
শওকত আলম, কক্সবাজার,
কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে বসবাসকারী ফায়সাল আহমেদ (২৪) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকৃত পরিচয় গোপন করে অন্য ব্যক্তিকে বাবা-মা সাজিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ তাঁকে আটক করেছে। তাঁর পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি ঈদগাঁও থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত কোনো দালালচক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদগাঁও ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দুপাড়ায় বসবাসকারী ফায়সালের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর পিতার নাম শামসুল আলম বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতা হিসেবে নুরুল ইসলাম এবং মাতা হিসেবে জান্নাতুল ফেরদৌসের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফায়সাল আহমেদ গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করেন। এ সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ থানায় উপস্থিত হতে বলা হলে তিনি রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় হাজির হন।
পরে তাঁর দেওয়া পরিচয়, পিতা-মাতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে দালালদের সহযোগিতায় অর্থের বিনিময়ে এনআইডি তৈরি করেন ফায়সাল। পরবর্তী সময়ে ওই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামের মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।
তাঁর এনআইডিতে ঠিকানা হিসেবে চট্টগ্রামের মিনা গাজিতলা, ৯ নম্বর ওয়ার্ড, সায়েম উদ্দিনের বাড়ি, বর্মা কলোনি উল্লেখ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, তাঁর প্রকৃত পরিচয় ও পারিবারিক ঠিকানা কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ফায়সাল ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির (দালাল) মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে সফল না হয়ে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে গিয়ে দালালদের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে তাঁর কথিত তৎপরতা এবং কারা তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ও ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় গত ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় ১১০ নম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় তাঁকে আটক করে আদালতে সোপর্দের জন্য ৩ নভেম্বর পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
এজাহারে ফায়সালের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের ঈদগাঁও থানায় একাধিক ফৌজদারি মামলার তথ্যও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে সি.আর. মামলা নম্বর ১৬৫/২৫ (দ্রুত বিচার) এবং সি.আর. মামলা নম্বর ১২৯/২৫-এর কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় দণ্ডবিধির ৩৬৫/৩৮৬/৩৪ ধারার অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব মামলার বর্তমান অবস্থা ও অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট থানা ও আদালত থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, ফায়সালের এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ দালালচক্র জড়িত কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু একজন ব্যক্তিকে আটক করলেই এ ধরনের অনিয়মের পুরো চিত্র বেরিয়ে আসবে না।
ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিস এবং মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত কোথাও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী, দালাল কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতা করেছেন কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ফায়সালের প্রকৃত পরিচয়, জন্মপরিচয়, নাগরিকত্ব এবং দাখিল করা সব নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু ফায়সাল নয়, তাঁকে অবৈধভাবে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি, দালাল এবং সংশ্লিষ্ট চক্রের প্রত্যেক সদস্যকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জালিয়াতি, তথ্য গোপন কিংবা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা জরুরি। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথি ও পাসপোর্টের বৈধতা যাচাই করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
*সচেতন মহলের প্রশ্ন—একজন ব্যক্তির পরিচয় গোপন করে এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগের পেছনে যদি দালালচক্র থেকে থাকে, তাহলে সেই চক্রের মূল হোতারা কারা? ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্বাচন অফিস, এরপর পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত কারা সহযোগিতা করেছেন? নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের জবাব বের করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।*
তবে ফায়সালের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, তাঁর নাগরিকত্ব এবং এনআইডি-পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং অভিযুক্তের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

























