
মোঃ আব্বাস উদ্দিন,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে, ৭ জনের ৪০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডসহ জব্দ করা হয়েছে ড্রেজার ও বাল্কহেড, নদীভাঙনের ঝুঁকিতে চর কাকরিয়াসহ আশপাশের জনপদ সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের চর কাকরিয়া এলাকায় মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। বুধবার (১২ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে ৪০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযান পরিচালনা করেন সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম। এ সময় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার মেশিন ও একটি বাল্কহেড জব্দ করা হয়। আটক ও দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— রাহাত (১৭), মো. আলামিন (২৫), হৃদয় (১৮), কামাল (৫০), আবুল কাসেম (৪০), মো. ফুরকান মিয়া (৩৩) ও আওলাদ হোসেন (২৮)।
গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই চলছিল বালু উত্তোলন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অরুয়াইল ইউনিয়নের চর কাকরিয়া এলাকায় মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বালু ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নদীভাঙনের আতঙ্কে কয়েকটি গ্রাম অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে মেঘনা নদীর তীরবর্তী ঐতিহাসিক আজবপুর, নতুনহাটি ও পানিশ্বর গ্রামের মানুষও নদীভাঙন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, নদীর নির্দিষ্ট এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র হতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বসতভিটা ও কৃষিজমি। ইতোমধ্যে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। অভিযানে গিয়ে হাতে-নাতে আটক বুধবার উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সময় সাতজনকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার মেশিন ও একটি বাল্কহেড জব্দ করা হয়। পরে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৪০ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাতজনকেই ৪০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের এ অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে নদীতীরবর্তী এলাকায় স্বস্তি ফিরে আসে। স্থানীয়রা প্রশাসনের এমন অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে নদী রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, মেঘনা নদীতে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। নদী ও সরকারি সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি নদীতীরবর্তী মানুষের জানমাল ও বসতভিটা রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের মাধ্যমে কেউ নদীর পরিবেশ ও তীরবর্তী জনপদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেললে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে শুধু একদিনের অভিযান যথেষ্ট নয়। ড্রেজার মালিক ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে নিয়মিত নজরদারি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, মেঘনা নদী শুধু একটি জলপ্রবাহ নয়—এ নদীর সঙ্গে তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, যোগাযোগ ও বসতভিটার নিরাপত্তা জড়িত। তাই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসনের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং মেঘনা নদীর চর কাকরিয়া অংশসহ সরাইল উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে। এতে একদিকে সরকারি বালুমহাল ও নদীর সম্পদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে তীরবর্তী জনপদ।

























