
মো: আব্দুর রহিম, শরীয়তপুর প্রতিনিধি,
অনুমতি ছাড়া জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না, সরকারের এমন নির্দেশ অমান্য করে ভেদরগঞ্জে তিন ফসলি কৃষিজমিতে পুকুর কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি। একশ্রেণির অসাধু মানুষ কৃষকদের হুমকি দিয়ে কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে এমন অপরাধ করলেও তা বন্ধে প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছে না। এদিকে কৃষি জমিকে ‘ডোবা’ দেখিয়ে পুকুর খননের আবেদন করা হলেও প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চলছে খনন কার্যক্রম। এতে আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলা সখিপুর ডিএমখালি ইউনিয়নের মৃধা কান্দি ৫১ নং দিগরমহিষখালী মৌজায় ১.৭৫ একর কৃষি জমিতে পুকুর খননের জন্য ভেদরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন বরাবর লিখিত আবেদন করেন কাদের গাজী নামে একজন।আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন জমিটি আগে থেকেই পুকুর খনন করা রয়েছে। পাশাপাশি পুকুরটি নতুন করে সংস্কারের প্রয়োজন। আবেদনের সঙ্গে পুরাতন পুকুরের কয়েকটি ছবি যুক্ত করে দেন তিনি। এরপর আবেদনটি আমলে নিয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। গত ২৬ এপ্রিল ঘটনাস্থলে তদন্তে যায় সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসের অফিস সহকারী তোফাজ্জল হোসেন। সেখানে প্রকৃতপক্ষে কৃষি জমি হলেও তোফাজ্জল হোসেন ঘের মালিকের সাথে আঁতাত করে সেখানে পুরাতন পুকুর আছে এ-ই মর্মে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কর্মকর্তাকে জানান। পরে ২৯ এপ্রিল উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কে.এম রাফসান রাব্বির সাক্ষরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। তবে নথি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পাঠানোর আগেই সেটি পাঠানো হয় পুকুর মালিক কাদের গাজীর কাছে। নথিটি উপজেলা প্রশাসনের কাছে যাওয়ার পরে সেটিকে যাচাই-বাছাই করে পুকুর খনন করার অনুমতি দেওয়ার কথা ছিলো। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পেলেও ভেকু মেশিন দিয়ে দিন-রাত পুকুর খননের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কাদের গাজী। তদন্ত প্রতিবেদনর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে যাওয়া আগে কি ভাবে আবেদনকারীর হাতে গেলো এনিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।এদিকে রবিবার সরেজমিনে দেখা যায়, কাদের গাজী যেই জমিতে পুকুর খননের আবেদন করেছেন সেখানে গত দশদিন ধরে দুটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে পুকুর খননের কাজ শুরু হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদনে যেটিকে তিনি পুরাতন পুকুর দাবি করেছেন সেখানে পুরাতন কোনো পুকুর নেই। জমির মাঝখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে একটি ডোবা তৈরি করে পুকুর বলে কৃষি জমি কাটার চেষ্টা করছেন। সেখানে গিয়ে আরও দেখা যায় জমির মাঝখানে এখনো মরিচ, ধান সহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে। এছাড়াও যেখানে পুকুর খনন করা হচ্ছে এর চারপাশে কৃষকের বিভিন্ন ধরনের ফসল রয়েছে। এভাবে পুকুর খনন করার কারণে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে কৃষি খাতে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “আমরা ফসল ফলাইয়া সংসার চালাই। এখন একের পর এক জমি কাইটা পুকুর বানাইতেছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষি জমি আর থাকবো না। পাশের জমিটা আমার তাদের কারণে আমার জমির ফসল উতপাদনে সমস্যা হবে। তাছাড়া এখানে সারাবছর পানি জমে থাকলে আমাদের চাষাবাদ করতেও বেকায়দায় পড়তে হবে।
আরেক কৃষক নুর ইসলাম বলেন, এই বিলে এখনো এধরনের খামার করা হয় নি। আমাদের এখানে সারাবছর তিন ফসল উতপাদন হয়। দশদিন আগে দেখলাম কাদের গাজী দুটি ভেকু মেশিন এনে পুকুর খনন করছে। তাকে জিগ্যেস করছিলাম অনুমতি কি ভাবে নিলো। তিনি বললো এ-ই দেশে এসবই সম্ভব। এভাবে কৃষি জমিতে পুকুর খনন করা যায় এটা আমার আগে জানা ছিলো না। প্রশাসন কি ভাবেই অনুমতি দিলো এটা আমার প্রশ্ন। যদি প্রশাসন অনুমতি না দিয়ে থাকো তাহলে এটি খনন করে কি ভাবে। এখানে আগে ডোবা অথবা পুকুর ছিলো কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখানে কখনোই ডোবা ছিলো না কিছুদিন আগে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে কিছুটা গর্ত তৈরি হয়েছে। তাছাড়া পানি আটকে রাখার জন্য চারদিকে আইল তৈরি করে পানি আটকে রাখা হয়। অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে ভেকু দিয়ে মাটি কাটতেছে। কিন্তু কেউ কিছু কইতেছে না। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
এবিষয়ে জানতে চাইলে ঘের মালিক কাদের গাজী বলেন, এখানে ভিডিও করার কিছু নেই উপজেলা প্রশাসন থেকে পুকুর খননের অনুমতি নেওয়া আছে। উপজেলা থেকে তোফাজ্জল ভাই এসেছিলো তিনি তদন্ত করে আমাকে অনুমতি দিয়ে গেছে। তবে অনুমতি পত্র দেখতে চাইলে তিনি সেটি দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এবিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজুল হক বলেন, কিছুদিন আগে আমাদের কাছে পরিত্যক্ত ডোবা উল্লেখ করে সেখানে পুকুর খননের আবেদন করা হয়। বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার ভূমি কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। এখনো আমি তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাইনি। রিপোর্ট হাতে পেলে পুকুর খননের ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া হবে। অনুমতি না নিয়ে সেখানে পুকুর খনন করা যাবে না। আমি বিষয়টি তদন্ত করে দেখি যদি অনুমতি নেওয়ার আগে সেখানে পুকুর খনন করে তাহলে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
























