
আঃ হামিদ, মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি,
স্বামীকে খুঁজতে সুনামগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে এসেছিলেন লক্ষ্মী দাশ। সঙ্গে ছোট শিশুসন্তান। স্বামী জানিয়েছিলেন, প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণের কারণে মানুষের ভয়ে মধুপুরে আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু মধুপুরে এসে স্বামীর ফোন বন্ধ পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন লক্ষ্মী। কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন—কোনো উত্তর ছিল না। শেষ পর্যন্ত শিশুসন্তানকে নিয়ে তিন দিন ধরে সড়কের পাশে কাটাতে হয় তাকে। খাবার নেই, বাড়ি ফেরারও কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন অবস্থায় কান্নারত লক্ষ্মী ও তার শিশুর পাশে দাঁড়ায় সামাজিক সংগঠন ‘প্রয়াস টিম’।
ঘটনাটি মধুপুর উপজেলা সদরের কাছাকাছি সড়কের পাশের। সেখানে লক্ষ্মীকে শিশুসন্তানসহ কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান প্রয়াস টিমের সদস্যরা। তাকে ঘিরে তখন কয়েকজন মানুষ নানা প্রশ্ন করছিলেন। কিন্তু আতঙ্ক ও অসহায়ত্বে ভেঙে পড়া লক্ষ্মী ঠিকমতো কারও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলেন না।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে প্রয়াস টিমের সদস্যরা তার কাছে এগিয়ে যান। প্রথমে তাকে শান্ত করেন এবং ধীরে ধীরে তার সমস্যার কথা জানতে চান। একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে তার অসহায় হয়ে পড়ার পুরো ঘটনা।
লক্ষ্মী দাশ সুনামগঞ্জের শেরপুর এলাকার কাউরাত গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামীর নাম স্বপন দাশ। লক্ষ্মীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বপন তাকে জানিয়েছিলেন, প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার পর পাওনাদারদের ভয়ে তিনি মধুপুরে আত্মগোপন করে আছেন। স্বামীর কথায় তাকে খুঁজতে শিশুসন্তানকে নিয়ে মধুপুরে আসেন লক্ষ্মী। কিন্তু এখানে এসে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ফোনে কল করলেও স্বামী তা ধরছিলেন না।
এভাবে এক দিন, দুই দিন করে কেটে যায় প্রায় তিন দিন। স্বামীর সন্ধান নেই, হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই, খাবারের ব্যবস্থাও নেই। শিশুসন্তানকে নিয়ে কোথায় থাকবেন বা কীভাবে বাড়ি ফিরবেন—তা নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি।
প্রয়াস টিমের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে মা ও শিশুর জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেন। তবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত লক্ষ্মী প্রথমে খাবার খেতে চাইছিলেন না। পরে সংগঠনের সদস্যরা তাকে সান্ত্বনা দেন এবং সাহস জোগান। একপর্যায়ে শিশুসন্তানকে নিয়ে খাবার গ্রহণ করেন তিনি। খাবার পেয়ে প্রয়াস টিমের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন লক্ষ্মী।
পরে রোববার (৩০ আগস্ট) প্রয়াস টিমের পক্ষ থেকে বিষয়টি মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ইউএনও তাদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়াসকে আর্থিক সহায়তা দেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফিরে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এর মধ্যে বাড়ি ফেরার জন্য আরও অস্থির হয়ে ওঠেন লক্ষ্মী। শিশুসন্তানকে নিয়ে দীর্ঘ সময় মধুপুরে থাকা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। পরে প্রয়াস টিম আবারও ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তখন তিনি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি লক্ষ্মী ও তার শিশুসন্তানকে নিরাপদে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করতে প্রয়াস টিমকে নির্দেশ দেন এবং যাতায়াতের ব্যয় নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
ইউএনওর নির্দেশনা পাওয়ার পর দ্রুত উদ্যোগ নেয় প্রয়াস টিম। সংগঠনের উপদেষ্টা নাজিবুল বাশারের সহযোগিতায় লক্ষ্মী দাশ ও তার শিশুসন্তানের জন্য বাসযাত্রার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ পথের কথা বিবেচনা করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও সঙ্গে দেওয়া হয়।
এ সময় প্রয়াস টিমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সেলিম তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসনিক) আনাস মোহাম্মদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (কার্যনির্বাহী) শাহরিয়ার রাফি এবং সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন।
স্বামীকে খুঁজতে দূর সুনামগঞ্জ থেকে মধুপুরে এসে বিপাকে পড়া এক মা ও শিশুর পাশে দাঁড়ানোর এ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা পেয়েছে। তাদের নিরাপদে বাড়ি ফেরানোর মধ্য দিয়ে অন্তত সাময়িকভাবে অনিশ্চয়তার সেই অধ্যায়ের অবসান হয়েছে লক্ষ্মী ও তার শিশুসন্তানের।

























