
তৌফিক আলম চৌধুরী, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি,
একটির ঘোর কাটতে না কাটতেই যেন আরেকটি ভয়াবহ ঘটনার হানা! একের পর এক হত্যা, একের পর এক ডাকাতি ও চুরি—সব মিলিয়ে চন্দনাইশে এখন আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার চরম হাহাকার। গত ৯ মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে উঠে আসছে এক ভয়াবহ চিত্র। মাত্র ২৭০ দিনে অন্তত ১২ জনের প্রাণহানি, ৭টি বড় ডাকাতি, ১৩টির বেশি চুরি এবং অন্তত ২৪টি গুরুতর অঘটন ঘটেছে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিনিয়ত সংঘটিত এসব অপরাধ স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এলাকার চিহ্নিত অনেক অপরাধী নির্দ্বিধায় জনসম্মুখে ঘুরে বেড়ালেও কার্যকর কোনো প্রদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
অক্টোবর ও সেপ্টেম্বর: চুরির হিড়িক ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
৪ অক্টোবর: রাতে সাংবাদিক শাহাদাত হোসেনের বসতবাড়ির পেছনের দরজা ভেঙে টিউবওয়েলের মাথা, আইরনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে যায় চোরচক্র। আনুমানিক ক্ষতি প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা।
২৯ সেপ্টেম্বর: হাশিমপুর মখলেছুর রহমান-আলতাজ খাতুন উচ্চ বিদ্যালয় ও উপজেলা পরিষদ ক্যাম্পাসের শিশু নিকেতনে পৃথক চুরির ঘটনা ঘটে।
২২ সেপ্টেম্বর: কালিরহাটে টিংকু ধরের ভাড়া বাসা থেকে শিক্ষক রাজন আচার্যের ৮ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৫০ হাজার টাকাসহ প্রায় ২২ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়।
১২ সেপ্টেম্বর: দোহাজারীর হাছনদণ্ডীতে পরকীয়ার জেরে স্বামী জাহেদুল ইসলামের নির্মম প্রহারে প্রাণ হারান দুই সন্তানের জননী মিনহাজ আকতার (২৪)। একই দিনে দক্ষিণ হাশিমপুর বিজয়রাম বিহারে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকাসহ প্রায় ৮০ হাজার টাকার মালামাল লুট করা হয়।
১১ সেপ্টেম্বর: সাতবাড়িয়া ছলিয়ারপাড়া এলাকায় একাধিক চুরির ঘটনায় মো. ইমরান নামে একজনকে স্থানীয়রা আটক করে মারধর করে আর চুরি না করার মুচলেকা নেয়।
১০ সেপ্টেম্বর: পশ্চিম বাইনজুরী এলাকায় স্বামী নুরুল হক ওরফে জাকির হোসেনের ঘাতক আঘাতে নিহত হন স্ত্রী রুনা আকতার (২৯)।
আগস্ট: ছদ্মবেশী ডাকাতি ও খুনের রাজত্ব
৩১ আগস্ট: দোহাজারীর দেওয়ানহাটে আহমদ হোসেন মেম্বারের ছেলে মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকাতদল প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
২৯ আগস্ট: বৈলতলী জামতলা এলাকা থেকে আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৪ আগস্ট: দক্ষিণ গাছবাড়িয়া নতুনপাড়ায় প্রশাসনের লোক পরিচয়ে আবুল খায়েরের বাড়িতে প্রবেশ করে ২৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মালামাল লুটে নেয় ডাকাতরা।
১৯ আগস্ট: দোহাজারী সদরে স্বামী কোদাল দিয়ে মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন স্ত্রী নূর বাহাকে (২৩)।
১৬ আগস্ট: পৌরসভার দক্ষিণ গাছবাড়িয়া এলাকার মাইক্রোচালক সামশুল ইসলামের ঘরে ডাকাতি চালিয়ে ২৭ লাখ টাকারও বেশি মালামাল লুট করা হয়।
১৫ আগস্ট: বৈলতলীতে প্রবাসী বেলাল হোসেনের বাড়িতে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে হানা দিয়ে ২০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মালামাল লুটে নেয় সংঘবদ্ধ ডাকাতদল।
মে থেকে জুলাই: সহিংসতা, অপহরণ ও প্রতিষ্ঠানের পর পর চুরি
২৮ জুলাই: ৫০ টাকার তুচ্ছ বিরোধের জেরে দোহাজারী জামিজুরিতে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন জাহেদুল ইসলাম (২২)। ধোপাছড়ি গোলপাহাড় এলাকায় সবজি ব্যবসায়ী হারুনকেও একইভাবে ছুরিকাঘাত করা হয়।
২৭ জুলাই: সাতবাড়িয়া নগরপাড়ায় নিজ শয়নকক্ষ থেকে প্রবাসী আবদুর রহমানের (৬৫) পচাগলে যাওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়।
২৩ জুলাই: সৈয়দাবাদে মোস্তাফিজ মিয়ার গোয়ালঘরে দুর্বৃত্তদের আগুনে দগ্ধ হয়ে একটি গরু মারা যায় এবং আরও পাঁচটি গরু মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়।
১৮-১৯ জুলাই: উজির আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও নগদ টাকাসহ লক্ষাধিক টাকার মালামাল) এবং ফতেনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মালামাল চুরির ঘটনা ঘটে।
২৫ জুন: গাছবাড়িয়া এলাকা থেকে শ্রমিক নুরুল আমিন (৩৬) ও আরিফুল ইসলাম (২৫)-কে অপহরণ করে ৪৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
২২ জুন: কাঞ্চনাবাদে মায়ের বকুনির পর অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন প্রবাসী জসিম উদ্দিনের ছেলে জিসান উদ্দিন (২০)।
১৫ জুন: বৈলতলীতে প্রতিবন্ধী শিশুকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে ফেরদৌস রহমান (৩৭) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৮ জুন: কাঞ্চননগর পাহাড়ের নিমজিরি এলাকা থেকে বাগানশ্রমিক শাহজাহান (৪০) ও আজগর (৪১)-কে অপহরণ করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ওঠে।
২৮ মে: গাছবাড়িয়া থেকে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে কাঞ্চননগর পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে তিন যুবক মিলে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ।
৫-২০ মে: বরমা মাইগাতা এলাকা থেকে ১০ কেভি ক্ষমতার একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়। এ ছাড়া চন্দনাইশ সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চমবারের মতো, বণিকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দোহাজারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, কম্পিউটার ও সিসি ক্যামেরাসহ প্রভূত মালামাল চুরি হয়।
৫ মে: বৈলতলীতে মাটি কাটা নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষের পর থানার সামনে এসে বিএনপি নেতা আনিছুর রহমান চৌধুরী গুরুতর আহত হন।
বছরের প্রথম চার মাসের অন্ধকার চিত্র
৪ এপ্রিল: হাশিমপুর মাস্টারবাড়িতে ভুয়া ডিবি পরিচয়ে ডাকাতদল স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ ২০ লাখ টাকার বেশি মালামাল লুট করে।
১৪ মার্চ: দোহাজারী দিয়াকুলে প্রতিপক্ষের ধারালো ছুরিকাঘাতে নিহত হন রাজমিস্ত্রি মো. সোহেল (৩৮)।
২৮ ফেব্রুয়ারি: ভোররাতে গরু চোরের গুলিতে প্রাণ হারান চন্দনাইশ পৌরসভার জোয়ারা হিন্দুপাড়ার চন্দন দাশ (৭০)। একই দিন সদর হাজিরপাড়ায় লাকড়ির ঘর থেকে দুই সন্তানের জননী আয়েশা ছিদ্দিকা মুক্তার (২২) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়।
২২ ফেব্রুয়ারি: দোহাজারী হাতিয়াখোলায় স্ত্রীর গালাগাল ও অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন সৈয়দ নূর (৪৫)।
১৫ ফেব্রুয়ারি: জামিজুরিতে ১২ দিনের নবজাতক শিশুকে বিক্রি করতে না পেরে স্ত্রী সালমা আকতারকে হত্যা করেন স্বামী নুরুল হুদা। উল্লেখ্য, নেশার টাকার জন্য এর আগেও তাদের দুই সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৬ জানুয়ারি: দোহাজারী চাগাচরে সিরাজুল ইসলামের মেয়ে তাসলিম আকতার গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয় ও স্থানীয় জনমনে ক্ষোভ
উপজেলার আইনশৃঙ্খলার এই যখন হাল, তখন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। চলতি বছরের ৫ মে চন্দনাইশ থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে যোগ দেন এস.এম. দিদারুল ইসলাম সিকদার। এর আগে তিনি চন্দনাইশ থানায় পরিদর্শক (তদন্ত) এবং পাশ্ববর্তী আনোয়ারা থানায় ওসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পুলিশের তরফ থেকে তদন্ত, মামলা ও গ্রেপ্তারি অভিযান চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে অপরাধ কমেনি বিন্দুমাত্র। স্থানীয়দের অভিযোগের তির আরও গভীর—বর্তমান ওসি বান্দরবানের বাসিন্দা হিসেবে খাতাকলমে পরিচিত হলেও, তাঁর পৈতৃক ভিটা এবং জন্মস্থান চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় আসনের আওতাধীন পুরানগড় এলাকায়। ফলে তাঁকে স্থানীয় মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হয়। নিজস্ব এলাকা হওয়াতেই তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগে সংকোচ বোধ করছেন বা শিথিলতা দেখাচ্ছেন—এমন আশঙ্কাই এখন চন্দনাইশবাসীর ঘুম কাড়ছে।
























