Dhaka , Tuesday, 3 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বান নাহিদ ইসলামের শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি রূপগঞ্জে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনতাই রূপগঞ্জে সিম গ্রুপের পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ টেকনাফের সাগরে মাছ ধরার নৌকায় বজ্রপাতের আঘাতে ১ জেলে নিহত! নবপ্রজন্মের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য ও শাশ্বত জীবনদর্শন তুলে ধরতে হবে – ইসলামী যুবসমাজ দুর্গাপুরে নাঈমুরের সাফল্যের হেট্রিক : টানা তিন পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে নতুন ইতিহাস মধুপুরে পর্নোগ্রাফি ও ইয়াবা কারবারের অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার, মোবাইল-ল্যাপটপ উদ্ধার পাইকগাছায় মরহুম শামসুর রহমানের স্মরণে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া মাহফিল ‎গাইবান্ধায় এলজিইডির বাস্তবায়নে খানাখন্দের রাস্তা ফিরে পেল প্রাণ ভেড়ামারা সরকারি মহিলা কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত দীর্ঘদিন পর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কারি শিল্পের জয়গান: সেরা রেস্তোরাঁ ও শেফদের বিসিএ সম্মাননা অনুষ্ঠিত মাদারীপুর সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বামী হত্যার পর অনিশ্চয়তায় দুই সন্তান, পাশে দাঁড়ালেন ডেপুটি স্পিকার; ল্যাবএইডে চাকরি পেলেন সাংবাদিক আলিফ ফকিরের স্ত্রী সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে অগ্রণী ভূমিকা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় প্রশংসিত মোঃ কাউছার ভূঁইয়া চট্টগ্রামের অপহরণ, ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি মামলার প্রধান আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার প্রধানমন্ত্রীর খুলনা আগমন উপলক্ষে পাইকগাছা বিএনপির প্রস্তুতি সভা রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ সকল বাধা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে: বিসিএস ক্যাডার হিসেবে অমিত খানের নতুন যাত্রা আবার উত্তপ্ত বরিশালের চরকাউয়া: বাস ও ইজিবাইক শ্রমিকদের দ্বন্দ্বে জিম্মি তিন উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ কক্সবাজার শিল্প ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬-২৭-এর উদ্বোধন, প্রধান অতিথি এমপি লুৎফুর রহমান কাজল ধর্মপাশার সার অবৈধভাবে পাচারের সময় বারহাট্টা থানায় আটক পাইকগাছায় ভাসমান হাসপাতালের উদ্বোধন করলেন এমপি; ৩ মাস সেবা পাবেন সুবিধাবঞ্চিতরা হলুদের সাজে তৌসিফ-সাফা, নতুন নাটকের দৃশ্য নাকি পারিবারিক অনুষ্ঠান? চট্টগ্রামে যুবদল কর্মী জীবন হত্যা মামলার প্রধান আসামি জুয়েলসহ গ্রেপ্তার ৩ পাইকগাছায় মরহুম শামসুর রহমানের স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত পাইকগাছায় পুলিশের তৎপরতায় খোয়া যাওয়া ৬ লাখ টাকা উদ্ধার শাস্তির অপেক্ষায় ম্যান সিটি, হালান্ডের ক্লাব ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন বাবা যোগদানের পরই মধুপুর থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশংসিত ওসি ফজলুল হক

বিপ্লব উদ্যান থেকে রাঙ্গুনিয়া: চট্টগ্রামে শহীদ জিয়ার স্মৃতি-ভূগোল ও ইতিহাসের বাঁক

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 03:14:43 pm, Wednesday, 12 August 2026
  • 31 বার পড়া হয়েছে

জাহিদুল করিম কচি,

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাকাব্যে কিছু নাম কেবল ব্যক্তিসত্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে অবিনাশী অধ্যায়। সেই নামগুলোর অন্যতম—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁকে ঘিরে এ দেশের মানুষের আবেগ, গভীর শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক বয়ানের যেমন শেষ নেই, তেমনি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের বহু ভাঙা-গড়ার গল্প। তবে একটি সত্য অনস্বীকার্য—চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর জীবনের স্পন্দন জড়িয়ে ছিল নিবিড়ভাবে। একাত্তরের কালবেলায় এই চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর ঐতিহাসিক পথচলা, যার রেশ আজো ছড়িয়ে আছে এই বন্দরনগরী ও তার প্রান্তিক জনপদে। ১৯৮১ সালের এক ঝোড়ো রাতে তাঁর আকস্মিক শাহাদাতবরণ এবং পরবর্তী সময়ে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ঘেরা নির্জনতায় তাঁর প্রথম শয়ান—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম যেন শহীদ জিয়ার এক জীবন্ত ‘স্মৃতি-ভূগোল’।

ইতিহাস, জনশ্রুতি এবং বাস্তবতার আলো-ছায়ায় গড়ে ওঠা এই ‘ঐতিহাসিক রোডম্যাপ’ কোনো সাধারণ পথনির্দেশ নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক চেতনার ধারাবাহিকতা।

বিপ্লব উদ্যান: প্রথম প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ
চট্টগ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া ২ নম্বর গেট এলাকাটি কেবল একটি ব্যস্ত মোড় নয়, এটি এক অবিনাশী দ্রোহের প্রতীক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের সেই উত্তাল প্রহরে, এই অঞ্চলের আশপাশেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও নির্দেশ অমান্য করে বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। তাঁর এই ক্ষাত্রতেজ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে এক নতুন গতি দিয়েছিল।
পরবর্তীতে এই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এখানে মাথা তুলে দাঁড়ায় ‘বিপ্লব উদ্যান’। জনমানসে এই উদ্যান প্রথম প্রতিরোধের পবিত্র স্মারক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক পালাবদলের জাঁতাকলে পড়ে এই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির ওপর বারবার নেমে এসেছে অবহেলার খড়গ। আওয়ামী লীগ সরকার যতবারই ক্ষমতায় এসেছে, এই বিপ্লব উদ্যানের অবয়ব ও তাৎপর্যকে ম্লান করার এক প্রচ্ছন্ন, বৈষম্যমূলক চেষ্টা চালিয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে একটি অবিসংবাদিত নাম মুছে ফেলার এই রাজনৈতিক চেষ্টা বারবার ব্যথিত করেছে মুক্তিকামী মানুষকে।

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও ‘মিনি বাংলাদেশ’
চট্টগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে স্পন্দিত অধ্যায়টি মিশে আছে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কালুরঘাট এলাকায়। ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ দিনগুলোতে এই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর। এখান থেকেই ধ্বনিত হয়েছিল মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা। কালুরঘাট তাই কোনো সাধারণ ভৌগোলিক বিন্দু নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক মানসিক প্রতীক।

এই ঐতিহাসিক স্মৃতির কোল ঘেঁষেই ২০০৬ সালে প্রায় ১৬.৩৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা থেকে শুরু করে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মতো দেশের কালজয়ী স্থাপত্যগুলোর অবিকল প্রতিরূপ (মডেল) নিয়ে এটি যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। এর মূল আকর্ষণ ৭১ মিটার উঁচু ‘স্বাধীনতা টাওয়ার’, যার ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ থেকে কর্ণফুলীর রূপালী জলধারা ও চট্টগ্রামের রূপচ্ছায়া দেখা যায়। অথচ, এক সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই অনন্য স্থাপনা থেকেও ‘শহীদ জিয়া’র নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সার্কিট হাউস থেকে জাদুঘর: শোকের মহাকাব্য
নগরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস একাধারে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং গভীর ট্র্যাজেডির সাক্ষী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনের একটি কক্ষেই বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের বুলেটের আঘাতে থমকে গিয়েছিল রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার জীবনাবসান। এই রক্তক্ষরণ বাংলাদেশের ইতিহাসকে এক নতুন এবং অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তাঁর জীবন, কর্ম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্মারকগুলোকে পরম মমতায় আগলে রাখতে এই ভবনটিকে রূপান্তর করা হয় ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’-এ। এই ভবনটি একদিকে যেমন গভীর শোকের স্মারক, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এই ভবনটিও বাদ যায় বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের নানা অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃত করার ব্যর্থ চেষ্টা থেকে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত জিয়া জাদুঘর আজ চট্টগ্রাম নয় কেবল পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

আজও অবহেলতি জিয়ার প্রথম সমাধিসৌধ রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগর:
হত্যাকাণ্ডের পর চরম গোপনীয়তায় বিদ্রোহী সেনারা শহীদ জিয়ার মরদেহ নিয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক দুর্গম অঞ্চলে। সেখানেই পাহাড়ি মাটির কোলে নিভৃতে দাফন করা হয়েছিল তাঁকে। যদিও তিন দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় পুনঃসমাহিত করা হয়, তবু রাঙ্গুনিয়ার সেই নির্জন প্রান্তর চিরতরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। যদিও রাঙ্গুনিয়ার সেই জিয়ানগর খ্যাত এলাকাটি এখনও বিএনপি নেতাকর্মীদের আবেগের কেন্দ্র। প্রতিবছর জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী এলেই নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠ সমাধিসৌধটি।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর প্রথম স্মৃতিধন্য সেই সমাধিস্থলের পাশে উদ্বোধন করেন ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’। প্রায় চার একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সটি কেবল পাথর আর ইটের স্মারক নয়, এটি মূলত একটি মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগের কেন্দ্র। এখানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে এতিম ও দুস্থ শিশুরা কম্পিউটার শিক্ষা ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের মতো বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

তবে ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! আজ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এক চরম অবহেলার চাদরে ঢাকা। কমপ্লেক্সের মূল ফটকের বিশালাকার সাইনবোর্ডে কোথাও ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’ নামটি লেখা নেই। সেখানে কেবল শোভা পাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক নাম। ভবনের এক কোণে মাটির সাথে প্রায় লেপ্টে থাকা উদ্বোধনী ফলকটি ছাড়া চেনার উপায় নেই যে এটি এক মহান নেতার প্রথম স্পর্শের স্থান। নাম মুছে ফেলার এই হীনম্মন্যতা নতুন প্রজন্মের কাছে এক ভুল ইতিহাস পরিবেশন করছে। নেতাকর্মীরা এই সৌধকে একটি আধুনিক পূর্ণাঙ্গ কালচারাল কেন্দ্র গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী আর রাজপথে শহীদ জিয়ার যে পদচিহ্ন, তা কোনো সরল বা রৈখিক ইতিহাস নয়। এটি রাজনৈতিক ভাঙা-গড়া, গভীর দেশপ্রেম এবং সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক জীবন্ত উপাখ্যান। স্মৃতির এই আঙিনাগুলো যতই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হোক না কেন, জনমানুষের হৃদয় থেকে একে উপড়ে ফেলা অসম্ভব। চট্টগ্রামের বুকে ছড়িয়ে থাকা শহীদ জিয়ার এই স্মৃতি-ভূগোল অতীতকে ধারণ করে আজো অবিনাশী আলোয় ভবিষ্যতের পথ দেখায়।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বান নাহিদ ইসলামের

বিপ্লব উদ্যান থেকে রাঙ্গুনিয়া: চট্টগ্রামে শহীদ জিয়ার স্মৃতি-ভূগোল ও ইতিহাসের বাঁক

আপডেট সময় : 03:14:43 pm, Wednesday, 12 August 2026

জাহিদুল করিম কচি,

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাকাব্যে কিছু নাম কেবল ব্যক্তিসত্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে অবিনাশী অধ্যায়। সেই নামগুলোর অন্যতম—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁকে ঘিরে এ দেশের মানুষের আবেগ, গভীর শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক বয়ানের যেমন শেষ নেই, তেমনি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের বহু ভাঙা-গড়ার গল্প। তবে একটি সত্য অনস্বীকার্য—চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর জীবনের স্পন্দন জড়িয়ে ছিল নিবিড়ভাবে। একাত্তরের কালবেলায় এই চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর ঐতিহাসিক পথচলা, যার রেশ আজো ছড়িয়ে আছে এই বন্দরনগরী ও তার প্রান্তিক জনপদে। ১৯৮১ সালের এক ঝোড়ো রাতে তাঁর আকস্মিক শাহাদাতবরণ এবং পরবর্তী সময়ে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ঘেরা নির্জনতায় তাঁর প্রথম শয়ান—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম যেন শহীদ জিয়ার এক জীবন্ত ‘স্মৃতি-ভূগোল’।

ইতিহাস, জনশ্রুতি এবং বাস্তবতার আলো-ছায়ায় গড়ে ওঠা এই ‘ঐতিহাসিক রোডম্যাপ’ কোনো সাধারণ পথনির্দেশ নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক চেতনার ধারাবাহিকতা।

বিপ্লব উদ্যান: প্রথম প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ
চট্টগ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া ২ নম্বর গেট এলাকাটি কেবল একটি ব্যস্ত মোড় নয়, এটি এক অবিনাশী দ্রোহের প্রতীক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের সেই উত্তাল প্রহরে, এই অঞ্চলের আশপাশেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও নির্দেশ অমান্য করে বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। তাঁর এই ক্ষাত্রতেজ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে এক নতুন গতি দিয়েছিল।
পরবর্তীতে এই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এখানে মাথা তুলে দাঁড়ায় ‘বিপ্লব উদ্যান’। জনমানসে এই উদ্যান প্রথম প্রতিরোধের পবিত্র স্মারক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক পালাবদলের জাঁতাকলে পড়ে এই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির ওপর বারবার নেমে এসেছে অবহেলার খড়গ। আওয়ামী লীগ সরকার যতবারই ক্ষমতায় এসেছে, এই বিপ্লব উদ্যানের অবয়ব ও তাৎপর্যকে ম্লান করার এক প্রচ্ছন্ন, বৈষম্যমূলক চেষ্টা চালিয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে একটি অবিসংবাদিত নাম মুছে ফেলার এই রাজনৈতিক চেষ্টা বারবার ব্যথিত করেছে মুক্তিকামী মানুষকে।

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও ‘মিনি বাংলাদেশ’
চট্টগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে স্পন্দিত অধ্যায়টি মিশে আছে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কালুরঘাট এলাকায়। ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ দিনগুলোতে এই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর। এখান থেকেই ধ্বনিত হয়েছিল মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা। কালুরঘাট তাই কোনো সাধারণ ভৌগোলিক বিন্দু নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক মানসিক প্রতীক।

এই ঐতিহাসিক স্মৃতির কোল ঘেঁষেই ২০০৬ সালে প্রায় ১৬.৩৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা থেকে শুরু করে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মতো দেশের কালজয়ী স্থাপত্যগুলোর অবিকল প্রতিরূপ (মডেল) নিয়ে এটি যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। এর মূল আকর্ষণ ৭১ মিটার উঁচু ‘স্বাধীনতা টাওয়ার’, যার ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ থেকে কর্ণফুলীর রূপালী জলধারা ও চট্টগ্রামের রূপচ্ছায়া দেখা যায়। অথচ, এক সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই অনন্য স্থাপনা থেকেও ‘শহীদ জিয়া’র নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সার্কিট হাউস থেকে জাদুঘর: শোকের মহাকাব্য
নগরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস একাধারে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং গভীর ট্র্যাজেডির সাক্ষী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনের একটি কক্ষেই বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের বুলেটের আঘাতে থমকে গিয়েছিল রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার জীবনাবসান। এই রক্তক্ষরণ বাংলাদেশের ইতিহাসকে এক নতুন এবং অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তাঁর জীবন, কর্ম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্মারকগুলোকে পরম মমতায় আগলে রাখতে এই ভবনটিকে রূপান্তর করা হয় ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’-এ। এই ভবনটি একদিকে যেমন গভীর শোকের স্মারক, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এই ভবনটিও বাদ যায় বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের নানা অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃত করার ব্যর্থ চেষ্টা থেকে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত জিয়া জাদুঘর আজ চট্টগ্রাম নয় কেবল পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

আজও অবহেলতি জিয়ার প্রথম সমাধিসৌধ রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগর:
হত্যাকাণ্ডের পর চরম গোপনীয়তায় বিদ্রোহী সেনারা শহীদ জিয়ার মরদেহ নিয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক দুর্গম অঞ্চলে। সেখানেই পাহাড়ি মাটির কোলে নিভৃতে দাফন করা হয়েছিল তাঁকে। যদিও তিন দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় পুনঃসমাহিত করা হয়, তবু রাঙ্গুনিয়ার সেই নির্জন প্রান্তর চিরতরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। যদিও রাঙ্গুনিয়ার সেই জিয়ানগর খ্যাত এলাকাটি এখনও বিএনপি নেতাকর্মীদের আবেগের কেন্দ্র। প্রতিবছর জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী এলেই নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠ সমাধিসৌধটি।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর প্রথম স্মৃতিধন্য সেই সমাধিস্থলের পাশে উদ্বোধন করেন ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’। প্রায় চার একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সটি কেবল পাথর আর ইটের স্মারক নয়, এটি মূলত একটি মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগের কেন্দ্র। এখানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে এতিম ও দুস্থ শিশুরা কম্পিউটার শিক্ষা ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের মতো বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

তবে ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! আজ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এক চরম অবহেলার চাদরে ঢাকা। কমপ্লেক্সের মূল ফটকের বিশালাকার সাইনবোর্ডে কোথাও ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’ নামটি লেখা নেই। সেখানে কেবল শোভা পাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক নাম। ভবনের এক কোণে মাটির সাথে প্রায় লেপ্টে থাকা উদ্বোধনী ফলকটি ছাড়া চেনার উপায় নেই যে এটি এক মহান নেতার প্রথম স্পর্শের স্থান। নাম মুছে ফেলার এই হীনম্মন্যতা নতুন প্রজন্মের কাছে এক ভুল ইতিহাস পরিবেশন করছে। নেতাকর্মীরা এই সৌধকে একটি আধুনিক পূর্ণাঙ্গ কালচারাল কেন্দ্র গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী আর রাজপথে শহীদ জিয়ার যে পদচিহ্ন, তা কোনো সরল বা রৈখিক ইতিহাস নয়। এটি রাজনৈতিক ভাঙা-গড়া, গভীর দেশপ্রেম এবং সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক জীবন্ত উপাখ্যান। স্মৃতির এই আঙিনাগুলো যতই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হোক না কেন, জনমানুষের হৃদয় থেকে একে উপড়ে ফেলা অসম্ভব। চট্টগ্রামের বুকে ছড়িয়ে থাকা শহীদ জিয়ার এই স্মৃতি-ভূগোল অতীতকে ধারণ করে আজো অবিনাশী আলোয় ভবিষ্যতের পথ দেখায়।