
জনি কান্ত শর্মা, সিলেট
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি ও উদ্বেগ দুইয়েরই বার্তা নিয়ে এসেছে। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৩৫৬ রানে থেমেছে সফরকারীদের প্রথম ইনিংস। কিন্তু ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ফিল্ডিংয়ের সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে ওপেনার শাদমান ইসলামকে।
প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪০ ওভারে ৩ উইকেটে ৮৮ রান। এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে স্বাগতিকেরা। ক্রিজে অপরাজিত আছেন তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম।
দিনের শুরুতে আগের দিনের ৪ উইকেটে ২৩৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সকালে আরও ১২১ রান যোগ করে ১০৬.৪ ওভারে ৩৫৬ রানে অলআউট হয় ক্যারিবীয়রা। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১৩৩ রান করেন আমির জ্যাঙ্গু। ২১২ বলের ইনিংসে ১৩টি চার ও দুটি ছক্কা হাঁকান তিনি। এ ছাড়া কেভিন উইকহাম ১৪৫ বলে ৬১ এবং জাস্টিন গ্রিভস ১১২ বলে ৫১ রান করেন।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন হাসান মাহমুদ। ২৪ ওভার বল করে ৯০ রানের বিনিময়ে নেন ৬ উইকেট। প্রথম দিনের দুটি শিকারের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনে আরও চার উইকেট যোগ করে ক্যারিবীয়দের ইনিংস গুটিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন এই পেসার। এটি তাঁর ক্যারিয়ারসেরা দ্বিতীয় ইনিংস।
দ্বিতীয় দিনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল আমির জ্যাঙ্গুর বিদায়। ১৩৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা এই সেঞ্চুরিয়ানকে বোল্ড করেন হাসান। তাঁর বিদায়ের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছিল ২৬৪ রান, তখন পঞ্চম উইকেটের পতন ঘটে।
এরপর একই দলীয় সংগ্রহে ষষ্ঠ উইকেটও তুলে নেন হাসান। অধিনায়ক রস্টন চেজ কোনো রান না করেই ফিরে যান। মাত্র এক বল মোকাবিলা করা চেজ লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন।
হাসানের পরের শিকার হন জশুয়া বিশপ। ২৫ বলে ২৩ রান করা এই ব্যাটসম্যানকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন লিটন দাস। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছিল ২৯৭ রান।
এরপর শামার জোসেফকে বোল্ড করে নিজের ষষ্ঠ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। ১৮ বলে ১৬ রান করেন জোসেফ। তাঁর বিদায়ের সময় ক্যারিবীয়দের সংগ্রহ ছিল ৩২৩ রান।
শেষ উইকেটে জোমেল ওয়ারিকান ও জেডেন সিলস ৩৩ রানের জুটি গড়ে প্রতিরোধ গড়েন। এই জুটি ভাঙতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয় ৬৭ বল। শেষ পর্যন্ত মেহেদী হাসান মিরাজের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন সিলস। ৩৮ বলে ১৫ রান করেন তিনি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি এই ব্যাটসম্যান। অন্য প্রান্তে ৪৮ বলে ২৭ রান করে অপরাজিত থাকেন ওয়ারিকান। সিলসের বিদায়েই ৩৫৬ রানে শেষ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস।
হাসানের ছয় উইকেটের বাইরে তাসকিন আহমেদ ২১ ওভারে ৯০ রান দিয়ে দুটি এবং মেহেদী হাসান মিরাজ ৩১.৪ ওভারে ৮২ রান দিয়ে দুটি উইকেট নেন। তাইজুল ইসলাম ১৯ ওভারে ৫৪ এবং নাঈম হাসান ১১ ওভারে ৩৭ রান দিলেও কোনো উইকেট পাননি।
ক্যারিবীয়দের ইনিংস শেষ হওয়ার পর ব্যাট হাতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু ইনিংসের শুরুতেই সেই সুযোগ কঠিন হয়ে ওঠে। ৪.২ ওভারে ৫ রান করে বিদায় নেন নাইটওয়াচম্যান নাঈম হাসান। ছয় বলের ইনিংসে একটি চার মেরেছিলেন তিনি। জেডেন সিলসের বলে ব্র্যান্ডন কিংয়ের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন নাঈম।
এরপর ৮.৬ ওভারে ৩৩ বলে ১৬ রান করে আউট হন তানজিদ হাসান তামিম। তাঁর ইনিংসে ছিল দুটি চার। জাস্টিন গ্রিভসের বলে কেভিন উইকহামের হাতে ক্যাচ দেন তিনি।
তৃতীয় উইকেটে বিদায় নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ৬৫ বল খেলে ১৮ রান করেন তিনি। একটি চার ও একটি ছক্কা ছিল তাঁর ইনিংসে। শামার জোসেফের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান বাংলাদেশের অধিনায়ক। ২২.৪ ওভারে ৫১ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় স্বাগতিকেরা।
এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দিনের বাকি সময় পার করেন তাঁরা। ৮০ বলে দুটি চারের সাহায্যে ২৯ রান নিয়ে অপরাজিত আছেন হৃদয়। অন্যদিকে মুশফিক ৫৬ বলে দুটি চারে করেছেন ১৯ রান।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে শুরু থেকেই সতর্কতার ছাপ ছিল। বিশেষ করে শান্ত ৬৫ বল খেলেও ১৮ রানের বেশি করতে পারেননি। তিন উইকেট হারানোর পর হৃদয় ও মুশফিকের প্রতিরোধে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে স্বাগতিক শিবিরে। তবে প্রথম ইনিংসের বড় ঘাটতি এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
এদিকে দিনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা শাদমান ইসলামের চোট। ফিল্ডিং করার সময় গোড়ালিতে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় এই ওপেনারকে। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চোটের কারণে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাটিংয়ে নামা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এর আগে ম্যাচের প্রথম দিন টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে শুরুটা ভালো হয়নি সফরকারীদের। মাত্র ২৭ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। ব্র্যান্ডন কিং ১৮ বলে ৯, কাভেম হজ ১০ বলে ১ এবং জশুয়া দা সিলভা ১৭ বলে ১২ রান করে আউট হন।
সেখান থেকে দলকে সামাল দেন আমির জ্যাঙ্গু ও কেভিন উইকহাম। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ১৩১ রানের জুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রাথমিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করে। প্রথম দিনের খেলা শেষে সফরকারীদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ২৩৫ রান। জ্যাঙ্গু ১১১ রানে অপরাজিত থেকে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। উইকহাম তখন ব্যাট করছিলেন ৬১ রানে।
প্রথম দিনের শেষ দিকে বাংলাদেশের স্পিনাররা প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। তাসকিন ও হাসানের পেস আক্রমণে শুরুতে তিন উইকেট হারালেও জ্যাঙ্গু ও উইকহামের জুটি ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় দিনের সকালে হাসান মাহমুদের চার উইকেটসহ মোট ছয় শিকারের সুবাদে ৩৫৬ রানেই থামে ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস।
দিন শেষে হাসানের দুর্দান্ত বোলিং বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি হলেও ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে দলকে। হাতে সাত উইকেট নিয়ে এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে থাকা স্বাগতিকদের সামনে প্রথম কাজ ঘাটতি কমানো। সে জন্য হৃদয় ও মুশফিকের জুটিকে বড় করতে হবে, পাশাপাশি পরের ব্যাটসম্যানদেরও নিতে হবে দায়িত্ব।

























