Dhaka , Wednesday, 4 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক মাদক সেবনের দায়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আলী আহম্মেদকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও বহিষ্কার কুড়িগ্রামে ১১৭০ ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার, একজনের বিরুদ্ধে ২০টি মাদক মামলা ‘এই পৃথিবীর জন্য বড্ড নরম মনের মানুষ আমি’: মেঘনা আলম পাইকগাছায় নাশকতা, জুয়াসহ বিভিন্ন মামলায় আটক- ১৪ বি‌লে‌তের মা‌টি‌তে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম উৎসব ২০২৬’ ও গুণীজন সম্মাননা ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষককে বিদায় সংবর্ধনা:: সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত, পুলিশের গাড়িতে আগুন, ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সিলেট টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে রদবদলের ইঙ্গিত, তিনে নামতে পারেন অধিনায়ক ১৯ বছরেই এমবাপ্পেকে টপকে ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল অস্ত্রের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ‘মিথ্যা’: সংবাদ সম্মেলনে সেলিম উদ্দিন খাগড়াছড়িতে ৫৫তম পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত, ‘গিরিস্বপ্ন ২০২৬’-এর মোড়ক উন্মোচন রূপগঞ্জ পূর্বাচলের ৩০০ ফুটে প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতি \ চালকসহ তিন জন গ্রেফতার সীতাকুণ্ডে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণে সচিবকে ডিসির চিঠি, ২৪ ঘণ্টায় নানা পদক্ষেপ আসামে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার বাঙালি মুসলিম ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের আহ্বান জিএম কাদেরের জয়পুরহাটে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি পাইকগাছা পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা ক্যাম্পেইন, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার আহ্বান একনেক সভায় বিসিসির জন্য ৭০১ কোটি টাকা অনুমোদন : অবহেলিত থেকে গেল দক্ষিণাঞ্চল মধুপুরে সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনের দাবিতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২০ কোটি টাকার সম্ভাব্য অনুদান দিচ্ছে জাইকা, চট্টগ্রামে নির্মিত হবে নতুন স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সাভারে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, আহত ৫০ ফতুল্লায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশের টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ নারায়ণগঞ্জে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক সমাবেশ কালিয়াকৈরে শ্রমিকের আন্দোলন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ১৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন নেত্রকোনার পূর্বধলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কাউখালীতে নবাগত জেলা প্রশাসকের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যা থেকে রিপন নিখোঁজ, জঙ্গল সলিমপুরে থামছে না আতঙ্ক, ইয়াসিন ফারুককে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ প্রশাসন

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 12:10:45 pm, Tuesday, 12 May 2026
  • 119 বার পড়া হয়েছে

ইসমাইল ইমন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি,

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু একটি পাহাড়ঘেরা জনপদের নাম নয়, এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ভয়, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, নিখোঁজ, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের এক ভয়ঙ্কর প্রতীকে। বহু বছর ধরে পাহাড় কেটে, সরকারি খাসজমি দখল করে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক জটিল ক্ষমতার বলয়। স্থানীয়দের ভাষায়, “জঙ্গল সলিমপুরে অনেক সময় রাষ্ট্রের আইন থেকেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল কিছু গোষ্ঠীর অলিখিত নির্দেশ।” আর সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম মোহাম্মদ ইয়াছিন।

স্থানীয়দের অনেকে তাকে “আলীনগরের রাজা” বলে অভিহিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর ধরে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক পাহাড় কাটা, জমি দখল, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, সালিশি নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী আধিপত্যের মাধ্যমে পুরো এলাকাকে এক ধরনের সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে যান। যৌথবাহিনীর বড় অভিযান, র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড, প্রশাসনিক ক্যাম্প স্থাপন এবং ধারাবাহিক অভিযানের পরও প্রধান অভিযুক্ত ইয়াছিনের গ্রেপ্তার না হওয়া এখনো জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। প্রশাসন বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, “দৃশ্যমান অভিযান হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য ভয় এখনো যায়নি।”

এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নিখোঁজ যুবক মোহাম্মদ রিপনের ঘটনা। সময় যত যাচ্ছে, রিপনকে ঘিরে রহস্য ততই ঘনীভূত হচ্ছে। তিনি জীবিত আছেন নাকি অজানা কোনো নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ফলে পুরো এলাকা এখন আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তায় ভারী হয়ে উঠেছে।
আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহার, স্থানীয় সূত্র, এলাকাবাসীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট ২০২৫ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মামলার প্রধান আসামি ইয়াছিন, যাকে এজাহারে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাদীর বাসায় এসে প্রকাশ্যে মোহাম্মদ রিপনকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর থেকেই রিপনের জীবনে নেমে আসে চরম ভয় এবং অনিশ্চয়তা। প্রাণভয়ে তিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যান বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু গত ৩ অক্টোবর ২০২৫ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে ব্যবসার বকেয়া পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করেন রিপন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল তাকে ঘিরে ফেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়, পরে জোরপূর্বক অজ্ঞাত স্থানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দিনের আলোতে বহু মানুষের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও অভিযুক্তদের দীর্ঘদিনের দাপট, ভয়ভীতি এবং প্রভাবের কারণে কেউ সামনে এগিয়ে আসতে সাহস করেনি।

চট্টগ্রামের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা মামলায় ইয়াছিন, মো. ফারুক, হাছান, মোরশেদ, নুর হোসেন, কালা ফারুক, ক্যাডার ইয়াছিনসহ আরও ২০ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭, ৩৪১, ৩৬৪ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য।

বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ইয়াছিনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল, পাহাড় কাটা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। স্থানীয়দের মতে, “এখানে কোনো বিরোধ মানে শুধু বিরোধ না, এখানে বিরোধ মানেই হামলা, গুম, অপহরণ অথবা রক্তপাতের আশঙ্কা।”

বাদী সুলতানা বেগম আদালতে উল্লেখ করেন, তার স্বামী মোহাম্মদ রিপন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ইট, বালি, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরিবারের দাবি, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বের কারণেই রিপন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের টার্গেটে পরিণত হন।

নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো তথ্য পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সীতাকুণ্ড থানায় অভিযোগ করতে গেলে সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে সাধারণ ডায়েরি হিসেবে রুজু করা হয়। পরে দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ৮ অক্টোবর আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রিপনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল আসে। বাদীপক্ষের দাবি, ফোন রিসিভ করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নিজেদের ইয়াছিন বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে জানায়, রিপন তাদের কাছে আটক রয়েছে। তাকে জীবিত ফেরত পেতে হলে মুক্তিপণ দিতে হবে বলেও জানানো হয়। কখনো এক লাখ টাকা নিয়ে দেখা করতে বলা হয়, কখনো বলা হয় রিপনকে মারধর করা হচ্ছে, আবার এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের দাবি, এসব কল রেকর্ড এখনো সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। স্থানীয়দের মতে, যদি দ্রুত প্রযুক্তিগত তদন্ত, কল ট্র্যাকিং, লোকেশন বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম জোরদার করা হতো, তাহলে তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসতে পারত।

রিপনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনও এই ঘটনায় ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার ওপরই পুরো সংসারের দায়িত্ব ছিল। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারটি এখন মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সন্তানরা প্রতিদিন বাবার ফেরার অপেক্ষা করছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষায়, “আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, আমরা নিরাপত্তা হারিয়েছি, স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছি, ভবিষ্যতের ভরসা হারিয়েছি।”
স্থানীয়দের অনেকে অতীতের ভয়াবহ ঘটনাগুলোর কথাও স্মরণ করছেন। বিশেষ করে শাহাদাত হোসেন ছোটন হত্যাকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পর তার কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো মানুষের মনে দগদগে। ফলে রিপনের ঘটনাও একই ধরনের কোনো মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের দিকে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই এই এলাকার বর্তমান রূপান্তর শুরু হয়। কাজের সন্ধানে আসা ছিন্নমূল মানুষ, নিম্নআয়ের পরিবার এবং আশ্রয়হীন অনেক মানুষ এখানে বসতি গড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে প্লট তৈরি হয়, শুরু হয় অবৈধ জমি বাণিজ্য। কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের জোরে জমি বিক্রি হতে থাকে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৩১০০ একর সরকারি খাসজমির ওপর গড়ে ওঠা এই বিশাল বসতি পরে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পাহাড় কাটা, মাটি বিক্রি, প্লট বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, ঘর নির্মাণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, মাসিক চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিপুল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।

এই নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে উঠে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও পরে পাহাড় কাটা, মাটি সরবরাহ, জমি বেচাকেনা, দখল রাজনীতি, সালিশি ক্ষমতা এবং সন্ত্রাসী আধিপত্যের মাধ্যমে আলীনগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীনগরে ইয়াছিনের অনুমতি ছাড়া কেউ জমি কিনতে পারত না, ঘর তুলতে পারত না, এমনকি নতুন করে বসবাসও করতে পারত না। কে এলাকায় ঢুকবে, কে বের হবে, সেটিও নিয়ন্ত্রিত হতো। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, “আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড” নামের একটি কাঠামোর মাধ্যমে পুরো নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হতো। কাগজে কলমে এটি সমবায় হলেও বাস্তবে এটি ছিল নিয়ন্ত্রণের সাংগঠনিক মুখোশ।
স্থানীয়দের আরও দাবি, একসময় এলাকায় একটি বড় লোহার গেট ছিল। গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে অনুমতি লাগত। বহিরাগতদের প্রবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত।

যৌথবাহিনীর অভিযানে সেই গেট ভেঙে ফেলা হলেও স্থানীয়দের ভাষায়, “গেট ভেঙেছে, কিন্তু ভয় ভাঙেনি।”
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের ওপর হামলার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। অভিযানে গেলে র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করা হয় এবং নিহত হন র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এরপর সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য নিয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, অনেকে আটক হয়েছে, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় প্রশাসনের দুটি ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, “অভিযান মানেই নিয়ন্ত্রণ না।” তাদের আশঙ্কা, বাহিনীর উপস্থিতি কমে গেলে পুরোনো কাঠামো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ স্থানীয়দের মতে, “ভয় শুধু বন্দুকে না, ভয় মানুষের মনে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইয়াছিনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ২২টিরও বেশি মামলা রয়েছে। তবে এখনো তার গ্রেপ্তার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরছে। স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, ইয়াছিন শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি পুরো নেটওয়ার্কের প্রতীক। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা মানে পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলা।

এদিকে সরকার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি পৃথক পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একটি একাডেমি এলিট ফোর্সের জন্য এবং অন্যটি সাধারণ পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার, ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন পুলিশ সেবা আরও সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, আগে প্রয়োজন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের ভাষায়, “মানুষ যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়ন দিয়েও ভয় দূর হবে না।”

বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার রয়েছে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের কর্মকর্তা এসআই আমিনুল ইসলামের ওপর। তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কেউ কেউ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পরিবার, এলাকাবাসী এবং সচেতন নাগরিকদের একটাই দাবি, রিপনের সন্ধান চাই, সত্য উদঘাটন চাই, জড়িতদের গ্রেপ্তার চাই, নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী নিরাপত্তা চাই।

স্থানীয়দের মতে, রিপনের ঘটনা শুধু একটি নিখোঁজের ঘটনা নয়, এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকেত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, ভূমিদস্যু, দখলদার চক্র এবং অদৃশ্য ক্ষমতার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলে কীভাবে একটি পুরো জনপদ ধীরে ধীরে ভয়ের নগরীতে পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রতিবাদ করতে ভুলে যায়, আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায়, আর অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

বর্তমানে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রশাসনের দুটি ক্যাম্প থাকলেও আরও দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, “রাত নামলেই পাহাড়ি জঙ্গল এলাকাগুলোতে আবারও নড়াচড়া শুরু হয়। দিনে অনেকে আত্মগোপনে থাকে, রাতে সক্রিয় হয়।” স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু সন্ত্রাসী এখনো পাহাড়ি জঙ্গল ও গোপন আস্তানায় অবস্থান করছে।

স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, “যদি দ্রুত ইয়াছিন ও ফারুকসহ মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।”

আজ জঙ্গল সলিমপুরের মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন, “রিপন কোথায়?” তিনি কি এখনো জীবিত, নাকি অন্ধকার কোনো নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছেন। এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আতঙ্ক কাটবে না, রহস্যের জটও খুলবে না। আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরের আকাশে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া আরও ভারী হয়ে ঝুলে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক

র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যা থেকে রিপন নিখোঁজ, জঙ্গল সলিমপুরে থামছে না আতঙ্ক, ইয়াসিন ফারুককে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ প্রশাসন

আপডেট সময় : 12:10:45 pm, Tuesday, 12 May 2026

ইসমাইল ইমন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি,

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু একটি পাহাড়ঘেরা জনপদের নাম নয়, এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ভয়, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, নিখোঁজ, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের এক ভয়ঙ্কর প্রতীকে। বহু বছর ধরে পাহাড় কেটে, সরকারি খাসজমি দখল করে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক জটিল ক্ষমতার বলয়। স্থানীয়দের ভাষায়, “জঙ্গল সলিমপুরে অনেক সময় রাষ্ট্রের আইন থেকেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল কিছু গোষ্ঠীর অলিখিত নির্দেশ।” আর সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম মোহাম্মদ ইয়াছিন।

স্থানীয়দের অনেকে তাকে “আলীনগরের রাজা” বলে অভিহিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর ধরে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক পাহাড় কাটা, জমি দখল, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, সালিশি নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী আধিপত্যের মাধ্যমে পুরো এলাকাকে এক ধরনের সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে যান। যৌথবাহিনীর বড় অভিযান, র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড, প্রশাসনিক ক্যাম্প স্থাপন এবং ধারাবাহিক অভিযানের পরও প্রধান অভিযুক্ত ইয়াছিনের গ্রেপ্তার না হওয়া এখনো জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। প্রশাসন বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, “দৃশ্যমান অভিযান হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য ভয় এখনো যায়নি।”

এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নিখোঁজ যুবক মোহাম্মদ রিপনের ঘটনা। সময় যত যাচ্ছে, রিপনকে ঘিরে রহস্য ততই ঘনীভূত হচ্ছে। তিনি জীবিত আছেন নাকি অজানা কোনো নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ফলে পুরো এলাকা এখন আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তায় ভারী হয়ে উঠেছে।
আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহার, স্থানীয় সূত্র, এলাকাবাসীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট ২০২৫ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মামলার প্রধান আসামি ইয়াছিন, যাকে এজাহারে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাদীর বাসায় এসে প্রকাশ্যে মোহাম্মদ রিপনকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর থেকেই রিপনের জীবনে নেমে আসে চরম ভয় এবং অনিশ্চয়তা। প্রাণভয়ে তিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যান বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু গত ৩ অক্টোবর ২০২৫ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে ব্যবসার বকেয়া পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করেন রিপন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল তাকে ঘিরে ফেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়, পরে জোরপূর্বক অজ্ঞাত স্থানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দিনের আলোতে বহু মানুষের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও অভিযুক্তদের দীর্ঘদিনের দাপট, ভয়ভীতি এবং প্রভাবের কারণে কেউ সামনে এগিয়ে আসতে সাহস করেনি।

চট্টগ্রামের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা মামলায় ইয়াছিন, মো. ফারুক, হাছান, মোরশেদ, নুর হোসেন, কালা ফারুক, ক্যাডার ইয়াছিনসহ আরও ২০ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭, ৩৪১, ৩৬৪ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য।

বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ইয়াছিনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল, পাহাড় কাটা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। স্থানীয়দের মতে, “এখানে কোনো বিরোধ মানে শুধু বিরোধ না, এখানে বিরোধ মানেই হামলা, গুম, অপহরণ অথবা রক্তপাতের আশঙ্কা।”

বাদী সুলতানা বেগম আদালতে উল্লেখ করেন, তার স্বামী মোহাম্মদ রিপন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ইট, বালি, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরিবারের দাবি, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বের কারণেই রিপন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের টার্গেটে পরিণত হন।

নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো তথ্য পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সীতাকুণ্ড থানায় অভিযোগ করতে গেলে সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে সাধারণ ডায়েরি হিসেবে রুজু করা হয়। পরে দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ৮ অক্টোবর আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রিপনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল আসে। বাদীপক্ষের দাবি, ফোন রিসিভ করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নিজেদের ইয়াছিন বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে জানায়, রিপন তাদের কাছে আটক রয়েছে। তাকে জীবিত ফেরত পেতে হলে মুক্তিপণ দিতে হবে বলেও জানানো হয়। কখনো এক লাখ টাকা নিয়ে দেখা করতে বলা হয়, কখনো বলা হয় রিপনকে মারধর করা হচ্ছে, আবার এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের দাবি, এসব কল রেকর্ড এখনো সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। স্থানীয়দের মতে, যদি দ্রুত প্রযুক্তিগত তদন্ত, কল ট্র্যাকিং, লোকেশন বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম জোরদার করা হতো, তাহলে তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসতে পারত।

রিপনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনও এই ঘটনায় ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার ওপরই পুরো সংসারের দায়িত্ব ছিল। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারটি এখন মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সন্তানরা প্রতিদিন বাবার ফেরার অপেক্ষা করছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষায়, “আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, আমরা নিরাপত্তা হারিয়েছি, স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছি, ভবিষ্যতের ভরসা হারিয়েছি।”
স্থানীয়দের অনেকে অতীতের ভয়াবহ ঘটনাগুলোর কথাও স্মরণ করছেন। বিশেষ করে শাহাদাত হোসেন ছোটন হত্যাকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পর তার কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো মানুষের মনে দগদগে। ফলে রিপনের ঘটনাও একই ধরনের কোনো মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের দিকে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই এই এলাকার বর্তমান রূপান্তর শুরু হয়। কাজের সন্ধানে আসা ছিন্নমূল মানুষ, নিম্নআয়ের পরিবার এবং আশ্রয়হীন অনেক মানুষ এখানে বসতি গড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে প্লট তৈরি হয়, শুরু হয় অবৈধ জমি বাণিজ্য। কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের জোরে জমি বিক্রি হতে থাকে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৩১০০ একর সরকারি খাসজমির ওপর গড়ে ওঠা এই বিশাল বসতি পরে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পাহাড় কাটা, মাটি বিক্রি, প্লট বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, ঘর নির্মাণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, মাসিক চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিপুল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।

এই নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে উঠে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও পরে পাহাড় কাটা, মাটি সরবরাহ, জমি বেচাকেনা, দখল রাজনীতি, সালিশি ক্ষমতা এবং সন্ত্রাসী আধিপত্যের মাধ্যমে আলীনগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীনগরে ইয়াছিনের অনুমতি ছাড়া কেউ জমি কিনতে পারত না, ঘর তুলতে পারত না, এমনকি নতুন করে বসবাসও করতে পারত না। কে এলাকায় ঢুকবে, কে বের হবে, সেটিও নিয়ন্ত্রিত হতো। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, “আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড” নামের একটি কাঠামোর মাধ্যমে পুরো নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হতো। কাগজে কলমে এটি সমবায় হলেও বাস্তবে এটি ছিল নিয়ন্ত্রণের সাংগঠনিক মুখোশ।
স্থানীয়দের আরও দাবি, একসময় এলাকায় একটি বড় লোহার গেট ছিল। গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে অনুমতি লাগত। বহিরাগতদের প্রবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত।

যৌথবাহিনীর অভিযানে সেই গেট ভেঙে ফেলা হলেও স্থানীয়দের ভাষায়, “গেট ভেঙেছে, কিন্তু ভয় ভাঙেনি।”
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের ওপর হামলার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। অভিযানে গেলে র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করা হয় এবং নিহত হন র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এরপর সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য নিয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, অনেকে আটক হয়েছে, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় প্রশাসনের দুটি ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, “অভিযান মানেই নিয়ন্ত্রণ না।” তাদের আশঙ্কা, বাহিনীর উপস্থিতি কমে গেলে পুরোনো কাঠামো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ স্থানীয়দের মতে, “ভয় শুধু বন্দুকে না, ভয় মানুষের মনে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইয়াছিনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ২২টিরও বেশি মামলা রয়েছে। তবে এখনো তার গ্রেপ্তার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরছে। স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, ইয়াছিন শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি পুরো নেটওয়ার্কের প্রতীক। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা মানে পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলা।

এদিকে সরকার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি পৃথক পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একটি একাডেমি এলিট ফোর্সের জন্য এবং অন্যটি সাধারণ পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার, ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন পুলিশ সেবা আরও সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, আগে প্রয়োজন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের ভাষায়, “মানুষ যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়ন দিয়েও ভয় দূর হবে না।”

বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার রয়েছে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের কর্মকর্তা এসআই আমিনুল ইসলামের ওপর। তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কেউ কেউ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পরিবার, এলাকাবাসী এবং সচেতন নাগরিকদের একটাই দাবি, রিপনের সন্ধান চাই, সত্য উদঘাটন চাই, জড়িতদের গ্রেপ্তার চাই, নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী নিরাপত্তা চাই।

স্থানীয়দের মতে, রিপনের ঘটনা শুধু একটি নিখোঁজের ঘটনা নয়, এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকেত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, ভূমিদস্যু, দখলদার চক্র এবং অদৃশ্য ক্ষমতার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলে কীভাবে একটি পুরো জনপদ ধীরে ধীরে ভয়ের নগরীতে পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রতিবাদ করতে ভুলে যায়, আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায়, আর অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

বর্তমানে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রশাসনের দুটি ক্যাম্প থাকলেও আরও দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, “রাত নামলেই পাহাড়ি জঙ্গল এলাকাগুলোতে আবারও নড়াচড়া শুরু হয়। দিনে অনেকে আত্মগোপনে থাকে, রাতে সক্রিয় হয়।” স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু সন্ত্রাসী এখনো পাহাড়ি জঙ্গল ও গোপন আস্তানায় অবস্থান করছে।

স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, “যদি দ্রুত ইয়াছিন ও ফারুকসহ মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।”

আজ জঙ্গল সলিমপুরের মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন, “রিপন কোথায়?” তিনি কি এখনো জীবিত, নাকি অন্ধকার কোনো নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছেন। এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আতঙ্ক কাটবে না, রহস্যের জটও খুলবে না। আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরের আকাশে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া আরও ভারী হয়ে ঝুলে থাকবে।