
হাবিবুর রহমান হাবিব,
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল জটিল বাস্তবতার এক অনন্য অধ্যায়। কখনো বন্ধুত্ব, কখনো অবিশ্বাস; কখনো কৌশলগত সহযোগিতা, আবার কখনো তীব্র জনঅসন্তোষ এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক যেন একই সঙ্গে উষ্ণ ও শীতল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সম্পর্কে জমেছে নতুন এক বরফস্তর। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সীমান্তের দুই পাশেই বেড়েছে সন্দেহ, বেড়েছে আবেগ, বেড়েছে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের ঝড়। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি; বরং নীরব এক স্থিতাবস্থা এখনো টিকে আছে।
বাংলাদেশে এখন ভারতবিরোধী মনোভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা তরুণদের আলোচনায় “ভারতীয় প্রভাব” এখন একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। অন্যদিকে ভারতেও বাংলাদেশের প্রতি আগের মতো উষ্ণতা আর নেই। দিল্লির নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করে, বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের জন্য নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দুই দেশ যেন এক অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রেখেই চলছে।
তবে সম্পর্কের এই ঠান্ডা আবহ পুরো বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে না। কারণ উপরের বরফ যতই শক্ত হোক, নিচে পানি কিন্তু এখনো প্রবাহিত হচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক ভাষা শীতল হলেও সীমান্ত পুরোপুরি অস্থির হয়নি, বাণিজ্য থেমে যায়নি, এমনকি নিরাপত্তা সহযোগিতাও নীরবে চালু আছে। এই কারণেই বর্তমান বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক “Frozen Stability” বা “বরফের নিচের স্থিতাবস্থা” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
সীমান্ত: উত্তেজনার বদলে নিয়ন্ত্রিত নীরবতা
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। প্রায় ৪০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত অতীতে বহু রক্তপাত, চোরাচালান, হত্যা ও উত্তেজনার সাক্ষী ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক শান্ত। সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে এবং ছোটখাটো উত্তেজনাও অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হচ্ছে।
তবে সমস্যার শেষ হয়নি। মাঝেমধ্যে ভারতের “পুশ–ইন” নীতি নিয়ে অভিযোগ ওঠে, যেখানে কিছু মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ইতিবাচক দিক হলো, এসব ঘটনার পরও দুই দেশের সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সীমান্তে এখন যুদ্ধংদেহী পরিবেশের বদলে “ম্যানেজড টেনশন” বা নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যা আছে, কিন্তু সেই সমস্যা দুই দেশই সীমার মধ্যে রাখতে চাইছে।
বাণিজ্য: রাজনীতি ঠান্ডা, অর্থনীতি গরম
রাজনৈতিক দূরত্ব যতই বাড়ুক, অর্থনীতির বাস্তবতা দুই দেশকে একে অপরের কাছাকাছি রাখছে। কারণ ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সব সময়ই লাভজনক। কম সময়, কম পরিবহন ব্যয় এবং বাজারের সহজ প্রবেশাধিকার সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ভারতীয় সুতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সুতা নয়, কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, ওষুধের উপাদান, যন্ত্রাংশ বহু ক্ষেত্রেই ভারত বাংলাদেশের বড় সরবরাহকারী। গত অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। সামগ্রিক আমদানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক মঞ্চে যতই কড়া বক্তব্য শোনা যাক না কেন, ব্যবসায়ীরা বাস্তবতার ভাষাই বুঝছেন। কারণ দুই দেশের অর্থনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে হঠাৎ করে সম্পর্ক ছিন্ন করা কোনো পক্ষের জন্যই সহজ নয়।
রাজনীতি ও কূটনীতি: সম্পর্কের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতকে তার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে দেখা হতো। বিরোধীরা মনে করত, দিল্লির সমর্থন ছাড়া সেই শাসন এত দীর্ঘ হতে পারত না। ফলে আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভের সঙ্গে ভারতের প্রতিও জনমনে এক ধরনের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়।
৫ আগস্টের পর সেই আবেগ আরও বিস্ফোরিত আকার নেয়। তরুণদের একটি অংশ “ভারতীয় আগ্রাসন” নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গোপন চুক্তি, ট্রানজিট সুবিধা কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে, তবুও জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ পুরোপুরি মুছে যায়নি।
ভারতের দিক থেকেও শুরুতে একধরনের অস্বস্তি ছিল। দিল্লি বুঝতে পারছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো কৌশল আর কার্যকর হবে না। ফলে তারা কিছুটা অপেক্ষার নীতি নেয়। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও ভারতকে নিয়ে বড় কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজনৈতিকভাবে স্বস্তি অনুভব করেননি।
ভূরাজনীতির নতুন হিসাব
বিশ্বরাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখলেও এখন সেই অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক জোরদারের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশও এখন কেবল ভারতের ছায়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে ভারতবিরোধী আবেগ সামাল দেওয়া, অন্যদিকে বাস্তব কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখা। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তাই সম্ভবত “না অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, না প্রকাশ্য বৈরিতা”—এই মধ্যপন্থায় এগোতে চাইবে।
বরফ কি গলতে শুরু করেছে?
সম্পর্কের ভেতরে এখন ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় ভিসা চালু হওয়ার আলোচনা, দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশি মিশনের কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হওয়া, সীমিত আকারে পরিবহন চালু হওয়া—এসবই সম্পর্কের বরফে ছোট ছোট ফাটলের মতো।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়েও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি “Inclusive Diplomacy” দেখা যাচ্ছে। আগে দিল্লির নীতি অনেকটাই আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এখন তারা বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে।
এমনকি ভারতের কূটনৈতিক আচরণেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ,সরকারের ভারত সফর পরিকল্পনা এসবই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপিও প্রকাশ্যে জানাচ্ছে যে শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের পথে বাধা হবে না। তবে তারা খুব সতর্কভাবে এগোবে, কারণ দেশের রাজপথে এখনো ভারতবিরোধী আবেগ প্রবল।
ভবিষ্যৎ: প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাকি বাস্তবতার সমঝোতা?
বাংলাদেশ ও ভারত কেউই একে অপরকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতি—সবকিছুই দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করবে।
তবে আগের মতো “অন্ধ বন্ধুত্বের” যুগ সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের সম্পর্ক হবে অনেক বেশি হিসাবি, বাস্তববাদী ও স্বার্থকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ চাইবে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক; আর ভারত চাইবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখতে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার পুনর্গঠন। কারণ শুধু সরকার নয়, দুই দেশের জনগণের মনেও এখন অনেক প্রশ্ন জমে আছে। সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু কূটনৈতিক হাসিমুখ দিয়ে সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
তবু আশার জায়গা আছে। কারণ বরফ যতই জমুক, নিচের পানি এখনো প্রবাহিত হচ্ছে। আর সেই প্রবাহই হয়তো একদিন ধীরে ধীরে জমে থাকা শীতলতা গলিয়ে নতুন এক সম্পর্কের পথ তৈরি করবে।
























