
শওকত আলম, কক্সবাজার:
কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালত গর্জনিয়ার আলোচিত দুই শিশুহত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করেছে। আদালত এ মামলায় ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি), ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১ জনকে খালাস দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর মাননীয় বিচারক ওসমান গনী এ রায় ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্র পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এডভোকেট মোশাররফ হোসেন টিটু, এবং মামলার সংবাদদাতা ছিলেন মোঃ ফোরকান প্রকাশ মিন্টু, নিহত দুই শিশুর পিতা।
🔹 ১৭ জানুয়ারি ২০১৬, বিকাল ৬টা ৩০ মিনিটে
এজাহার দায়ের: ১৯ জানুয়ারি ২০১৬, দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বড়বিল, গর্জনিয়া ইউনিয়ন, রামু — বাদীর বসতঘরের পশ্চিম পাশে পাহাড়ের উপর।
নিহত শিশুরা:
১। মোঃ হাসান প্রঃ শাকিল (বয়স ১১ বছর)
২। মোঃ হোসেন প্রঃ কাজল (বয়স ৮ বছর)
বাড়ির পাশে পাহাড়ে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ওইদিন রাত ৭টার দিকে বাদীর দোকান মালিক আবদুল আলিমের মোবাইল নম্বরে (০১৮৩২৭৩৬০৩৬) এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে জানায়, “মিন্টুর ছেলে দুইজনকে আমরা অপহরণ করেছি, চার লাখ টাকা না দিলে ওদের ছাড়ব না।”
বাদী তৎক্ষণাৎ বিষয়টি গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে জানান এবং স্থানীয় লোকজন নিয়ে ব্যাপক খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ কায়কোবাদ কায়কিসলু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরে এজাহারনামীয় ২ নম্বর আসামী জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করা হয়। সে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে জানায়, বাকি আসামিদের সহায়তায় দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ গোপন করা হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে লেং জালালের বাগান এলাকা থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত ২ শিশুর পিতা মোঃ ফোরকান প্রকাশ মিন্টু তাঁর দুই সন্তান নিখোঁজের পর রামু থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩-এর ৭/৮/৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় মামলা নং ১৭৭/২০১৮ দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল পুলিশ ১৫ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এ মামলায় ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। বাদী, প্রত্যক্ষদর্শী ফারুকসহ একাধিক সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, আসামিরা অপহরণের পর মুক্তিপণের জন্য যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে। টাকা না পেয়ে শিশুদ্বয়কে হত্যা করে বস্তায় ভরে পাহাড়ে লুকিয়ে রাখে।
আসামিরা হলেন:
১। ইমাম হোসেন প্রকাশ ইমান আলী প্রঃ টুলু (বর্তমানে মৃত)
২। জাহাঙ্গীর আলম (১৬৪ ধারার জবানবন্দি প্রদানকারী, কারাগারে)
৩। আলমগীর হোসেন প্রঃ বুলু (পলাতক)
৪। আবদুস শুক্কুর (পলাতক)
৫। নাজিম উদ্দীন প্রঃ বুছাইয়া (পলাতক)
৬। মিজানুর রহমান (পলাতক)
৭। মোঃ শহীদুল্লাহ (পলাতক)
৮। আবদুল মজিদ প্রঃ বদাইয়া (পলাতক)
৯। মোঃ ইউনুছ (পলাতক)
১০। মোঃ রোমান উদ্দিন প্রঃ নোমান (পলাতক)
১১। লায়লা বেগম (পলাতক)
১২। রাশেদা বেগম (পলাতক)
১৩। ফাতেমা বেগম (পলাতক)
১৪। জয়নাল আবেদীন (পলাতক)
১৫। ছকিনা বেগম (পলাতক)
দীর্ঘ ৯ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর ২০২৫) রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে ৪ জনের ফাঁসি, ৫ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, ১ জনের খালাস, এবং ১ জনের মৃত্যুর কারণে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে নিহত দুই শিশুর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। রায় শুনে তারা আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলাম — আজ সেই বিচার পেয়েছি।”
মামলাটি বিচারাধীন ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নং–২, কক্সবাজার–এর অধীনে।
চার্জ গঠন করা হয় ২০ মার্চ ২০১৯ তারিখে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)–এর ৭/৮/৩০ ধারা ও দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারা অনুযায়ী।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোশাররফ হোসেন টিটু বলেন,
“এটি একটি ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল। আদালতের রায় ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”
বাদী পক্ষে আইনজীবী এডভোকেট আবদুল্লাহ বলেন,
“দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বাদী পক্ষের হয়ে আমরা আইনি লড়াই করেছি। আদালতের এই রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাদী ও নিহত শিশুদের পরিবার এই রায়ে সন্তুষ্ট।”

























