Dhaka , Sunday, 14 June 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
নোয়াখালীতে মাদকসেবী আখ্যা দিয়ে ব্যবসায়ীকে হত্যা, গ্রেপ্তার-২ দেশব্যাপী২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তারেক রহমানের নির্দেশিত বেতাগীতে বর্ণাঢ্য উদ্বোধন মধুপুরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন পলাশে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস,৩০০ ফুট পতাকা নিয়ে মিছিল জাজিরায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন এমপি সাঈদ আহমেদ আসলাম রামগঞ্জে সম্পত্তি বিরোধে মুক্তিযোদ্ধার বসতঘর পুড়ে ছাই রূপগঞ্জে কারখানায় দুর্ধর্ষ ডাকাতিতে কোটি টাকার মালামাল লুট জিয়াউর রহমান বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন:- অধ্যাপক নছরুল কদির সন্দ্বীপে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী বাবলুসহ ২ জন গ্রেপ্তার শিশুদের ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বাড়ায় যে টয়লেট অভ্যাসগুলো, জানালেন বিশেষজ্ঞ কিশোরীদের মধ্যে স্কিনকেয়ার আসক্তি, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা ‘হামলা হবে না’ শর্তে ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ছে আমিরাত অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার মিশন, যা বলছেন সৌম্য হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু প্রেসক্লাব পাইকগাছার সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রতিটি গোলের বিপরীতে গাছ রোপণ: লালমনিরহাটে ‘অদম্য যুব সংগঠন’ এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ভোরের কাগজ সাংবাদিকের পরিবারকে হত্যার হুমকি, থানায় জিডি পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তিন প্রতিমন্ত্রীর আকর্ষিক পরিদর্শন বাবার আদর্শকে ধারণ করে চট্টগ্রামবাসীর ভাগ্যবদলে সবসময় পাশে থাকব:- ডা. শাহাদাত হোসেন কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসের ৮ বছর, এখনো ঝুঁকিতে বসবাস করছে শতাধিক পরিবার মাদক বিবাদে স্কুলছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা, নোয়াখালীতে লাশ নিয়ে বিক্ষোভ রূপগঞ্জের সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়  ১২৫তম বর্ষপূর্তিতে উৎসবমুখর নবীন-প্রবীণের মিলনমেলা আনন্দ-উল্লাস আর গান-গল্প-আড্ডায় মাতলেন সবাই পাইকগাছায় স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী ধারণার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত রূপগঞ্জে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবৈধ ঝুকিপূর্ণ সংযোগ অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল মধুপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত কুড়ালিয়া ইউনিয়নের জনগণের কাছে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দোয়া ও সমর্থন চেয়েছেন খালিদুজ্জামান শামীম মরহুম আলহাজ্ব আহমেদুর রহমানের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত সিডিএ চেয়ারম্যান হলেন ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন রায়পুরে বেকার তরুণদের স্বাবলম্বী করতে ফ্রি ফ্রিল্যান্সিং কোর্স। বখাটের এআই ভিডিওর অপপ্রচারে প্রাণ গেল স্কুলছাত্রীর, মানববন্ধনে ফাঁসির দাবি

চোখের সামনে পরিবারের ১০ জনের মৃত্যু দেখেছেন আব্দুর রশিদ

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 05:12:19 pm, Friday, 15 April 2022
  • 233 বার পড়া হয়েছে

চোখের সামনে পরিবারের ১০ জনের মৃত্যু দেখেছেন আব্দুর রশিদ

আমিরুল হক, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি ।।

মন থেকে ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিলের বীভৎসতার দৃশ্য মুছতে পারেননি আব্দুর রশিদ। সেদিন তাঁর চোখের সামনে পরিবারের ১০ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর অনেকবার বিভীষিকাময় সেই দিনের স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি। কী লাভ হলো তাতে? এখনো শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি মিলল না। তাই এখন আর এসব কাউকে বলতে চান না আব্দুর রশিদ।

আব্দুর রশিদ। এখন বয়স ৬২ বছর। স্বাধীনতার সময় তাঁর বয়স ছিল ১২ বছর। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাঁশবাড়ী মহল্লায় তাদের বসবাস। তার দাদা আব্দুল ওয়াদুদের একটি রুটি বিস্কুটের কারখানা ছিল। সেখানেই ১১ সদস্য পরিবার নিয়ে তাদের বসবাস। দাদা ছিলেন আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। ৭০ সালের সাধারন নির্বাচনের সময় দাদা নৌকা মার্কার প্রতীক লেবেল ছাপিয়ে ওই রুটি বিস্কুটের প্যাকেটে লাগিয়ে বিক্রি করতেন। সে সময় তিনি শহীদ ডা. জিকরুল হকের জন্য ভোট চাইতেন। এটাই ছিল তাদের পরিবারের বড় অপরাধ। এতেই ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর অবাঙালীরা।

গত শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) বাঁশবাড়ীর বাড়িতে গেলে ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রশিদ প্রথমে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁর মনে একটা ক্ষোভ আছে। অনেক অনুরোধের পর তিনি কথা বলতে রাজি হন। সেইদিনকার বিভীসিকাময় ঘটনা বলতে গিয়ে বলেন, ৭১ এর ১৫ এপ্রিল দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বাইরে চৈত্র বৈশাখের তাপদাহ । সূর্য সবে হেলেছে একটু পশ্চিমের দিকে। অন্যান্য দিনের মত আমার বাবা মোহাম্মদ শহীদ ও বড় ভাই আবু সাকের গেছে বিমান বন্দরের কাজে। অসুস্থতার কারনে দাদা যেতে না পারায় বাসাতেই ছিলেন । দুপুরের খাবার সেরে দাদা চেয়ারে বসে পান খাচ্ছিলেন। আর আমি ছিলাম বারান্দায়। দাদী এবং মা পাশের ঘরে। ছোট ভাই ও বোনেরা বাইরে খেলছিল। ঠিক এ সময়ে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ইজাহার আহমেদ ও ওয়াহিদসহ অন্যরা দাদার ঘরে ঢোকে এবং দাদাকে দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে। দাদা কিছু বলার আগেই ওয়াহিদ তার পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়। চিৎকার আহাজারি করতে থাকে দাদি। এ সময় দাদি রাজাকার ইজাহারের পা জড়িয়ে ধরে তার স্বামীকে বাঁচিয়ে তোলার আকুতি জানায়। কিন্ত নরঘাতক ইজাহার তার দাদির গালে থাপ্পর মারে। এতে দাদির নাকের ফুল ছিড়ে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। ছোট ভাই বেনেরা ছুটে আসে। ভয়ে কোন কিছু বলার আগেই তৎক্ষণিক তাদের চোখের সামনেই তারা দাদার লাশ মাটি চাপা দিয়ে চলে যায়। সন্ধায় কাজ শেষে বাড়ী ফেরে বাবা ও বড় ভাই। বাড়ির অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বাড়ির লোকজন। এসময় প্রতিবেশী এক অবাঙালী তাদের পরামর্শদেয় আতœগোপনের। আমার বড় ভাই ও বাবা পাশের বাসায় আতœ গোপনে যায়। দাদী, মা, ৪ বোন ভাইসহ আমি থেকে যাই বাড়িতে। হটাৎ আতœচিৎকার শুনতে পেয়ে আমি বেড়ার ফাক দিয়ে দেখি তার মায়ের পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এমন নির্মম হত্যাকান্ড দেখে আমি মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করি কিন্ত বাবা মুখ চেপে ধরেন আমার। ভাই রাশেদ ও বোন হাসিনাকেও উপর্যুপরি ছুড়িকাঘাতে হত্যা করে তার চোখের সামনে। দাদিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার সময় বার বার বলতে থাকে, তুমহারা লাড়কা আউর পোতালোক কাহা ? (তোমার ছেলে ও নাতিরা কোথায়?) দাদি তখন নির্যাতনের যন্ত্রনা সইতে না পেরে ওদেরকে জানিয়ে দেয়, সাথে সাথে হায়েনারা দাদির মাথায় বেয়নেট খুচিয়ে হত্যা করলো। এরপর ওরা আমার বাবা ও বড় ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী দোহলা এলাকায়। সেখানে তারা বড় ভাইকে পৌরসভার গভীর সেফটিক ট্যাংকীর ভেতর জীবন্ত ফেলে দেয়। আমি ও বাবা সেখান থেকে কোন রকমে পলিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন ওরা বাবাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়ে মারলে পায়ে লেগে যায়। তখন তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এরপর তাঁরা একটি হাত কেটে নেয়, এরপর চিৎকরে শুইয়ে জবাই করে। পরে তাঁরা হাত পা ধরে অনেক লাশের মাঝে ফেলে দেয়।

তবে এসব লাশ কাদের ছিল রশিদ বলতে পারেনি। সেখান থেকে তিনি পালিয়ে আসে নিজ বাড়িতে। কিন্ত সেখানে আরো পৈশাচিক দৃশ্য দেখেতে হয় রশিদকে। তিন নরপশু তখন রশিদের বেঁচে থাকা একমাত্র বড় বোন নুর জাহানকে নিয়ে পৈশাচিকতায় মেতেছে । সে ছিল নববিবাহিতা। বিয়ে হয়েছিল খুলনায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাড়ি এসেছিল। পরে আর স্বামীর বাড়ি যাওয়া হয়নি। বড় বোনের উপর আদিম অত্যাচারের দৃশ্য ছিল ভিন্ন, নির্যাতনের পর তার দুটি স্তন কেটে নিয়ে হত্যা করে নর পিচাশেরা। রশিদ তার বোনের ইশারায় পালিয়ে গিয়ে একটি টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। ততক্ষনে নিশ্চিত রশিদ সব শেষ হয়ে গেছে তার।
রশিদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা তখনও ছিল না। বিধিবাম, লুকিয়ে থাকা অবস্থায় সেখানে আসে পাকিস্তানের দোসর ভাসানি নামের অবাঙালী তরুন। ভাসানি রশিদকে জিজ্ঞেস করে তুম কুছ খ্যায়া হ্যায় ? (তুমি কিছু খেয়েছো) পরে সে তার লুকিয়ে থাকার বিষয়টি জানায় মনির খাঁনকে। মিনিট কয়েক পরেই হাতে রক্ত মাখা একটি ছোড়া নিয়ে মনির আসে রশিদের সামনে সেখান থেকে ধরে টেনে হিছরে নিয়ে যায়। পথেরমধ্যে গুলিবিদ্ধ অবন্থায় চেয়ারে বসে থাকা তৌহিদ নামের এক ব্যক্তি মনিরকে জিজ্ঞেস করে “তুম উসকো কাহা লেজাহারা? (তুমি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো) মনির জানায় , খাতাম কারনেকেলিয়ে ( হত্যা করতে) জবাবে তৌহিদ নরঘাতক মনিরকে বলে “তুমলোক আদমি হ্যায়না জানোয়ার ? (তোমরা মানুষ না জানোয়ার) ওর পরিবারের সবাইকে শেষ করার পর একটা বাঁচ্চাকে ছাড়তে পার না?। সবশেষে সবাইকে হারিয়ে সে প্রতিবেশী এক অবাঙালী পরিবারে যুদ্ধ চলাকালীন ৯মাস পালিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য এক বাঙালী পরিবারে চলে যান রশিদ।

আব্দুর রশিদ বলেন, নিজের চোখের সামনে একে একে সবাইকে হারিয়ে শুধু আমি বেঁচে যাই। কিন্তু কোনো স্বীকৃতি মিলল না। হয়ত এই আক্ষেপ নিয়েই আমিও একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে মাদকসেবী আখ্যা দিয়ে ব্যবসায়ীকে হত্যা, গ্রেপ্তার-২

চোখের সামনে পরিবারের ১০ জনের মৃত্যু দেখেছেন আব্দুর রশিদ

আপডেট সময় : 05:12:19 pm, Friday, 15 April 2022

আমিরুল হক, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি ।।

মন থেকে ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিলের বীভৎসতার দৃশ্য মুছতে পারেননি আব্দুর রশিদ। সেদিন তাঁর চোখের সামনে পরিবারের ১০ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর অনেকবার বিভীষিকাময় সেই দিনের স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি। কী লাভ হলো তাতে? এখনো শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি মিলল না। তাই এখন আর এসব কাউকে বলতে চান না আব্দুর রশিদ।

আব্দুর রশিদ। এখন বয়স ৬২ বছর। স্বাধীনতার সময় তাঁর বয়স ছিল ১২ বছর। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাঁশবাড়ী মহল্লায় তাদের বসবাস। তার দাদা আব্দুল ওয়াদুদের একটি রুটি বিস্কুটের কারখানা ছিল। সেখানেই ১১ সদস্য পরিবার নিয়ে তাদের বসবাস। দাদা ছিলেন আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। ৭০ সালের সাধারন নির্বাচনের সময় দাদা নৌকা মার্কার প্রতীক লেবেল ছাপিয়ে ওই রুটি বিস্কুটের প্যাকেটে লাগিয়ে বিক্রি করতেন। সে সময় তিনি শহীদ ডা. জিকরুল হকের জন্য ভোট চাইতেন। এটাই ছিল তাদের পরিবারের বড় অপরাধ। এতেই ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর অবাঙালীরা।

গত শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) বাঁশবাড়ীর বাড়িতে গেলে ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রশিদ প্রথমে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁর মনে একটা ক্ষোভ আছে। অনেক অনুরোধের পর তিনি কথা বলতে রাজি হন। সেইদিনকার বিভীসিকাময় ঘটনা বলতে গিয়ে বলেন, ৭১ এর ১৫ এপ্রিল দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বাইরে চৈত্র বৈশাখের তাপদাহ । সূর্য সবে হেলেছে একটু পশ্চিমের দিকে। অন্যান্য দিনের মত আমার বাবা মোহাম্মদ শহীদ ও বড় ভাই আবু সাকের গেছে বিমান বন্দরের কাজে। অসুস্থতার কারনে দাদা যেতে না পারায় বাসাতেই ছিলেন । দুপুরের খাবার সেরে দাদা চেয়ারে বসে পান খাচ্ছিলেন। আর আমি ছিলাম বারান্দায়। দাদী এবং মা পাশের ঘরে। ছোট ভাই ও বোনেরা বাইরে খেলছিল। ঠিক এ সময়ে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ইজাহার আহমেদ ও ওয়াহিদসহ অন্যরা দাদার ঘরে ঢোকে এবং দাদাকে দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে। দাদা কিছু বলার আগেই ওয়াহিদ তার পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়। চিৎকার আহাজারি করতে থাকে দাদি। এ সময় দাদি রাজাকার ইজাহারের পা জড়িয়ে ধরে তার স্বামীকে বাঁচিয়ে তোলার আকুতি জানায়। কিন্ত নরঘাতক ইজাহার তার দাদির গালে থাপ্পর মারে। এতে দাদির নাকের ফুল ছিড়ে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। ছোট ভাই বেনেরা ছুটে আসে। ভয়ে কোন কিছু বলার আগেই তৎক্ষণিক তাদের চোখের সামনেই তারা দাদার লাশ মাটি চাপা দিয়ে চলে যায়। সন্ধায় কাজ শেষে বাড়ী ফেরে বাবা ও বড় ভাই। বাড়ির অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বাড়ির লোকজন। এসময় প্রতিবেশী এক অবাঙালী তাদের পরামর্শদেয় আতœগোপনের। আমার বড় ভাই ও বাবা পাশের বাসায় আতœ গোপনে যায়। দাদী, মা, ৪ বোন ভাইসহ আমি থেকে যাই বাড়িতে। হটাৎ আতœচিৎকার শুনতে পেয়ে আমি বেড়ার ফাক দিয়ে দেখি তার মায়ের পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এমন নির্মম হত্যাকান্ড দেখে আমি মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করি কিন্ত বাবা মুখ চেপে ধরেন আমার। ভাই রাশেদ ও বোন হাসিনাকেও উপর্যুপরি ছুড়িকাঘাতে হত্যা করে তার চোখের সামনে। দাদিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার সময় বার বার বলতে থাকে, তুমহারা লাড়কা আউর পোতালোক কাহা ? (তোমার ছেলে ও নাতিরা কোথায়?) দাদি তখন নির্যাতনের যন্ত্রনা সইতে না পেরে ওদেরকে জানিয়ে দেয়, সাথে সাথে হায়েনারা দাদির মাথায় বেয়নেট খুচিয়ে হত্যা করলো। এরপর ওরা আমার বাবা ও বড় ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী দোহলা এলাকায়। সেখানে তারা বড় ভাইকে পৌরসভার গভীর সেফটিক ট্যাংকীর ভেতর জীবন্ত ফেলে দেয়। আমি ও বাবা সেখান থেকে কোন রকমে পলিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন ওরা বাবাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়ে মারলে পায়ে লেগে যায়। তখন তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এরপর তাঁরা একটি হাত কেটে নেয়, এরপর চিৎকরে শুইয়ে জবাই করে। পরে তাঁরা হাত পা ধরে অনেক লাশের মাঝে ফেলে দেয়।

তবে এসব লাশ কাদের ছিল রশিদ বলতে পারেনি। সেখান থেকে তিনি পালিয়ে আসে নিজ বাড়িতে। কিন্ত সেখানে আরো পৈশাচিক দৃশ্য দেখেতে হয় রশিদকে। তিন নরপশু তখন রশিদের বেঁচে থাকা একমাত্র বড় বোন নুর জাহানকে নিয়ে পৈশাচিকতায় মেতেছে । সে ছিল নববিবাহিতা। বিয়ে হয়েছিল খুলনায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাড়ি এসেছিল। পরে আর স্বামীর বাড়ি যাওয়া হয়নি। বড় বোনের উপর আদিম অত্যাচারের দৃশ্য ছিল ভিন্ন, নির্যাতনের পর তার দুটি স্তন কেটে নিয়ে হত্যা করে নর পিচাশেরা। রশিদ তার বোনের ইশারায় পালিয়ে গিয়ে একটি টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। ততক্ষনে নিশ্চিত রশিদ সব শেষ হয়ে গেছে তার।
রশিদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা তখনও ছিল না। বিধিবাম, লুকিয়ে থাকা অবস্থায় সেখানে আসে পাকিস্তানের দোসর ভাসানি নামের অবাঙালী তরুন। ভাসানি রশিদকে জিজ্ঞেস করে তুম কুছ খ্যায়া হ্যায় ? (তুমি কিছু খেয়েছো) পরে সে তার লুকিয়ে থাকার বিষয়টি জানায় মনির খাঁনকে। মিনিট কয়েক পরেই হাতে রক্ত মাখা একটি ছোড়া নিয়ে মনির আসে রশিদের সামনে সেখান থেকে ধরে টেনে হিছরে নিয়ে যায়। পথেরমধ্যে গুলিবিদ্ধ অবন্থায় চেয়ারে বসে থাকা তৌহিদ নামের এক ব্যক্তি মনিরকে জিজ্ঞেস করে “তুম উসকো কাহা লেজাহারা? (তুমি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো) মনির জানায় , খাতাম কারনেকেলিয়ে ( হত্যা করতে) জবাবে তৌহিদ নরঘাতক মনিরকে বলে “তুমলোক আদমি হ্যায়না জানোয়ার ? (তোমরা মানুষ না জানোয়ার) ওর পরিবারের সবাইকে শেষ করার পর একটা বাঁচ্চাকে ছাড়তে পার না?। সবশেষে সবাইকে হারিয়ে সে প্রতিবেশী এক অবাঙালী পরিবারে যুদ্ধ চলাকালীন ৯মাস পালিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য এক বাঙালী পরিবারে চলে যান রশিদ।

আব্দুর রশিদ বলেন, নিজের চোখের সামনে একে একে সবাইকে হারিয়ে শুধু আমি বেঁচে যাই। কিন্তু কোনো স্বীকৃতি মিলল না। হয়ত এই আক্ষেপ নিয়েই আমিও একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।