Dhaka , Wednesday, 4 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
স্পেনের ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ ইয়ামালের বাবার স্কুলে থাকতেই পাইলট, বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল নাথালিয়ার স্বর্ণের চাহিদায় ভাটা, কমল বার ও কয়েন কেনার পূর্বাভাস শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি মুছে যায় মনের কষ্ট? ‘ও আমাকে মা-বাবার চেয়েও বেশি বোঝে’ সরাইলে পাগলা কুকুরের কামড়ে নারীসহ ৮ জন আহত, এলাকায় আতঙ্ক কালিয়াকৈরে তুরাগ নদীতে বন্ধুদের সাথে সাতার কাটতে গিয়ে নিখোজ গার্মেন্টস শ্রমিকের লাশ উদ্ধার কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বান নাহিদ ইসলামের শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি রূপগঞ্জে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনতাই রূপগঞ্জে সিম গ্রুপের পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ টেকনাফের সাগরে মাছ ধরার নৌকায় বজ্রপাতের আঘাতে ১ জেলে নিহত! নবপ্রজন্মের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য ও শাশ্বত জীবনদর্শন তুলে ধরতে হবে – ইসলামী যুবসমাজ দুর্গাপুরে নাঈমুরের সাফল্যের হেট্রিক : টানা তিন পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে নতুন ইতিহাস মধুপুরে পর্নোগ্রাফি ও ইয়াবা কারবারের অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার, মোবাইল-ল্যাপটপ উদ্ধার পাইকগাছায় মরহুম শামসুর রহমানের স্মরণে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া মাহফিল ‎গাইবান্ধায় এলজিইডির বাস্তবায়নে খানাখন্দের রাস্তা ফিরে পেল প্রাণ ভেড়ামারা সরকারি মহিলা কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত দীর্ঘদিন পর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কারি শিল্পের জয়গান: সেরা রেস্তোরাঁ ও শেফদের বিসিএ সম্মাননা অনুষ্ঠিত মাদারীপুর সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বামী হত্যার পর অনিশ্চয়তায় দুই সন্তান, পাশে দাঁড়ালেন ডেপুটি স্পিকার; ল্যাবএইডে চাকরি পেলেন সাংবাদিক আলিফ ফকিরের স্ত্রী সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে অগ্রণী ভূমিকা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় প্রশংসিত মোঃ কাউছার ভূঁইয়া চট্টগ্রামের অপহরণ, ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি মামলার প্রধান আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার প্রধানমন্ত্রীর খুলনা আগমন উপলক্ষে পাইকগাছা বিএনপির প্রস্তুতি সভা রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ সকল বাধা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে: বিসিএস ক্যাডার হিসেবে অমিত খানের নতুন যাত্রা আবার উত্তপ্ত বরিশালের চরকাউয়া: বাস ও ইজিবাইক শ্রমিকদের দ্বন্দ্বে জিম্মি তিন উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ কক্সবাজার শিল্প ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬-২৭-এর উদ্বোধন, প্রধান অতিথি এমপি লুৎফুর রহমান কাজল

১৮ জনের সমস্যা শুনে ডিসি ‘র তাৎক্ষণিক নির্দেশনা; অসহায়দের আর্থিক সহায়তা, ২১ পরিবার পেল ত্রাণ

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 01:54:33 pm, Thursday, 23 July 2026
  • 92 বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

একজন নারী কথা বলতে বলতে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। প্রায় এক বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন তাঁর স্বামী। তিনি জানেন না, স্বামী বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। ঘরে অপেক্ষায় দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান। নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত। চিকিৎসা ও সন্তানদের খাবারের খরচ জোগাতে তাঁকে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হচ্ছে।

তাঁর কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের কাঁচা বসতঘর ভেঙে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল। স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম বাবা এখন অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আরেক পাশে অপেক্ষা করছিলেন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা এক বিধবা মা। কারও প্রয়োজন কিডনির চিকিৎসা, কারও জরুরি অস্ত্রোপচার। এক কলেজছাত্রী বই ও কলেজ ড্রেস কিনতে না পেরে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার শঙ্কায়; আরেকজনের কাছে দিনাজপুরে ফিরে যাওয়ার গাড়িভাড়াটুকুও নেই।

জীবনের এমন ভিন্ন ভিন্ন সংকট নিয়ে বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হয়েছিলেন অসহায় মানুষেরা। তাঁদের কথা ধৈর্য ও মনোযোগের সঙ্গে শোনেন মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১৮ জন সেবাপ্রত্যাশী তাঁদের আবেদন, অভাব-অনটন ও অভিযোগ তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক প্রতিটি বিষয় শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। কয়েকটি আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ফলাফল আবেদনকারীদের জানানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।

গণশুনানিতে সাতজন অসহায় ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২১ জনকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াগুঁড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়।

মোসাম্মৎ মাইনা খাতুনের স্বামী আজাদ ট্রলারে মাছ ধরার কাজ করতেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি নিখোঁজ। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর দুই ছোট সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন মাইনা। নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর।

জেলা প্রশাসকের কাছে তিনি সন্তানদের খাবার, ভরণ-পোষণ ও নিজের চিকিৎসার জন্য সহায়তার পাশাপাশি নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে প্রশাসনিক সহযোগিতা চান। তাঁর দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

বাঁশখালীর ইলশা গ্রামের রেয়াজুল জান্নাত রাহাতের বাড়িতে সাম্প্রতিক বন্যায় পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি ওঠে। এতে তাঁদের কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়।

রাহাতের বাবা রেয়াজ আহামদ দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম। ঘর হারিয়ে পরিবারটি অস্থায়ীভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাবার জন্য বসতঘর নির্মাণ ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সহায়তার আবেদন করেন রাহাত। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসনের বিষয়টি দেখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার মো. শাহাজাহান কিডনি জটিলতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ একাধিক রোগে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় তাঁর আবেদন মানবিক বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

বাঁশখালীর মিনজিরিতলার মিফতাহুল জান্নাত রিয়া সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। তাঁর এক ভাই ফাজিল প্রথম বর্ষে এবং এক বোন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

২০১৬ সালের ১৯ জুলাই বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। বসতভিটার চার শতক জমি ছাড়া তাঁদের কোনো স্থায়ী সম্পদ বা আয়ের উৎস নেই। সাম্প্রতিক বন্যায় ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থের অভাবে বই, কলেজ ড্রেস ও শিক্ষা উপকরণ কিনতে না পারায় রিয়ার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। জেলা প্রশাসক তাঁকে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরএম শাখার অফিস সহায়ক নিলুফার ইয়াসমিন কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন কন্যা ও এক পুত্রের দায়িত্ব তাঁর ওপর।

তিনি চট্টগ্রামের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. বাসকর চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন। নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও ব্যয়বহুল ওষুধের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় গিয়ে পিইটি স্ক্যান করাতে হবে। চিকিৎসা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় তিন লাখ টাকা প্রয়োজন। তাঁর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আবু কাউছারের ডান পায়ের গোড়ালির হাড় সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায়। চিকিৎসায় সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেন।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মো. শফিকুল ইসলাম জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে এসে কোনো কাজ পাননি। একপর্যায়ে তাঁর কাছে দৈনন্দিন খরচ কিংবা বাড়ি ফেরার অর্থও ছিল না। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তাঁকে দিনাজপুরে ফেরার প্রয়োজনীয় গাড়িভাড়া দেওয়া হয়।

একই দিন জেলা প্রশাসক প্রবাসীদের অভিযোগ নিয়ে অনলাইন গণশুনানিও করেন। এতে এক প্রবাসী পারিবারিক জমিজমার বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি এখন শুধু আবেদন গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। সমস্যা সরাসরি শোনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এটি অসহায় মানুষের নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হয়েছে।

কেউ ফিরেছেন চিকিৎসার অর্থ নিয়ে, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস নিয়ে, কেউ ঘর পুনর্নির্মাণের আশা নিয়ে, আবার কেউ বাড়ি ফেরার ভাড়া হাতে নিয়ে। সহায়তার অঙ্ক হয়তো তাঁদের সব সংকট দূর করবে না; তবে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তাঁদের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়েছে—রাষ্ট্রের দরজা এখনো তাঁদের জন্য খোলা।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

স্পেনের ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ ইয়ামালের বাবার

১৮ জনের সমস্যা শুনে ডিসি ‘র তাৎক্ষণিক নির্দেশনা; অসহায়দের আর্থিক সহায়তা, ২১ পরিবার পেল ত্রাণ

আপডেট সময় : 01:54:33 pm, Thursday, 23 July 2026

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

একজন নারী কথা বলতে বলতে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। প্রায় এক বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন তাঁর স্বামী। তিনি জানেন না, স্বামী বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। ঘরে অপেক্ষায় দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান। নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত। চিকিৎসা ও সন্তানদের খাবারের খরচ জোগাতে তাঁকে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হচ্ছে।

তাঁর কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের কাঁচা বসতঘর ভেঙে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল। স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম বাবা এখন অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আরেক পাশে অপেক্ষা করছিলেন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা এক বিধবা মা। কারও প্রয়োজন কিডনির চিকিৎসা, কারও জরুরি অস্ত্রোপচার। এক কলেজছাত্রী বই ও কলেজ ড্রেস কিনতে না পেরে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার শঙ্কায়; আরেকজনের কাছে দিনাজপুরে ফিরে যাওয়ার গাড়িভাড়াটুকুও নেই।

জীবনের এমন ভিন্ন ভিন্ন সংকট নিয়ে বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হয়েছিলেন অসহায় মানুষেরা। তাঁদের কথা ধৈর্য ও মনোযোগের সঙ্গে শোনেন মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১৮ জন সেবাপ্রত্যাশী তাঁদের আবেদন, অভাব-অনটন ও অভিযোগ তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক প্রতিটি বিষয় শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। কয়েকটি আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ফলাফল আবেদনকারীদের জানানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।

গণশুনানিতে সাতজন অসহায় ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২১ জনকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াগুঁড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়।

মোসাম্মৎ মাইনা খাতুনের স্বামী আজাদ ট্রলারে মাছ ধরার কাজ করতেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি নিখোঁজ। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর দুই ছোট সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন মাইনা। নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর।

জেলা প্রশাসকের কাছে তিনি সন্তানদের খাবার, ভরণ-পোষণ ও নিজের চিকিৎসার জন্য সহায়তার পাশাপাশি নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে প্রশাসনিক সহযোগিতা চান। তাঁর দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

বাঁশখালীর ইলশা গ্রামের রেয়াজুল জান্নাত রাহাতের বাড়িতে সাম্প্রতিক বন্যায় পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি ওঠে। এতে তাঁদের কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়।

রাহাতের বাবা রেয়াজ আহামদ দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম। ঘর হারিয়ে পরিবারটি অস্থায়ীভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাবার জন্য বসতঘর নির্মাণ ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সহায়তার আবেদন করেন রাহাত। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসনের বিষয়টি দেখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার মো. শাহাজাহান কিডনি জটিলতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ একাধিক রোগে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় তাঁর আবেদন মানবিক বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

বাঁশখালীর মিনজিরিতলার মিফতাহুল জান্নাত রিয়া সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। তাঁর এক ভাই ফাজিল প্রথম বর্ষে এবং এক বোন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

২০১৬ সালের ১৯ জুলাই বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। বসতভিটার চার শতক জমি ছাড়া তাঁদের কোনো স্থায়ী সম্পদ বা আয়ের উৎস নেই। সাম্প্রতিক বন্যায় ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থের অভাবে বই, কলেজ ড্রেস ও শিক্ষা উপকরণ কিনতে না পারায় রিয়ার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। জেলা প্রশাসক তাঁকে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরএম শাখার অফিস সহায়ক নিলুফার ইয়াসমিন কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন কন্যা ও এক পুত্রের দায়িত্ব তাঁর ওপর।

তিনি চট্টগ্রামের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. বাসকর চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন। নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও ব্যয়বহুল ওষুধের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় গিয়ে পিইটি স্ক্যান করাতে হবে। চিকিৎসা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় তিন লাখ টাকা প্রয়োজন। তাঁর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আবু কাউছারের ডান পায়ের গোড়ালির হাড় সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায়। চিকিৎসায় সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেন।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মো. শফিকুল ইসলাম জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে এসে কোনো কাজ পাননি। একপর্যায়ে তাঁর কাছে দৈনন্দিন খরচ কিংবা বাড়ি ফেরার অর্থও ছিল না। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তাঁকে দিনাজপুরে ফেরার প্রয়োজনীয় গাড়িভাড়া দেওয়া হয়।

একই দিন জেলা প্রশাসক প্রবাসীদের অভিযোগ নিয়ে অনলাইন গণশুনানিও করেন। এতে এক প্রবাসী পারিবারিক জমিজমার বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি এখন শুধু আবেদন গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। সমস্যা সরাসরি শোনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এটি অসহায় মানুষের নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হয়েছে।

কেউ ফিরেছেন চিকিৎসার অর্থ নিয়ে, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস নিয়ে, কেউ ঘর পুনর্নির্মাণের আশা নিয়ে, আবার কেউ বাড়ি ফেরার ভাড়া হাতে নিয়ে। সহায়তার অঙ্ক হয়তো তাঁদের সব সংকট দূর করবে না; তবে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তাঁদের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়েছে—রাষ্ট্রের দরজা এখনো তাঁদের জন্য খোলা।