
মাকসুদুল হোসেন তুষার,
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হতদরিদ্রদের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার স্থান ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ৩২ বছরেও সরকারীকরণ হয়নি । সরকার আসে যায় কিন্তু অবহেলিত বিদ্যালয়টিতে কারো কোন নজরে আসে না। ভাঙ্গাচুড়া টিনের ঘরে বিনা বেতনে চারজন শিক্ষক দিয়ে চলছে চার শতাধিক শিক্ষার্থীদের ক্লাসের কার্যক্রম। সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা খাবার দাবারসহ সরকারি সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা পেলেও এ বিদ্যালয়টিতে সেই সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা । ফ্যান-বিদ্যুৎ না থাকার পরেও প্রচন্ড তাপদাহের মধ্যেই ক্লাস করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা । বিদ্যালয়ে রয়েছে মাদক সেবীদের আনাগোনা।
সড়ে জমিনে গিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার ভায়েলা, মিয়াবাড়ি, মুরাবো, গোপালিয়াবাড়ী, আজিজ নগর এলাকা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরত্ব। আর এসব এলাকার যত দরিদ্র ঘরের ছেলে-মেয়ে পড়াশোনার জন্য ভুলতা ইউনিয়নের ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রয়াত শিক্ষক সুফিয়া বেগম ও তার স্বামী হাজী আইয়ুব আলী ভূঁইয়া এলাকার হতদরিদ্র মানুষের সন্তানদের লেখাপড়ার চিন্তা করে ৩৩ শতাংশ জমি বিদ্যালয়টিকে দান করে চার কক্ষ বিশিষ্ট টিনের ঘর নির্মাণ করে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষা কার্যক্রম করেন।
দীর্ঘ ৩২ বছর পার হয়ে গেলেও এ বিদ্যালয়টি এখন পর্যন্ত সরকারীকরণ হয়নি। সরকার যায় আসে কিন্তু এ বিদ্যালয়টির দিকে কারো কোন সুনজর নেই। বর্তমানে বিদ্যালয়টি আবু সুফিয়ান, শাহিনুর বেগম, রুবিঢয়া আক্তার ও সোনিয়া আকতার নামের চারজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিনা বেতনে ঐ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান দিয়ে আসছেন। বিদ্যালয়টি ভাঙাচোরা টিনের ঘর। জানালা নেই। নেই বৈদ্যুতিক পাখা। নেই শিক্ষকদের জন্য অফিসের চেয়ার টেবিল। দিনে রাতে মাদক সেবীদের আনাগুনায় অতিষ্ঠ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। নেই বাউন্ডারি। পাশের পুকুরের পানিতে পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারিভাবে কোন সুযোগ সুবিধা তারা পায় না।
শিক্ষকরা জানান, তারা এ বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ওই মায়ায় তারা বছরের পর বছর বিনা বেতনে এলাকার হতদরিদ্র ঘরের সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে আসছেন। সরকারি সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে বারবার লিখিতভাবে সরকারি করনের আবেদন জানিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
শিক্ষকরা অভিযোগ করে আরো জানান, স্থানীয় মাদক সেবীরা প্রায় সময় প্রকাশ্য দিবালোকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় মাদক সেবন করতে আসছে। প্রতিবাদ করলেই নানাভাবে হুমকি দেয়া হয় শিক্ষকদের। বিদ্যালয়ের মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় তারা।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, বৃষ্টি এলে পানি পড়ে বহি খাতা ভিজে যায়। টয়লেট নেই । এতে তাদের সমস্যা হয়। প্রচন্ড গরমে ফ্যান নেই। বাউন্ডারি না থাকায় প্রায় সময় পাশে পুকুরে পড়ে যায় শিক্ষার্থীরা।
অভিভাবকরা জানান, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য একমাত্র ভরসা এই মিয়াবাড়ি-ভায়লা স্কুলটি। জরাজীর্ণ ও সরকারিভাবে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই স্কুলটির পরিবর্তন চায় সকলে। তাহলে ঝরে যাওয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
জমিদাতার মেয়ে শামীমা সুলতানা ওমা ও ছেলে শফিকুল ইসলাম জুয়েল জানান, আমাদের মা এবং বাবা এলাকার নিরহ ও দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষার চিন্তা করে ৩৩ শতাংশ জমি দান করেন এবং এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। চারজন মানবিক শিক্ষক দিয়ে বছরের পর বছর স্কুলটি শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। আমরা চাই স্কুলটি সরকারীকরন এবং ভবন নির্মাণ করে যেন অন্যান্য সরকারি স্কুলের মত এই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা সুযোগ-সুবিধা পায়।
ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সুফিয়ান বলেন, এলাকার দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য আমাদের মন কাঁদে। যার কারণে বিনা বেতনে আমরা শিক্ষা কার্যক্রম এখনো চালু রেখেছি। আমার নিজের তিনজন ছেলে-মেয়ে এই স্কুলেই পড়াশোনা করে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের মেধা অনেক ভালো। তারা ভাল রেজাল্ট করে। সরকারিভাবে সাপোর্ট পেলে তারা আরো ভালো করবে। দরিদ্র ঘরের শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আমাদের এমপি মুস্তাফিজুর রহমান ভুইয়া দিপুর হাতে যেন সরকারিকরণসহ উন্নয়ন করা হয় ।
ভুলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আরিফুল হক ভূঁইয়া বলেন, স্কুলটি খুবই অবহেলিত। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে আলমারিসহ কিছু মালামাল দিয়েছিলাম। তবে সরকারি অর্থায়ন ছাড়া স্কুলটির উন্নয়ন করা সম্ভব না। সরকারি করন করা হলে শিক্ষার্থীরা সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, সরকারিভাবে যদি বরাদ্দ আসে তাহলে অচিরেই ওই স্কুলটিকে বরাদ্দ দেব এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য স্কুলটি সরকারিকরণ প্রয়োজন। আমাদের স্থানীয় সংসদ সদস্যর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ইনশাল্লাহ আমরা আশা করছি অচিরেই স্কুলটিকে সরকারি করুন করতে পারব।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশেযর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানতো দূরের কথা যেখানেই মাদকের বিষয়ে আসবে সেখানে ব্যবস্থা। মাদকের ব্যাপারে কোন ছাড় নেই। এখন থেকে এই স্কুলের দিকে আমরা নজরে রাখবো।
নারায়ণগঞ্জ ১ রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, ৩২ বছরেও বিগত সরকারের আমলে ভায়েলা-মিয়াবাড়ি স্কুলটি সরকারিকরণ করা হয়নি এটি দুঃখজনক। দ্রুত দলীয়ভাবে এবং সরকারিভাবে সরকারিকরন করা হবে ইনশাআল্লাহ। যাতে করে এ স্কুলের যেসব শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে তারা সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায়। পাশাপাশি শিক্ষকরাও তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। ইতিমধ্যে আমি শিক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। রূপগঞ্জের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমাদের সরকার অনেকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সাথে সাথে ঝরাজীর্ণ ও বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে এমন বিদ্যালয় গুলোকে সংস্কার করা হবে।

























