Dhaka , Thursday, 5 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক মাদক সেবনের দায়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আলী আহম্মেদকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও বহিষ্কার কুড়িগ্রামে ১১৭০ ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার, একজনের বিরুদ্ধে ২০টি মাদক মামলা ‘এই পৃথিবীর জন্য বড্ড নরম মনের মানুষ আমি’: মেঘনা আলম পাইকগাছায় নাশকতা, জুয়াসহ বিভিন্ন মামলায় আটক- ১৪ বি‌লে‌তের মা‌টি‌তে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম উৎসব ২০২৬’ ও গুণীজন সম্মাননা ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষককে বিদায় সংবর্ধনা:: সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত, পুলিশের গাড়িতে আগুন, ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সিলেট টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে রদবদলের ইঙ্গিত, তিনে নামতে পারেন অধিনায়ক ১৯ বছরেই এমবাপ্পেকে টপকে ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল অস্ত্রের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ‘মিথ্যা’: সংবাদ সম্মেলনে সেলিম উদ্দিন খাগড়াছড়িতে ৫৫তম পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত, ‘গিরিস্বপ্ন ২০২৬’-এর মোড়ক উন্মোচন রূপগঞ্জ পূর্বাচলের ৩০০ ফুটে প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতি \ চালকসহ তিন জন গ্রেফতার সীতাকুণ্ডে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণে সচিবকে ডিসির চিঠি, ২৪ ঘণ্টায় নানা পদক্ষেপ আসামে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার বাঙালি মুসলিম ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের আহ্বান জিএম কাদেরের জয়পুরহাটে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি পাইকগাছা পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা ক্যাম্পেইন, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার আহ্বান একনেক সভায় বিসিসির জন্য ৭০১ কোটি টাকা অনুমোদন : অবহেলিত থেকে গেল দক্ষিণাঞ্চল মধুপুরে সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনের দাবিতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২০ কোটি টাকার সম্ভাব্য অনুদান দিচ্ছে জাইকা, চট্টগ্রামে নির্মিত হবে নতুন স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সাভারে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, আহত ৫০ ফতুল্লায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশের টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ নারায়ণগঞ্জে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক সমাবেশ কালিয়াকৈরে শ্রমিকের আন্দোলন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ১৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন নেত্রকোনার পূর্বধলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কাউখালীতে নবাগত জেলা প্রশাসকের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

আতঙ্কের সাম্রাজ্য ফারাজ করিম, মানবিকতার মুখোশে অভিযোগের পাহাড়

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 08:42:47 pm, Thursday, 12 March 2026
  • 142 বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

এমপি বাবার ক্ষমতায় রাউজানে অঘোষিত যুবরাজ,দরবার বিচার টর্চার সেল ও সন্ত্রাসী বাহিনীর অভিযোগ

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বহু মানুষের কাছে এক সময় আতঙ্কের আরেক নাম ছিল ফারাজ করিম চৌধুরী। নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম ৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে হিসেবে বাবার রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে এলাকায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।স্থানীয়দের ভাষ্য, চলন বলন আচরণ ও কর্মকাণ্ডে তিনি যেন নিজেকে এলাকার অঘোষিত যুবরাজ বিচারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রকাশ্যে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা থাকলেও সেই মুখোশের আড়ালে ছিল ভয়ভীতি,প্রভাব এবং শক্তির প্রদর্শন।

রাউজানের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফারাজ করিম প্রায়ই নিজের বাড়ির উঠান কিংবা বিভিন্ন স্থানে দরবার বসিয়ে স্থানীয় বিরোধের বিচার করতেন। কখনও কখনও থানার ভেতরেও তার উপস্থিতিতে এমন বিচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, তিনি নিজেকে প্রায় বিচারকের মতো উপস্থাপন করতেন এবং যে রায় দিতেন তা কার্যকর করতে বাধ্য হতেন সংশ্লিষ্টরা।এসব ঘটনার অনেক ভিডিও তিনি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রচার করতেন। ফলে সামাজিকভাবে অপমানিত হলেও ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। অনেকেই বলেন, সেই সময় তার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই ছিল কঠিন বিপদের ঝুঁকি।

স্থানীয়দের দাবি,ফারাজ করিমের চারপাশে সবসময় অস্ত্রধারী অনুসারীদের একটি দল থাকত। তাদের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। এলাকায় বিরোধ বা সংঘর্ষের ঘটনায় অনেক সময় তিনি নিজেই মধ্যস্থতা করার নামে হস্তক্ষেপ করতেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন।যারা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইতেন না তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাউজানের সুলতানপুরসহ কয়েকটি গ্রামে এখনও এমন অনেক পরিবার রয়েছে যারা ফারাজ করিমের নাম শুনলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নারী জানান, তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে। তারা বলেন, তাদের ছেলে সন্তানদের মারধর করা হয়েছিল এবং অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় কেউ মুখ খুলতে পারেননি। এখনও অনেকেই ক্যামেরার সামনে এসে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না ভয়ে। এই বুঝি ফারাজ এলো।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, বাবার রাজনৈতিক প্রভাব থাকাকালে সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী রাউজানের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সেই প্রভাবের ধারাবাহিকতায় ছেলে ফারাজ করিমও এলাকায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এলাকাবাসীর অনেকেই বলেন,এমপি ছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র, আর ছেলে ফারাজ যেন সামাজিক ও স্থানীয় ক্ষমতার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ ছিল না বললেই চলে।

একটি ঘটনায় মারামারির অভিযোগে পারভেজ ও শহিদুল নামের দুই ব্যক্তিকে গহিরা বাজারে প্রকাশ্যে ঝাড়ু দিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এটি ছিল একটি সামাজিক শাস্তি যা মূলত অপমানজনক এবং ভয়ভীতি তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এই ঘটনার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান কয়েকজন বাসিন্দা।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, ফারাজ করিমের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে অনেক সময় প্রশাসনও তার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারত না। পুলিশের গাড়ি ব্যবহার এবং থানায় বিচার বসানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তৎকালীন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের গাড়ি ব্যবহারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডিউটি অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং তাকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল।তবে স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন,বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, তখনকার রাউজান থানার ওসি কেফায়েত উল্লাহ নাকি ফারাজ করিমের প্রভাবের বাইরে ছিলেন না। তার দাবি, অনেক সময় ফারাজ করিমের নির্দেশেই একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হতো। আবার অনেককে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কথিত টর্চার সেল নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর রাউজানের একটি বাগানবাড়ির পেছনের জঙ্গলে এমন একটি নির্যাতনকেন্দ্র ছিল যেখানে বিরোধে জড়িত বা অবাধ্য লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, গাজী মহসিন ও কবির নামে দুই ব্যক্তির জমি দখল করে সেই স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল,তবে বহু স্থানীয় বাসিন্দা একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয়রা বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এই টর্চার সেলের ভয় দেখানো হতো। কেউ জমি লিখে দিতে অস্বীকার করলে বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে ধরে এনে শাস্তি দেওয়া হতে পারে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল বলে দাবি তাদের।

অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলানোর পর তারা বিচার দাবি করতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, এতদিন ভয়ভীতির কারণে কেউ সামনে আসেননি। এখন তারা চান অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং সত্য উদঘাটন করা হোক।

ফারাজ করিম নিজেকে বিভিন্ন সময় মোটিভেশনাল বক্তা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা হিসেবেও উপস্থাপন করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রমের প্রচারণা চালাতেন। অনেক সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করতেন। এতে করে তার একটি ভিন্ন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, সেই প্রচারণার আড়ালেই ছিল অন্য এক বাস্তবতা।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করে, ফারাজ করিমের চারপাশে যেসব লোকজন নিয়মিত থাকতেন তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল মাদক সেবনকারী এবং অস্ত্রধারী। এসব লোকজনকে ব্যবহার করেই এলাকায় প্রভাব বজায় রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। গত ৫ আগস্টের পর সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। তবে তার ছেলে ফারাজ করিম এখনও আত্মগোপনে আছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। অনেকেই বলেন, তিনি বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার গুলশান এলাকায় অবস্থান করছেন।

রাউজানের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ফারাজ করিমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন এবং সুযোগ পেলে আবার এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে ভয়ভীতি ও প্রভাবের মাধ্যমে এলাকায় একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছিল। সেই সময় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চুপ থেকেছেন।এখন পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেকে অতীতের ঘটনাগুলো সামনে আনতে শুরু করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ফারাজ করিমের কার্যক্রম নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি মানবিক উদ্যোগের নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন যেখানে বিকাশ রকেট ও নগদ নম্বর দেওয়া ছিল। মানুষকে সহায়তার নামে সেখানে অর্থ পাঠানোর আহ্বান জানানো হতো। অনেকেই অভিযোগ করেন, সেই মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাউজানের অনেক বাসিন্দা এখন মনে করেন, অতীতের এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা চান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং কেউ যদি অপরাধ করে থাকে তবে তার যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হোক। স্থানীয়দের ভাষায়, ভয়ভীতির সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে চান তারা।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক

আতঙ্কের সাম্রাজ্য ফারাজ করিম, মানবিকতার মুখোশে অভিযোগের পাহাড়

আপডেট সময় : 08:42:47 pm, Thursday, 12 March 2026

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

এমপি বাবার ক্ষমতায় রাউজানে অঘোষিত যুবরাজ,দরবার বিচার টর্চার সেল ও সন্ত্রাসী বাহিনীর অভিযোগ

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বহু মানুষের কাছে এক সময় আতঙ্কের আরেক নাম ছিল ফারাজ করিম চৌধুরী। নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম ৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে হিসেবে বাবার রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে এলাকায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।স্থানীয়দের ভাষ্য, চলন বলন আচরণ ও কর্মকাণ্ডে তিনি যেন নিজেকে এলাকার অঘোষিত যুবরাজ বিচারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রকাশ্যে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা থাকলেও সেই মুখোশের আড়ালে ছিল ভয়ভীতি,প্রভাব এবং শক্তির প্রদর্শন।

রাউজানের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফারাজ করিম প্রায়ই নিজের বাড়ির উঠান কিংবা বিভিন্ন স্থানে দরবার বসিয়ে স্থানীয় বিরোধের বিচার করতেন। কখনও কখনও থানার ভেতরেও তার উপস্থিতিতে এমন বিচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, তিনি নিজেকে প্রায় বিচারকের মতো উপস্থাপন করতেন এবং যে রায় দিতেন তা কার্যকর করতে বাধ্য হতেন সংশ্লিষ্টরা।এসব ঘটনার অনেক ভিডিও তিনি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রচার করতেন। ফলে সামাজিকভাবে অপমানিত হলেও ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। অনেকেই বলেন, সেই সময় তার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই ছিল কঠিন বিপদের ঝুঁকি।

স্থানীয়দের দাবি,ফারাজ করিমের চারপাশে সবসময় অস্ত্রধারী অনুসারীদের একটি দল থাকত। তাদের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। এলাকায় বিরোধ বা সংঘর্ষের ঘটনায় অনেক সময় তিনি নিজেই মধ্যস্থতা করার নামে হস্তক্ষেপ করতেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন।যারা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইতেন না তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাউজানের সুলতানপুরসহ কয়েকটি গ্রামে এখনও এমন অনেক পরিবার রয়েছে যারা ফারাজ করিমের নাম শুনলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নারী জানান, তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে। তারা বলেন, তাদের ছেলে সন্তানদের মারধর করা হয়েছিল এবং অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় কেউ মুখ খুলতে পারেননি। এখনও অনেকেই ক্যামেরার সামনে এসে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না ভয়ে। এই বুঝি ফারাজ এলো।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, বাবার রাজনৈতিক প্রভাব থাকাকালে সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী রাউজানের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সেই প্রভাবের ধারাবাহিকতায় ছেলে ফারাজ করিমও এলাকায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এলাকাবাসীর অনেকেই বলেন,এমপি ছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র, আর ছেলে ফারাজ যেন সামাজিক ও স্থানীয় ক্ষমতার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ ছিল না বললেই চলে।

একটি ঘটনায় মারামারির অভিযোগে পারভেজ ও শহিদুল নামের দুই ব্যক্তিকে গহিরা বাজারে প্রকাশ্যে ঝাড়ু দিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এটি ছিল একটি সামাজিক শাস্তি যা মূলত অপমানজনক এবং ভয়ভীতি তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এই ঘটনার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান কয়েকজন বাসিন্দা।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, ফারাজ করিমের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে অনেক সময় প্রশাসনও তার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারত না। পুলিশের গাড়ি ব্যবহার এবং থানায় বিচার বসানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তৎকালীন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের গাড়ি ব্যবহারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডিউটি অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং তাকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল।তবে স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন,বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, তখনকার রাউজান থানার ওসি কেফায়েত উল্লাহ নাকি ফারাজ করিমের প্রভাবের বাইরে ছিলেন না। তার দাবি, অনেক সময় ফারাজ করিমের নির্দেশেই একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হতো। আবার অনেককে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কথিত টর্চার সেল নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর রাউজানের একটি বাগানবাড়ির পেছনের জঙ্গলে এমন একটি নির্যাতনকেন্দ্র ছিল যেখানে বিরোধে জড়িত বা অবাধ্য লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, গাজী মহসিন ও কবির নামে দুই ব্যক্তির জমি দখল করে সেই স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল,তবে বহু স্থানীয় বাসিন্দা একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয়রা বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এই টর্চার সেলের ভয় দেখানো হতো। কেউ জমি লিখে দিতে অস্বীকার করলে বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে ধরে এনে শাস্তি দেওয়া হতে পারে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল বলে দাবি তাদের।

অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলানোর পর তারা বিচার দাবি করতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, এতদিন ভয়ভীতির কারণে কেউ সামনে আসেননি। এখন তারা চান অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং সত্য উদঘাটন করা হোক।

ফারাজ করিম নিজেকে বিভিন্ন সময় মোটিভেশনাল বক্তা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা হিসেবেও উপস্থাপন করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রমের প্রচারণা চালাতেন। অনেক সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করতেন। এতে করে তার একটি ভিন্ন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, সেই প্রচারণার আড়ালেই ছিল অন্য এক বাস্তবতা।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করে, ফারাজ করিমের চারপাশে যেসব লোকজন নিয়মিত থাকতেন তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল মাদক সেবনকারী এবং অস্ত্রধারী। এসব লোকজনকে ব্যবহার করেই এলাকায় প্রভাব বজায় রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। গত ৫ আগস্টের পর সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। তবে তার ছেলে ফারাজ করিম এখনও আত্মগোপনে আছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। অনেকেই বলেন, তিনি বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার গুলশান এলাকায় অবস্থান করছেন।

রাউজানের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ফারাজ করিমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন এবং সুযোগ পেলে আবার এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে ভয়ভীতি ও প্রভাবের মাধ্যমে এলাকায় একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছিল। সেই সময় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চুপ থেকেছেন।এখন পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেকে অতীতের ঘটনাগুলো সামনে আনতে শুরু করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ফারাজ করিমের কার্যক্রম নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি মানবিক উদ্যোগের নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন যেখানে বিকাশ রকেট ও নগদ নম্বর দেওয়া ছিল। মানুষকে সহায়তার নামে সেখানে অর্থ পাঠানোর আহ্বান জানানো হতো। অনেকেই অভিযোগ করেন, সেই মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাউজানের অনেক বাসিন্দা এখন মনে করেন, অতীতের এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা চান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং কেউ যদি অপরাধ করে থাকে তবে তার যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হোক। স্থানীয়দের ভাষায়, ভয়ভীতির সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে চান তারা।