Dhaka , Wednesday, 4 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
স্পেনের ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ ইয়ামালের বাবার স্কুলে থাকতেই পাইলট, বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল নাথালিয়ার স্বর্ণের চাহিদায় ভাটা, কমল বার ও কয়েন কেনার পূর্বাভাস শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি মুছে যায় মনের কষ্ট? ‘ও আমাকে মা-বাবার চেয়েও বেশি বোঝে’ সরাইলে পাগলা কুকুরের কামড়ে নারীসহ ৮ জন আহত, এলাকায় আতঙ্ক কালিয়াকৈরে তুরাগ নদীতে বন্ধুদের সাথে সাতার কাটতে গিয়ে নিখোজ গার্মেন্টস শ্রমিকের লাশ উদ্ধার কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বান নাহিদ ইসলামের শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি রূপগঞ্জে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনতাই রূপগঞ্জে সিম গ্রুপের পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ টেকনাফের সাগরে মাছ ধরার নৌকায় বজ্রপাতের আঘাতে ১ জেলে নিহত! নবপ্রজন্মের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য ও শাশ্বত জীবনদর্শন তুলে ধরতে হবে – ইসলামী যুবসমাজ দুর্গাপুরে নাঈমুরের সাফল্যের হেট্রিক : টানা তিন পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে নতুন ইতিহাস মধুপুরে পর্নোগ্রাফি ও ইয়াবা কারবারের অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার, মোবাইল-ল্যাপটপ উদ্ধার পাইকগাছায় মরহুম শামসুর রহমানের স্মরণে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া মাহফিল ‎গাইবান্ধায় এলজিইডির বাস্তবায়নে খানাখন্দের রাস্তা ফিরে পেল প্রাণ ভেড়ামারা সরকারি মহিলা কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত দীর্ঘদিন পর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কারি শিল্পের জয়গান: সেরা রেস্তোরাঁ ও শেফদের বিসিএ সম্মাননা অনুষ্ঠিত মাদারীপুর সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বামী হত্যার পর অনিশ্চয়তায় দুই সন্তান, পাশে দাঁড়ালেন ডেপুটি স্পিকার; ল্যাবএইডে চাকরি পেলেন সাংবাদিক আলিফ ফকিরের স্ত্রী সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে অগ্রণী ভূমিকা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় প্রশংসিত মোঃ কাউছার ভূঁইয়া চট্টগ্রামের অপহরণ, ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি মামলার প্রধান আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার প্রধানমন্ত্রীর খুলনা আগমন উপলক্ষে পাইকগাছা বিএনপির প্রস্তুতি সভা রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ সকল বাধা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে: বিসিএস ক্যাডার হিসেবে অমিত খানের নতুন যাত্রা আবার উত্তপ্ত বরিশালের চরকাউয়া: বাস ও ইজিবাইক শ্রমিকদের দ্বন্দ্বে জিম্মি তিন উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ কক্সবাজার শিল্প ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬-২৭-এর উদ্বোধন, প্রধান অতিথি এমপি লুৎফুর রহমান কাজল

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 04:11:52 pm, Sunday, 5 July 2026
  • 99 বার পড়া হয়েছে

জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট,

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষ হওয়ার গুণ যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য মুখ, অসংখ্য পরিচয়, অসংখ্য সম্পর্ক—তবুও কোথাও যেন মানবিকতার গভীর সংকট। তাই আজ অনেকের কণ্ঠে একটি দীর্ঘশ্বাস—”মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ!”

তবে প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি সব মানুষ অমানুষ হয়ে গেছে? নাকি কিছু অমানবিক ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে এমন হতাশার জন্ম দিচ্ছে?

প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক নির্মমতার চিত্র। কোথাও গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন একজন মানুষ বিচার পাওয়ার আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন। কোথাও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় ঝরে যাচ্ছে তরুণ প্রাণ। কোথাও নারী ও শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। কোথাও বৃদ্ধ বাবা-মাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সামান্য লাভের আশায় প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে হেয় করা, চরিত্রহনন করা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে ভিডিও ধারণের প্রতিযোগিতা—এসব দৃশ্য আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়কে কঠিনও করে তুলেছে। মানুষের কষ্ট আজ অনেকের কাছে সহমর্মিতার বিষয় নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উপকরণে। একজন অসহায় মানুষ সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে থাকেন, অথচ অনেকেই সেই মুহূর্তটি মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা শুধু অনৈতিক নয়, এটি আমাদের মানবিক অবক্ষয়েরও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতিও অমানবিকতার এক নীরব রূপ। জনগণের অর্থ আত্মসাৎ মানে শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতি নয়; এটি একজন রোগীর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ হারানো কিংবা একজন দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, অনিয়ম ও বৈষম্য সমাজে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানবিক সম্পর্ককেও দুর্বল করে দেয়।

তবে অন্ধকারই শেষ কথা নয়। এখনও এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন বাঁচান। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ নীরবে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। তারা প্রচারের আলোয় না থাকলেও তাদের মানবিকতা সমাজকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।

সাংবাদিক হিসেবে মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি সমাজকে ধ্বংস করে শুধু বড় বড় অপরাধ নয়; ছোট ছোট অমানবিক আচরণও। লাইনে দাঁড়িয়ে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, দুর্বল মানুষকে অপমান করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, অসহায় মানুষের আর্তনাদ উপেক্ষা করা কিংবা নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো—এসবও অমানুষ হওয়ার লক্ষণ।

মানুষ হওয়া শুধু জন্মগত পরিচয় নয়; এটি বিবেক, সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধের সমন্বয়। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে বড় মানুষ বানায় না। একজন রিকশাচালকও মানবিকতায় মহৎ হতে পারেন, আবার কোটি টাকার মালিকও বিবেকহীন হতে পারেন।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শিখছি? আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারছি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিচ্ছি?

আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারে না। সেই কাজটি করতে পারে পরিবার, শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সামাজিক সংস্কৃতি। তাই মানবিক সমাজ গঠনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্যকে সমর্থন করা এবং নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা—এসবই একজন প্রকৃত মানুষের পরিচয়। সমাজ পরিবর্তনের সূচনা অন্য কারও মাধ্যমে নয়; শুরু হতে হবে নিজের ভেতর থেকেই।

তাই “মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ”—এই বাক্যটি যেন চূড়ান্ত রায় না হয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে ওঠে। কারণ একটি সভ্যতার পতন শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যের কান্নায় আর কাঁদে না, অন্যের কষ্টে আর ব্যথিত হয় না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ পরিচয়ে নয়, মানবিকতায় বড় হবে; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিবেকের মূল্য বেশি হবে; যেখানে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ ক্যামেরার সামনে নয়, মানুষের হাতেই আশ্রয় খুঁজে পাবে। কারণ পৃথিবী আজও টিকে আছে সেইসব মানুষের জন্য, যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে জানেন। আর সেই মানুষগুলোর কারণেই এখনও বিশ্বাস করা যায়—মানবতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

স্পেনের ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ ইয়ামালের বাবার

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আপডেট সময় : 04:11:52 pm, Sunday, 5 July 2026

জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট,

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষ হওয়ার গুণ যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য মুখ, অসংখ্য পরিচয়, অসংখ্য সম্পর্ক—তবুও কোথাও যেন মানবিকতার গভীর সংকট। তাই আজ অনেকের কণ্ঠে একটি দীর্ঘশ্বাস—”মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ!”

তবে প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি সব মানুষ অমানুষ হয়ে গেছে? নাকি কিছু অমানবিক ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে এমন হতাশার জন্ম দিচ্ছে?

প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক নির্মমতার চিত্র। কোথাও গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন একজন মানুষ বিচার পাওয়ার আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন। কোথাও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় ঝরে যাচ্ছে তরুণ প্রাণ। কোথাও নারী ও শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। কোথাও বৃদ্ধ বাবা-মাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সামান্য লাভের আশায় প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে হেয় করা, চরিত্রহনন করা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে ভিডিও ধারণের প্রতিযোগিতা—এসব দৃশ্য আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়কে কঠিনও করে তুলেছে। মানুষের কষ্ট আজ অনেকের কাছে সহমর্মিতার বিষয় নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উপকরণে। একজন অসহায় মানুষ সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে থাকেন, অথচ অনেকেই সেই মুহূর্তটি মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা শুধু অনৈতিক নয়, এটি আমাদের মানবিক অবক্ষয়েরও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতিও অমানবিকতার এক নীরব রূপ। জনগণের অর্থ আত্মসাৎ মানে শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতি নয়; এটি একজন রোগীর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ হারানো কিংবা একজন দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, অনিয়ম ও বৈষম্য সমাজে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানবিক সম্পর্ককেও দুর্বল করে দেয়।

তবে অন্ধকারই শেষ কথা নয়। এখনও এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন বাঁচান। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ নীরবে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। তারা প্রচারের আলোয় না থাকলেও তাদের মানবিকতা সমাজকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।

সাংবাদিক হিসেবে মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি সমাজকে ধ্বংস করে শুধু বড় বড় অপরাধ নয়; ছোট ছোট অমানবিক আচরণও। লাইনে দাঁড়িয়ে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, দুর্বল মানুষকে অপমান করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, অসহায় মানুষের আর্তনাদ উপেক্ষা করা কিংবা নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো—এসবও অমানুষ হওয়ার লক্ষণ।

মানুষ হওয়া শুধু জন্মগত পরিচয় নয়; এটি বিবেক, সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধের সমন্বয়। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে বড় মানুষ বানায় না। একজন রিকশাচালকও মানবিকতায় মহৎ হতে পারেন, আবার কোটি টাকার মালিকও বিবেকহীন হতে পারেন।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শিখছি? আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারছি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিচ্ছি?

আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারে না। সেই কাজটি করতে পারে পরিবার, শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সামাজিক সংস্কৃতি। তাই মানবিক সমাজ গঠনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্যকে সমর্থন করা এবং নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা—এসবই একজন প্রকৃত মানুষের পরিচয়। সমাজ পরিবর্তনের সূচনা অন্য কারও মাধ্যমে নয়; শুরু হতে হবে নিজের ভেতর থেকেই।

তাই “মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ”—এই বাক্যটি যেন চূড়ান্ত রায় না হয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে ওঠে। কারণ একটি সভ্যতার পতন শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যের কান্নায় আর কাঁদে না, অন্যের কষ্টে আর ব্যথিত হয় না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ পরিচয়ে নয়, মানবিকতায় বড় হবে; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিবেকের মূল্য বেশি হবে; যেখানে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ ক্যামেরার সামনে নয়, মানুষের হাতেই আশ্রয় খুঁজে পাবে। কারণ পৃথিবী আজও টিকে আছে সেইসব মানুষের জন্য, যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে জানেন। আর সেই মানুষগুলোর কারণেই এখনও বিশ্বাস করা যায়—মানবতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।