Dhaka , Sunday, 1 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
ধর্মপাশায় বোরো জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৫ নোয়াখালীতে ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির আনন্দ শোভাযাত্রা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর জাতীয় যুব দিবসে ঠাকুরগাঁওয়ে শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননা পেলেন অক্সিজেন এর প্রতিষ্ঠাতা ইমন কবে দলে ফিরতে পারেন দিবালা, জানালেন রোমা কোচ গাজীপুরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজারের দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ভাংচুর-আগ্নসংযোগ কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রায় ৭ ঘন্টা পর ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ‎গাইবান্ধার সাঘাটায় ভূমি কর্মকর্তার অপসারণে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন ভাঙ্গায় সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ দীঘিনালায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের মহড়া সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ, ৪৮ কারখানায় সাধারণ ছুটি মৌলভীবাজারে এনপিবি নিউজের ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত রাজনগরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, ১২ যুবক-যুবতী পেলেন ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি, চ্যান্সেলরের পদত্যাগ দাবি রাত ৯টা পর্যন্ত শপিংমল খোলা রাখার দাবি রূপগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ময়লা অপসারণ শুরু, স্বস্তিতে রোগী ও স্বজনরা সাজিনাজ হাসপাতাল ও রেডিসন ব্লু চট্টগ্রামের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর টাকার লোভে আ.লীগ নেতাদের আশ্রয় দিচ্ছে বিএনপির কিছু লোক: মির্জা আব্বাস কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনে ঝুটের গোডাউনে আগুনের ঘটনা ঘটে নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ প্রশাসক ডা. শাহাদাতের রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ২৪ ঘণ্টায় ১,৮১০ মামলা, ডাম্পিং ৪৯৮ গাড়ি পাইকগাছায় জাতীয় যুব দিবস পালিত সাজেকের অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কে পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধ সংবাদপত্র ছেঁড়ার ব্যাখ্যা দিলেন রাশেদ খাঁন রূপগঞ্জে পাথরবোঝাই ট্রাক থেকে ৬৪২ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ মধুপুরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক ও সনদপত্র বিতরণ কালিয়াকৈরে থেমে থেমে চলছে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ১৫ কিলোমিটার জুড়ে আটকে আছে যানবাহন  দুর্গাপুরে লক্ষাধিক টাকার মালামালসহ এক তরুণ আটক ১৩৫ টন চালে ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যাফ্লাটক্সিন পাওয়ার প্রতিবেদন নিয়ে শিপিং এজেন্টের আপত্তি নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব উপজেলায় একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

নেত্রকোনায় সুর থামলো, পথ ফুরালো না, দায় রয়ে গেল- চারণ কবি হাছেন আলীর স্মরণে

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 09:21:51 pm, Saturday, 10 October 2026
  • 36 বার পড়া হয়েছে

সাগর আহমেদ জজ, নেত্রকোনা প্রতিনিধি,

গত ৭ অক্টোবর নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার আগিয়া ইউনিয়নের মহিষবেড় গ্রামে যে কণ্ঠটি চিরতরে থেমে গেল, সে কণ্ঠ কোনো মাইকে বাজতো না। সে কণ্ঠ বাজতো মানুষের উঠোনে, হাটের পাশে, চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে। পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী [৭০] চলে গেলেন। কোনো ঢাক-ঢোল নেই, কোনো রাষ্ট্রীয় শোক নেই। যেমন নীরবে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে পুঁথি পাঠ করে বেড়াতেন, তেমনি নীরবেই তিনি চলে গেলেন। কিন্তু এই নীরব প্রস্থানটি আসলে এক বিরাট শব্দ করে গেল – বাংলাদেশের লোক-ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

চারণ কারা? কেন তিনি শেষ প্রতিনিধি:
চর্যাপদের কাল থেকে শুরু। যখন কাগজ ছিল না, বই ছিল না, তখন জ্ঞান বাঁচিয়ে রাখতো মানুষের মুখ। গাজী-কালু-চম্পাবতী, ইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনুর পুঁথি কাঁধে নিয়ে একদল মানুষ গ্রামে গ্রামে ঘুরতো। তারা গান গাইতো, গল্প বলতো, নীতিকথা শোনাতো। তারাই ছিল বাংলার প্রথম সংবাদপত্র, প্রথম স্কুল, প্রথম আদালত। মাইক, প্রেস, ফেসবুক আসার আগে তারাই মানুষের বিবেক জাগাতো। আজ এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত। শহুরে গবেষকরা যখন একে জাদুঘরে খুঁজছেন, তখন মহিষবেড়ে বসে একজন মানুষ একা হাতে এই প্রদীপটি আগলে রেখেছিলেন। হাছেন আলী ছিলেন সেই শেষ প্রদীপের শেষ শিখা।

সমাজকর্মী থেকে কবি হয়ে ওঠা:
তাঁর পরিচয়পত্রে লেখা – পিতা মৃত মোঃ আরমান আলী, গ্রাম মহিষবেড়, ডাকঘর আগিয়া, উপজেলা পূর্বধলা, জেলা নেত্রকোণা। ২০০৬ সালে সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় তিনি এম.এন.পি ট্রেনিং প্রাপ্ত হন। দীর্ঘদিন তিনি এসইউএস এর সাথে পল্লী উন্নয়নে কাজ করেছেন। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষকে শুধু ঋণ দিলে হবে না, মনের ভেতরে ঢুকতে হবে। আর বাঙালির মনের ভেতরে ঢোকার সবচেয়ে পুরনো চাবি হলো পুঁথির সুর। তাই তিনি আধুনিক উন্নয়নকর্মীর পাওয়ার পয়েন্ট ফেলে বেছে নিলেন গাজী-কালুর পুঁথির সুরকে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের নিচে লেখা থাকতো – লেখক: পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী। এই দুটি পরিচয়কে তিনি আলাদা করেননি।

তাঁর পুঁথি – বিনোদন নয়, সামাজিক দলিল:
আমরা তাঁর যে বইগুলো হাতে পেয়েছি, তার তালিকাই তাঁর চিন্তা বলে দেয়। তাঁর প্রকাশিত বইসমূহ – “অধিকারের কথা”, “ঘূর্ণিঝড়ের কথা”, “গ্রামীণ নারীর কথা” [১ম প্রকাশ ২০০৭, ২য় প্রকাশ ২০১৬], “অতীতের নির্বাচনের কথা”, “নারীর অধিকারের কথা”, “নিতাই বাবুর কন্যা লক্ষ্মী নারীর জীবনী”, নেত্রকোণা জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি মোঃ মুশফিকুর রহমানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পুঁথি।

তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ কাজ : “অতীতের গ্রামীণ নারীর পুঁথি” ও “অতীত ও বর্তমান গ্রামীণ নারীর কথা”। প্রচ্ছদে একজন গ্রামীণ নারী কলসিতে পানি ঢালছে। এই ছবিটাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি – নারী সংসারের ধারক।
তাঁর পুঁথি ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। একটি বইয়ের শুরুতেই তিনি লিখেছেন – “আমার এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য হল যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া যদি আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ হয়ে থাকে। তাহলে সমস্ত নারীদের পক্ষে এবং যৌতুক লোভী সমস্ত পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে আমার এই উপস্থাপনা।”

আরেকটি বইতে তিনি “মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের কুফলের আংশিক বর্ণনা” দিয়েছেন ১৭ দফায় – অল্প বয়সে অধিক সন্তান, স্বাস্থ্য নষ্ট, অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, একলামশিয়া রোগ, মাতৃ মৃত্যু বৃদ্ধি, সংসার গোছাতে না পারা, সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়া, তালাক বৃদ্ধি, সংসারে উন্নতি কম হওয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা, পাগল হওয়ার প্রবণতা, রক্তশূন্যতা থেকে নানা রোগ। আজকের এনজিও রিপোর্টে যা থাকে, তিনি তা লিখেছেন পুঁথির ছন্দে।

মানবতার কবি:
হাছেন আলী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও লিখেছেন –
“অহিংসা পরম ধর্ম সর্ব শাস্ত্রে পাই,
হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতের বিচার নাই।”

“কেহ বলে আল্লা আল্লা কেহ বলে হরি,
নামায রোজা সেবা পূজা একি আশায় করি।”

তিনি হিন্দু চরিত্র নিতাই ঠাকুর ও তার মা-মরা মেয়ে লক্ষ্মী রাণীকে নিয়ে আস্ত জীবনী পুঁথি লিখেছেন। যেখানে লিখেছেন – “বড়ই দুঃখি লক্ষ্মী রাণী মা মরা সন্তান,
লালন পালন বাবায় করে বাঁচায় ভগবান।” একজন মুসলমান চারণ কবির হাতে হিন্দু মেয়ের জীবনী – এটাই বাংলাদেশ।

তাঁর দর্শনের সারকথা ছিল:
“আমরা জানি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি যেমন আর একজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত পারে না, তেমনি একজন মানুষ নিজে সচেতন না হইয়া আর একজন মানুষকে সচেতন করতে পারে না।” তাই তিনি নিজে সচেতন হয়ে গ্রাম জাগাতে বেরিয়েছিলেন।

আমরা কী হারালাম:
আমরা একজন কবিকে হারাইনি, একটি চলমান লাইব্রেরিকে হারিয়েছি। তাঁর বইগুলো ভূঁইয়া প্রিন্টার্স, নেত্রকোণা থেকে ছাপা, সাদামাটা কাগজে। কিন্তু এর ভেতরের তথ্য অমূল্য। যদি এখনই সংরক্ষণ না করা হয়, আগামী দশ বছরে কেউ জানবেই না পূর্বধলায় এমন একজন চারণ ছিলেন।

আমাদের দাবি:
পূর্বধলা উপজেলা প্রশাসন, নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন এবং বাংলা একাডেমির কাছে আমাদের দাবি – তার সমস্ত পুঁথি সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ করা হোক। নেত্রকোণার লোকসাহিত্য গবেষকদের উচিত তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করা। তাঁর নিজ গ্রাম মহিষবেড়ে তাঁর নামে একটি পল্লী পাঠাগার স্থাপন করা।

চারণরা মরে না। তারা মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। যতদিন গ্রামে যৌতুকের জন্য কোনো নারী কাঁদবে, যতদিন বাল্যবিবাহের জন্য কোনো মেয়ের স্কুল বন্ধ হবে, ততদিন হাছেন আলীর পুঁথি প্রাসঙ্গিক থাকবে। তাঁর সুর থেমে গেছে, কিন্তু তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সে পথ ফুরায়নি। বিনম্র শ্রদ্ধা, হে পল্লীর শেষ চারণ।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ধর্মপাশায় বোরো জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৫

নেত্রকোনায় সুর থামলো, পথ ফুরালো না, দায় রয়ে গেল- চারণ কবি হাছেন আলীর স্মরণে

আপডেট সময় : 09:21:51 pm, Saturday, 10 October 2026

সাগর আহমেদ জজ, নেত্রকোনা প্রতিনিধি,

গত ৭ অক্টোবর নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার আগিয়া ইউনিয়নের মহিষবেড় গ্রামে যে কণ্ঠটি চিরতরে থেমে গেল, সে কণ্ঠ কোনো মাইকে বাজতো না। সে কণ্ঠ বাজতো মানুষের উঠোনে, হাটের পাশে, চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে। পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী [৭০] চলে গেলেন। কোনো ঢাক-ঢোল নেই, কোনো রাষ্ট্রীয় শোক নেই। যেমন নীরবে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে পুঁথি পাঠ করে বেড়াতেন, তেমনি নীরবেই তিনি চলে গেলেন। কিন্তু এই নীরব প্রস্থানটি আসলে এক বিরাট শব্দ করে গেল – বাংলাদেশের লোক-ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

চারণ কারা? কেন তিনি শেষ প্রতিনিধি:
চর্যাপদের কাল থেকে শুরু। যখন কাগজ ছিল না, বই ছিল না, তখন জ্ঞান বাঁচিয়ে রাখতো মানুষের মুখ। গাজী-কালু-চম্পাবতী, ইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনুর পুঁথি কাঁধে নিয়ে একদল মানুষ গ্রামে গ্রামে ঘুরতো। তারা গান গাইতো, গল্প বলতো, নীতিকথা শোনাতো। তারাই ছিল বাংলার প্রথম সংবাদপত্র, প্রথম স্কুল, প্রথম আদালত। মাইক, প্রেস, ফেসবুক আসার আগে তারাই মানুষের বিবেক জাগাতো। আজ এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত। শহুরে গবেষকরা যখন একে জাদুঘরে খুঁজছেন, তখন মহিষবেড়ে বসে একজন মানুষ একা হাতে এই প্রদীপটি আগলে রেখেছিলেন। হাছেন আলী ছিলেন সেই শেষ প্রদীপের শেষ শিখা।

সমাজকর্মী থেকে কবি হয়ে ওঠা:
তাঁর পরিচয়পত্রে লেখা – পিতা মৃত মোঃ আরমান আলী, গ্রাম মহিষবেড়, ডাকঘর আগিয়া, উপজেলা পূর্বধলা, জেলা নেত্রকোণা। ২০০৬ সালে সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় তিনি এম.এন.পি ট্রেনিং প্রাপ্ত হন। দীর্ঘদিন তিনি এসইউএস এর সাথে পল্লী উন্নয়নে কাজ করেছেন। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষকে শুধু ঋণ দিলে হবে না, মনের ভেতরে ঢুকতে হবে। আর বাঙালির মনের ভেতরে ঢোকার সবচেয়ে পুরনো চাবি হলো পুঁথির সুর। তাই তিনি আধুনিক উন্নয়নকর্মীর পাওয়ার পয়েন্ট ফেলে বেছে নিলেন গাজী-কালুর পুঁথির সুরকে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের নিচে লেখা থাকতো – লেখক: পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী। এই দুটি পরিচয়কে তিনি আলাদা করেননি।

তাঁর পুঁথি – বিনোদন নয়, সামাজিক দলিল:
আমরা তাঁর যে বইগুলো হাতে পেয়েছি, তার তালিকাই তাঁর চিন্তা বলে দেয়। তাঁর প্রকাশিত বইসমূহ – “অধিকারের কথা”, “ঘূর্ণিঝড়ের কথা”, “গ্রামীণ নারীর কথা” [১ম প্রকাশ ২০০৭, ২য় প্রকাশ ২০১৬], “অতীতের নির্বাচনের কথা”, “নারীর অধিকারের কথা”, “নিতাই বাবুর কন্যা লক্ষ্মী নারীর জীবনী”, নেত্রকোণা জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি মোঃ মুশফিকুর রহমানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পুঁথি।

তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ কাজ : “অতীতের গ্রামীণ নারীর পুঁথি” ও “অতীত ও বর্তমান গ্রামীণ নারীর কথা”। প্রচ্ছদে একজন গ্রামীণ নারী কলসিতে পানি ঢালছে। এই ছবিটাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি – নারী সংসারের ধারক।
তাঁর পুঁথি ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। একটি বইয়ের শুরুতেই তিনি লিখেছেন – “আমার এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য হল যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া যদি আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ হয়ে থাকে। তাহলে সমস্ত নারীদের পক্ষে এবং যৌতুক লোভী সমস্ত পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে আমার এই উপস্থাপনা।”

আরেকটি বইতে তিনি “মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের কুফলের আংশিক বর্ণনা” দিয়েছেন ১৭ দফায় – অল্প বয়সে অধিক সন্তান, স্বাস্থ্য নষ্ট, অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, একলামশিয়া রোগ, মাতৃ মৃত্যু বৃদ্ধি, সংসার গোছাতে না পারা, সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়া, তালাক বৃদ্ধি, সংসারে উন্নতি কম হওয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা, পাগল হওয়ার প্রবণতা, রক্তশূন্যতা থেকে নানা রোগ। আজকের এনজিও রিপোর্টে যা থাকে, তিনি তা লিখেছেন পুঁথির ছন্দে।

মানবতার কবি:
হাছেন আলী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও লিখেছেন –
“অহিংসা পরম ধর্ম সর্ব শাস্ত্রে পাই,
হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতের বিচার নাই।”

“কেহ বলে আল্লা আল্লা কেহ বলে হরি,
নামায রোজা সেবা পূজা একি আশায় করি।”

তিনি হিন্দু চরিত্র নিতাই ঠাকুর ও তার মা-মরা মেয়ে লক্ষ্মী রাণীকে নিয়ে আস্ত জীবনী পুঁথি লিখেছেন। যেখানে লিখেছেন – “বড়ই দুঃখি লক্ষ্মী রাণী মা মরা সন্তান,
লালন পালন বাবায় করে বাঁচায় ভগবান।” একজন মুসলমান চারণ কবির হাতে হিন্দু মেয়ের জীবনী – এটাই বাংলাদেশ।

তাঁর দর্শনের সারকথা ছিল:
“আমরা জানি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি যেমন আর একজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত পারে না, তেমনি একজন মানুষ নিজে সচেতন না হইয়া আর একজন মানুষকে সচেতন করতে পারে না।” তাই তিনি নিজে সচেতন হয়ে গ্রাম জাগাতে বেরিয়েছিলেন।

আমরা কী হারালাম:
আমরা একজন কবিকে হারাইনি, একটি চলমান লাইব্রেরিকে হারিয়েছি। তাঁর বইগুলো ভূঁইয়া প্রিন্টার্স, নেত্রকোণা থেকে ছাপা, সাদামাটা কাগজে। কিন্তু এর ভেতরের তথ্য অমূল্য। যদি এখনই সংরক্ষণ না করা হয়, আগামী দশ বছরে কেউ জানবেই না পূর্বধলায় এমন একজন চারণ ছিলেন।

আমাদের দাবি:
পূর্বধলা উপজেলা প্রশাসন, নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন এবং বাংলা একাডেমির কাছে আমাদের দাবি – তার সমস্ত পুঁথি সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ করা হোক। নেত্রকোণার লোকসাহিত্য গবেষকদের উচিত তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করা। তাঁর নিজ গ্রাম মহিষবেড়ে তাঁর নামে একটি পল্লী পাঠাগার স্থাপন করা।

চারণরা মরে না। তারা মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। যতদিন গ্রামে যৌতুকের জন্য কোনো নারী কাঁদবে, যতদিন বাল্যবিবাহের জন্য কোনো মেয়ের স্কুল বন্ধ হবে, ততদিন হাছেন আলীর পুঁথি প্রাসঙ্গিক থাকবে। তাঁর সুর থেমে গেছে, কিন্তু তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সে পথ ফুরায়নি। বিনম্র শ্রদ্ধা, হে পল্লীর শেষ চারণ।