরজা খুলে দেবে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই রুমা বেগমের ঠিকানা এখন বরিশালের একটি বৃদ্ধাশ্রম। স্বামী নেই, সন্তান নেই। আপনজনদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন তিনি। পটুয়াখালীর বগা থেকে শেষ বয়সে এসে তার আশ্রয় হয়েছে বরিশাল নগরীর কাউনিয়ায় শাখাওয়াতের বৃদ্ধাশ্রমে। রুমার গল্প শুধু একজন নারীর নিঃসঙ্গতার গল্প নয়। এটি যেন জীবনের এক নির্মম বৈপরীত্য, যে নারী শিক্ষাজীবনে সাফল্যের শীর্ষে উঠেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তার সবচেয়ে বড় অভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন আপন মানুষের সঙ্গ।
কাউনিয়ার এই বৃদ্ধাশ্রমে রুমা একা নন। তার মতো প্রায় ৭০ জন প্রবীণ নারী-পুরুষ এখন এখানে বসবাস করছেন। তাদের অনেকের সন্তান আছে, কারো কারো সন্তানতো দূরের কথা নেই কোনো আপনজনও। কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউ আপনজনের অবহেলার শিকার। আবার কেউ এখনো অপেক্ষা করছেন- হয়তো কোনো একদিন পরিচিত মুখটি ফিরে আসবে, দরজায় দাঁড়িয়ে বলবে, ‘চলো, তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।’
রুমা বেগমের জীবনের যেন সাফল্য আর শূন্যতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ঢাকার মগবাজারের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান তিনি। একসময় মেধা আর স্বপ্নকে সঙ্গী করে এগিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে একের পর এক আঘাত তাকে নিঃসঙ্গ করে দেয়। স্বামী নেই। সন্তানও নেই। স্বামীর দ্বিতীয় ঘরের সন্তানদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত আশ্রয় পাননি। নিজের পরিবারের সঙ্গেও তৈরি হয়েছে দূরত্ব। শেষ পর্যন্ত পটুয়াখালীর বগা থেকে জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে ঠাঁই হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে।
আজ নতুন মানুষগুলোর সঙ্গে বসে কথা বলেন রুমা। কখনো হাসেন, কখনো অন্যদের গল্প শোনেন। কিন্তু পুরোনো জীবনের কথা উঠলেই যেন থেমে যায় তাঁর কণ্ঠ। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন দূরে। একসময় চারপাশে ছিল পরিচিত মানুষ, ছিল নিজের বলে কিছু মানুষ। আজ সেই জীবনই তাঁর কাছে কেবল স্মৃতি।
রুমা একা নন। এই বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটছে আসমা, খাদেজা, অঞ্জলী, উষা রানী, বানু ও কহিনূর বেগমের মতো আরও অনেক নারীর। প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কিন্তু কষ্টের জায়গাটি প্রায় একই, আপনজনের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আসমার জীবনে ছিল সংসার। ছিল পরিবার, ছিল আপনজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংসারের মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেছে। এখন অন্য প্রবীণ নারীদের সঙ্গে গল্প করেই দিনের বড় একটা সময় কাটে তার। কিন্তু কথার মাঝখানে সন্তানদের প্রসঙ্গ এলেই থেমে যায় তার কণ্ঠ।
খাদেজার জীবন কেটেছে সন্তানদের ঘিরে। সন্তানদের বড় করেছেন, সংসার সামলেছেন, নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে পরিবারের প্রয়োজনকে সামনে রেখেছেন। অথচ জীবনের শেষবেলায় এসে সেই সন্তানদের কাছেই তিনি যেন বাড়তি একজন মানুষ। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।
অঞ্জলী রানীর চাওয়াটাও বড় কিছু নয়। শেষ বয়সে এসে তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। সন্তানরা কাছে এসে একটু বসুক, দুটো কথা বলুক, এটিই তার কাছে যথেষ্ট। সারা জীবন যাদের জন্য করেছেন, তাদের কাছ থেকে এখন কোনো বড় দাবি নেই। শুধু একবার যেন মনে হয়, তিনি এখনো তাদের প্রয়োজনের মানুষ।
উষা রানীর জীবনেও রয়েছে আপনজন হারানোর বেদনা। কেউ দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে থেকেও একসময় বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। কেউ আবার ধীরে ধীরে হারিয়েছেন নিজের ঘরে নিজেরই থাকার অধিকার। বয়সের ভারে শরীর যখন আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কাছের একজন মানুষের। কিন্তু তাদের পাশে সেই মানুষটিই আর নেই।
বানু ও কহিনূর বেগমও এখন এই বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। কখনো কারও সঙ্গে কথা বলেন, কারও সঙ্গে পুরোনো দিনের গল্প করেন। কখনো হাসেন। আবার কখনো চুপচাপ বসে থাকেন। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা।
জীবনের পড়ন্ত বেলায় এই মানুষগুলোর চাওয়া তো খুব বেশি কিছু নয়, একটি পরিচিত মুখ, একটু সময়, দুটো কথা, প্রয়োজনে মাথায় হাত রাখার মতো একটু ভালোবাসা।
কিন্তু সেই মানুষটিই যখন পাশে থাকে না, তখন চার দেয়ালের একটি কক্ষও হয়ে ওঠে বিশাল এক নিঃসঙ্গ পৃথিবী।
বরিশালের কাউনিয়ার এই বৃদ্ধাশ্রমের সঙ্গে আমারও দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ও এর প্রতিষ্ঠাতা শাখাওয়াতের অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা নিয়ে বরিশালে কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেছি। এমনকি অসহায় প্রবীণদের জন্য তার এই উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিতে সাহিত্য বাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে শাখাওয়াতকে সম্মাননা ক্রেস্টও প্রদান করা হয়েছিল।
কারণ, শাখাওয়াত হোসেন নিজের বৃদ্ধ বাবা-মাকে সাথে নিয়ে এই বৃদ্ধাশ্রম চালু করতে, নিজেই দানবাক্স নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তা ছিলো আরো বেশি মানবিক। তখনও প্রশ্নটি ছিল, যে মানুষগুলো জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবার ও সমাজের জন্য দিয়েছেন, শেষ বয়সে তাদের পাশে দাঁড়াবে কে?
আজ রুমার আগমনের মধ্য দিয়ে সেই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।
শাখাওয়াতের বৃদ্ধাশ্রম শুধু একটি ছাদের নিচে কয়েকজন অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জায়গা নয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এখানে থাকা প্রবীণদের খাবার, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যত্নের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি বিষয় কোনো আয়োজন দিয়েই পূরণ করা যায় না। তা হচ্ছে – আপনজনের ভালোবাসা।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাখাওয়াত বলেন, এখানে থাকা প্রায় প্রতিটি প্রবীণ মানুষের জীবনেই রয়েছে কষ্টের গল্প। কেউ সন্তানদের অবহেলায় এসেছেন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অনেকেই এখনো স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করেন।
আমি এবং আমার সহকর্মীরা তাদের কাছে সন্তানতূল্য। কিন্তু তারপরও শূন্যতা থেকেই যায়। তাদের চোখেমুখে তারপরও সন্তান বা আপনজনের জন্য অপেক্ষা খুঁজে পাই।
সেই অপেক্ষাই হয়তো উষা, অঞ্জলি ও রুমাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা, পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষা, হঠাৎ কেউ এসে বলবে- ‘মা, কেমন আছ?’
এই সামান্য চাওয়াটুকুই হয়তো তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কাউনিয়ার বৃদ্ধাশ্রম তাই কেবল কয়েক ডজন প্রবীণের আশ্রয়স্থল নয়। এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও মূল্যবোধের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আয়না। সেই আয়নায় রুমার মুখে যেমন শিক্ষাজীবনের সাফল্য দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপনজন হারানোর গভীর শূন্যতাও।
রুমার জীবনে একসময় ‘ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট’ শব্দটি গৌরবের পরিচয় ছিল। আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো ফলাফল, সনদ কিংবা পরিচয় নয়, একজন আপন মানুষ। আর এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি মা যেন নীরবে একই কথাই বলছেন, জীবনের শেষ বয়সে আমাদের আর কিছু চাই না, শুধু একটু ভালোবাসা চাই
















