
মাকসুদুল হোসেন তুষার,
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বস্ত্র ও পোশাক খাতসহ টেক্সটাইল শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে করে লোকসানের মুখে রয়েছেন শিল্প মালিকরা। বন্ধের পথে অনেক কলকারখানা। হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা । অনেক স্থানে তাঁতিরা বেকার হয়ে পড়ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলাটি একটি শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি কল কারখানা রয়েছে। এসব কল কারখানায় সুতা থেকে কাপড় তৈরি হয়ে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কার্যক্রম চলে। আর এসব খাতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকাসহ নানা কারণে বিশ্ববাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। আর এই কারণেই বাংলাদেশে সুতার দাম বেড়ে শিল্পখাতে প্রভাব পড়েছে। বেশি দামে সুতা ক্রয় গিয়ে লোকসানের মুখে রয়েছেন এখানকার শিল্প কলকারখানার মালিকরা। অনেকেই শিল্প কলকারখানার অর্ধেক অংশ বন্ধ করে দিয়েছেন। শ্রমিক কর্মচারীদের চিন্তা করে লোকসান গুনেই অনেকে কারখানা চালাচ্ছেন।
শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সুতার দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে, যা দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে বড় সংকট তৈরি করেছে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে । মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ বাড়া এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এই ঊর্ধ্বগতি । পরিবহন ও জ্বালানি খরচ: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্থিরতার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। সুতার দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম সেভাবে না বাড়ায় তাঁতশিল্প ও ছোট কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শ্রমিকরা জানান, তারা বর্তমানে অতি কষ্টের জীবন যাপন করছেন। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১২ ঘন্টায় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে করে উৎপাদন অর্ধেক অংশে চলে এসেছে। ফলে শ্রমিকরা মজুরিও পাচ্ছেন কম। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শিল্পখাত অচল হয়ে পড়বে বেকার হবে শ্রমিকরা।
কাঞ্চন এলাকার রুপা টেক্সটাইল মিলসের মালিক মোঃ খলিল শিকদার জানান, স্থানীয় তাঁতিদের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁতীরা আমাদের টেক্সটাইল নিলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সারা বছরই মিলটি চালিয়ে রাখতে হয়। শীতের সিজনে টেক্সটাইলে তৈরি চাদর বিক্রি করে থাকি। এবার যে হারে সুতার দাম বেড়েছে উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ অনেক বেড়েছে। ওই হিসেবে চাদরের দাম হয়তো আমরা কম পাব। তারপরেও তাঁতিদের চিন্তা মাথায় রেখে টেক্সটাইল চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারের কাছে সুতার দাম কমানোর দাবি জানান তিনি।
তারাবো এলাকার টেক্সটাইল ব্যবসায়ী শরীফ আহমেদ লিটন বলেন, মধ্যপ্রাচর যুদ্ধের প্রভাব আমাদের টেক্সটাইল শিল্পসহ সকল কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পড়েছে। আমাদেরকে এখন লোকসান দিয়ে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা করে এবং এই টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সুতার দাম কমিয়ে আনতে হবে এবং বাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।
গাউছিয়া মার্কেটের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী কবির হোসেন বলেন, বর্তমানে শাড়ি কাপড়সহ অন্যান্য কাপড়ের কিছুটা দাম বাড়াচ্ছেন প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই হিসেবে ক্রেতারা দাম বাড়িয়ে ক্রয় করছেন না। পূর্বের দামে বিক্রি করাই বর্তমানে কষ্ট হয়ে পড়ছে। এতে বুঝা যায় সুতার প্রভাব কাপড়ের বাজারে পড়েছে। এ বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
গ্রে কাপড় ব্যবসায়ী মাহমুদুল্লাহ বলেন, সুতার দাম বৃদ্ধি হওয়ায় হঠাৎ করে কাপড়ের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় কাপড় ক্রয় করতে তারা সাহস পাচ্ছেন না। কারণ বেশি দিয়ে ক্রয় করে বেশি দামে বিক্রি করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। তাই বাজার দর স্বাভাবিক রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি তেল স্বল্পতাসহ নানা কারণে জিনিসপত্রের দাম অনেকটা বেড়েছে। তার মধ্যে আমাদের দেশে সুতার উপর প্রভাব পড়েছে। আর এই প্রভাবকে কম্প্রোমাইজ করতে হবে। তবে যেহেতু রূপগঞ্জ থেকে শিল্প এলাকা। সুতার দাম বৃদ্ধিতে এই শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রভাব পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।
























