
আরিফ আহমেদ,
একাকী নির্জনে পড়ে আছে,
কেউ নাই সাথী তার
বুকে কেবল রক্তক্ষরণ।
ঘুণপোকা খাচ্ছে
কাঠের আসবাব,
ত্রিশ হাজার বইয়ে ধরেছে পচন।
অথচ সাংবাদিকরা নাকি বইপ্রেমিক হয়, কেউ কেউ নিজ ঘরেই পাঠাগারও বানায়।
এদিকে আবার
তাদের জন্য বিলুপ্ত পাঠাগার।। একটি পাঠাগারের জায়গা আটকে রেখে সাংবাদিক দাবীদার সংগঠনের কার্যালয় চলছে- এ কোন সৃজনশীলতার চর্চা বরিশালে?
এভাবেই কি হারিয়ে যেতে বসেছে বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী? যে পাঠাগার একসময় ছিল নগরীর বিবির পুকুর পাড়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, আজ সেটিই যেন নিজ অস্তিত্ব রক্ষায় অসহায়। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, জরাজীর্ণ ভবন, নষ্ট হয়ে যাওয়া বই ও আসবাবপত্র এবং ভবন ব্যবহার নিয়ে বিরোধ, সব মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী শুধু একটি পাঠাগার নয়, বরং বরিশালের দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে দেশভাগ, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পদচারণায় মুখর ছিল এই প্রতিষ্ঠান। খান বাহাদুর হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ, অশ্বিনী কুমার দত্ত, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, সরদার ফজলুল করীম, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মৃতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু সেই ঐতিহ্য আজ কোথায়?
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাধ বা বান্দ রোডের কালেক্টর স্কুল এন্ড কলেজ এর জায়গায় সরিয়ে নেয়া নিঃসঙ্গ পাঠাগারটির জরাজীর্ণ দশা। মানুষের অনুপস্থিতি ও অবহেলায় ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও ফাটল, কোথাও স্যাঁতসেঁতে দাগ। জানালার কাচ ভাঙা। দীর্ঘদিনের অযত্নে ভবনের সামগ্রিক পরিবেশও হয়ে পড়েছে বিবর্ণ। কাঠের আসবাবপত্রে ঘুণ ধরেছে। বই সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থাও নেই।
লাইব্রেরির কেয়ারটেকার শহীদ গাজীর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৪ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পুরোনো ও দুর্লভ বই রয়েছে বলে জানা গেলেও সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বইয়ের একটি বড় অংশ পোকামাকড়ের ক্ষতির শিকার হয়েছে।
শুধু বই নয়, পাঠকও হারিয়েছে এই গ্রন্থাগার। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এখানে নিয়মিত পাঠ কার্যক্রম বন্ধ। অথচ একসময় লাইব্রেরিটির সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০ এবং আজীবন সদস্য ছিলেন প্রায় ৬০০ জন। সদস্য হতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও এক কপি ছবি দিতে হতো। ভর্তি ফি ছিল ২০০ টাকা এবং মাসিক সদস্য ফি ২০ টাকা।
প্রশ্ন উঠছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে কার্যত অচল হয়ে থাকল?
জানা গেছে, ১৮৫৪ সালে বরিশাল নগরীর এনএক্স ভবন সংলগ্ন বিবির পুকুর পাড়ে প্রায় ১৭ দশমিক ৭০ শতক জায়গার ওপর পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে এটি নগরীর বাঁধ রোডে স্থানান্তর করা হয়। এরপর পুরোনো ভবনটি দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে ২০০২ সালের দিকে ভবনটি জেলা প্রশাসনের থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার শুরু করে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি। এখন তারা নিজারাই মালিকের মতো আচরণ করছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই ভবন ব্যবহার এবং পাবলিক লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ নিয়েই চলছে বিরোধ। তৈরি হয়েছে পক্ষ বিপক্ষে নাগরিক কমিটিও।
এক পক্ষের অভিযোগ, ঐতিহ্যবাহী পাবলিক লাইব্রেরির নিজস্ব ভবন থেকে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিকে সরিয়ে সেখানে পুনরায় পাঠাগার চালু করতে হবে। তাদের দাবি, লাইব্রেরির জায়গা ও ভবন ভাড়াটিয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না।
অন্যদিকে রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতাদের বক্তব্য, তারা ভবনটির মালিকানা দাবি করছেন না। তাদের দাবি, ২০০২ সালে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ভবনটি ভাড়া নেওয়ার সময় এটি ছিল পরিত্যক্ত ও নোংরা অবস্থায়। পরে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে ভবনটি সংস্কার ও ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। তাদের মতে, তারা সেখানে অবস্থান না করলে ভবনটি আরও আগেই বেদখল হয়ে যেতে পারত।
রিপোর্টার্স ইউনিটির পক্ষের সাংবাদিকদের আরও বক্তব্য, বর্তমান জায়গাটিই নদী তীরবর্তী মনোরম পরিবেশে হওয়ায় সেখানে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করে পাবলিক লাইব্রেরিকে পুনরায় চালু করা সম্ভব। একই সঙ্গে তারা লাইব্রেরির প্রশাসনিক কাঠামো ঠিক করা এবং পাঠক সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে লাইব্রেরি পুনরুদ্ধারের দাবিতে সক্রিয় কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু, কাজী মিজানুর রহমান, মহিউদ্দিন মানিক প্রমূখদের অভিযোগ, ভাড়াটিয়া হিসেবে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে পুরো ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং লাইব্রেরির নিজস্ব পরিচয় আড়াল হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেছেন, অতীতে লাইব্রেরি পুনরায় চালুর জন্য আবেদন ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এই বিরোধ এখন আর শুধু দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক মাসে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর পুরোনো লাইব্রেরি ভবনের সামনে বইপাঠ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গঠন করা হয় ৫১ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটি। এর বিপরীতে রিপোর্টার্স ইউনিটির পক্ষ থেকেও নাগরিক মতবিনিময় সভা করে জেলা প্রশাসকের কাছে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাবলিক লাইব্রেরি পুনরায় সচল করা, ভবন সংস্কার ও আধুনিক ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, নতুন আসবাবপত্র সংগ্রহ, পুরোনো আসবাব সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ এডহক কমিটি বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কমিটি নির্বাচন, নতুন পাঠক সৃষ্টিতে প্রচার-প্রচারণা এবং লাইব্রেরির সম্পদ ও সম্পত্তি সংরক্ষণ।
অর্থাৎ দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় যেন মিল রয়েছে – বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরিকে আবার সচল করতে হবে।
তাহলে প্রশ্ন, সেটি হচ্ছে না কেন?
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। পাবলিক লাইব্রেরির সভাপতি পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক এবং সাধারণ সম্পাদক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা দূর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বও কম নয়। গত প্রায় ৩০ বছর ধরে লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও পুনরায় চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে নগরবাসীর অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সাংবাদিকদের কোনো একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হতে পারেন, এমন আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক শুধু নয়, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলাও এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদি এমন আশঙ্কাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আরও উদ্বেগের বিষয়। কারণ এখানে কোনো সাংবাদিক সংগঠন বা কোনো ব্যক্তির স্বার্থের প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বরিশালের ঐতিহাসিক পাবলিক লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ কী হবে?
সম্প্রতি বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে নাগরিকদের পক্ষ থেকে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, নতুন বই সংগ্রহ, পোকামাকড়ের হাত থেকে বই ও আসবাবপত্র রক্ষা, পাঠকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও আসবাবপত্রের ব্যবস্থা এবং আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি চালুর দাবি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে নতুন জায়গায় আধুনিক লাইব্রেরি নির্মাণের প্রস্তাবও এসেছে।
নগরীর সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বলছেন, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের মধ্যে বিরোধ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের মতে, কে ভবন ব্যবহার করবে, এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত কীভাবে পাবলিক লাইব্রেরিকে সচল করা যায়। প্রয়োজন হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা যেতে পারে।
কারও কারও প্রস্তাব, পুরোনো ভবনটি আধুনিকায়ন করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। সেখানে রিপোর্টার্স ইউনিটির জন্য একটি অংশ এবং পাবলিক লাইব্রেরির জন্য পৃথক অংশ রাখা সম্ভব। আবার অন্য পক্ষের দাবি, লাইব্রেরির নিজস্ব ভবন সম্পূর্ণভাবে পাঠাগারের জন্য ফিরিয়ে দিতে হবে।
তবে মতপার্থক্য যাই থাকুক, এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত।
কারণ সময় চলে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে বই। ঘুণে খাচ্ছে আসবাব। ভবনের দেয়াল ক্ষয়ে যাচ্ছে। আর নতুন প্রজন্ম জানতেই পারছে না, এই নগরীর প্রাণকেন্দ্রেই একসময় ছিল এমন একটি পাঠাগার, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বরিশালের বহু প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস।
একজন কেয়ারটেকার এখনও বইগুলো আগলে বসে আছেন। মাসে সামান্য সম্মানীর বিনিময়ে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তার নিজের সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে এত বড় একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব একজন মানুষের ওপর ছেড়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ তাই এখন শুধু একটি ভবনের প্রশ্ন নয়। এটি বরিশালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
প্রশাসনের উচিত দ্রুত দুই পক্ষের সঙ্গে বসে কাগজপত্র, মালিকানা, ভাড়া, ব্যবহার ও পরিচালনা কাঠামোর বিষয়গুলো পরিষ্কার করা। একই সঙ্গে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, যাতে কোনো পক্ষের ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থের চেয়ে পাবলিক লাইব্রেরির স্বার্থই প্রাধান্য পায়।
কারণ—
একটি পাঠাগার ধ্বংস হওয়া মানে শুধু একটি পুরোনো ভবন হারিয়ে যাওয়া নয়।
একটি পাঠাগার হারিয়ে যাওয়া মানে একটি শহরের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া।
একটি প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আর ১৮৫৪ সালে যে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি জ্ঞানের আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটি যদি আজ অবহেলা, বিরোধ ও প্রশাসনিক নীরবতার কারণে বিলুপ্ত হয়ে যায়- তাহলে ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হবে না, ক্ষতি হবে বরিশালের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। তাই এখন প্রশ্ন একটাই, আর কত আবেদন হলে, আর কতদিন অপেক্ষার পর, আবার খুলবে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরির দরজা?
















