
বিজয় চৌধুরী, ঢাকা,
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর পড়তে পারে।
ইউনিসেফ (UNICEF)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিকে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী এখনো বাংলা ভাষায় পড়া ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। অনেকেই “শিক্ষানবিশ (Novice)” পর্যায়ে রয়ে গেছে, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখার এই ঘাটতি পূরণ না হলে অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। এর ফলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং সামাজিক বৈষম্যের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশু কোনো না কোনোভাবে পাঠদানে বাধার মুখে পড়ে। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেনি।
সাম্প্রতিক শিক্ষা বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে অগ্রগতি হলেও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার এখনো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিশু অর্থনৈতিক কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে শুধু ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক ক্লাস, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ এবং দুর্যোগকালেও পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনিসেফের সুপারিশ অনুযায়ী, শিখন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে রেমিডিয়াল (ক্যাচ-আপ) শিক্ষা, শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অপূর্ণ থেকে যাওয়া। তাই প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।


























